শিকড় ব্রিজের সন্ধানে : Double Decker Root Bridge
শিকড় ব্রিজের সন্ধানে
বর্ণালী রায়
“কিড়ালু সে বঁচকে রহেনা ম্যাডাম”।
হলিউডের সিনেমাকেও হার মানায় সেই সব লাল লাল পোকা। ডংজনের কথায় কিড়ালু। এক কামড়ে নিশ্চিতমত্যু।
শিকড় ব্রিজের সন্ধানে এসে না সমাধিস্থ হতে হয় ! বাড়ি থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে মেঘালয়ের এই গভীর জঙ্গলে।
এবার শিলং আসার একটা বিশেষ কারণ আছে। এবার এসেছি ‘শিকড় ব্রিজের’ সন্ধানে। শুনেছি ভারতে যে ক’টা জীবন্ত বিস্ময় আছে তার মধ্যে মেঘালয় রাজ্যের লেটকিনসিউতে একটা আছে। সেটা হল শিকড়ের তৈরি ব্রিজ ‘ডবল ডেকার রুটব্রিজ’।
শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি হয়ে লেটকিনসিউ যেতে হয়। প্রায় ৫৪ কিলোমিটার পথ। এর উচ্চতা ১৩০০ মিটার। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি যেতে আমাদের সময় লাগল মোটামুটি ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। রাস্তা খুব খারাপ। পথে নানা জায়গায় পাহাড় কাটা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার পাহাড় ভেঙে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। যেখানে সেখানে ধস নেমেছে। রাস্তায় ছোট বড় এবরো-খেবরো পাথরের ছড়াছড়ি। সব মিলিয়ে দুর্বিসহ পরিস্থিতি। চারিদিকের সবুজ গাছপালা ধুলো মেখে সাদা হয়ে আছে। জলের পাইপ লাইন ফেটে বেহাল অবস্থা। কোথাও কোথাও গাছপালা কেটে রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হয়েছে। অপরিসর রাস্তা আরও অপরিস্কার হয়ে গেছে। ধোঁয়া-ধুলো সব মিলিয়ে প্রাণান্তকর দশা। আমরা চলেছি গুরুং সাহেবের বোলেরো গাড়ি চেপে।
আমরা শিলং থেকে বেড়িয়েছি ভোর সাতটা নাগাদ। গুরুং সাহেবের কাছে জানতে পারলাম চেরাপুঞ্জিতে নাকি মাটি খুঁড়লেই কয়লা পাওয়া যায়। আর সেই কয়লা থেকে প্রথমে সোহরা, তারপর সোহরাপুঞ্জি নাম হয়েছে এই জায়গাটার। সোহরা সংলগ্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ছড়িয়ে ১৫ কিলোমিটার গেলেই লেটকিসিউ গ্রাম। মেঘালয়ের ইষ্ট খাসী হিল জেলার অন্তর্গত এই লেটকিনসিউ গ্রামের চারিপাশটা গভীর জঙ্গল আর পাহাড়ে ঘেরা। এর কাছেই একটা গ্রামে আছে, সেই জীবন্ত বিস্ময়—‘শিকড় ব্রিজ’।
(Double Decker Root Bridge)
ঐ অঞ্চলে চেরাপুঞ্জি শহর পেরোলেই তেমন একটা থাকার জায়গা নেই। গ্রামের ভিতর অবসরপ্রাপ্ত এক তামিল দম্পতি চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসর্ট নামে একটা রিসর্ট খুলেছেন। নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে এই রিসর্টটির অবস্থান। আমরা প্রথমে গাড়ি নিয়ে গেলাম এই রিসর্টে। সামান্য জলখাবার খেয়েই রওনা দেব ‘শিকড় ব্রিজ’ দেখতে। রিসর্ট থেকেই ব্যবস্থা করা হল গাইডের। স্থানীয় একটি ছেলে। বছর ২৫ বয়স। নাম ডং জন শেরপা। গাড়িতে যেতে যেতে ডং জন-এর কাছ থেকে জানতে পারলাম এই অঞ্চলে প্রায় ১১টি কার্যকরী রুটব্রিজ আছে। এগুলির নামধাম ভারি অদ্ভুত ঠেকল আমার কাছে। – Ummunoi, umkar, Ritymmen, Mawsaw, Mawlynnong ইত্যাদি। আর আমরা যে ‘ডবল ডেকার রুটব্রিজ’-টাকে দেখতে যাচ্ছি তার নাম ‘Umshiang’। এটি একটি নদীর নাম। যার ওপরে ‘রুটব্রিজ’টা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষজন এই “রুটব্রিজ’-টাকে ‘Jing Kieng Deingiri’।
গুরুং সাহেবের গাড়ি পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে চলেছে। চারিদিকে সবুজ পাহাড় আর নাম না জানা পাহাড়ি ফুলঅর্কিড। অপূর্ব তাদের রঙের বাহার। সেসব রং মুখে বলা যায় না। অদ্ভুত ব্যাপার কোনো রকম যত্ন পরিচর্যা ছাড়াই পাহাড়ের এবড়ো-খেবড়ো বুকে বেড়ে উঠেছে। যত দূর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি একটা বিশেষ ধরনের গাছ প্রায়ই চোখে পড়ছে। আমাদের বাড়িতে ফুল ঝাড়ু যে জিনিসটা দিয়ে তৈরি হয়, গাছটা অনেকটা সেইরকম দেখতে। আমরা মজা করে গাছটার নাম দিলাম ঝাড়ুগাছ।
খাসি উপজাতির মানুষেরা খুবই শৌখিন ও পরিচ্ছন্ন। এদের ঘরবাড়ির সাজসজ্জাও খুব সুন্দর ও ছিমছাম। ছোট ছোট প্রতিটা বাড়ির সামনে রংবাহারি ফুলের গাছ, অর্কিড, কেয়ারি করা বাগান। প্রতিটা বাড়ির জানালা দরজায় সুন্দর লেন্স লাগানো পর্দা ঝুলছে। গুরুং সাহেব গাড়ি থামালেন একটা চায়ের দোকান দেখে। দুটি মেয়ে মিলে একটা চায়ের দোকান চালাচ্ছে। মেয়ে দুটিকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম কাছেই একটা গ্রামে তাদের বাড়ি। নজর গেল চায়ের বাসন গুলোর দিকে। যেন রূপোর মতো ঝকঝক করছে। মেয়েগুলোর পরনে মেখলার পোশাক। আমরা চা খেয়ে আবার এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে।
ডং জন-এর কাছে জানতে চাইলাম এখানকার মানুষের জীবন জীবিকা চলে কি ভাবে ? ও বলল কেউ কেউ গাইডের কাজ করে, কেউ গাড়ি চালায়, সামান্য কিছু চাষবাসও হয়। ফলমূল, শাকসব্জি বিক্রী করে কেউ কেউ দিন গুজরান করেন। জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে শহরে বিক্রী করতে নিয়ে যায় অনেকে। কাছের সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে অনেকে শ্রমিক হিসাবে কাজ করে।
ডং জনের সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে পৌঁছে গেছি তাইরিনা গ্রামে বুঝতেই পারিনি। এখান থেকে গাড়ি আর এগোবে না। হেঁটেই যেতে হবে ‘ডবল ডেকার রুটব্রিজ’ দেখতে। দূরত্ব ২৪০০ ফিট বা ৩ কিলোমিটার। গ্রামের বাড়িগুলোর ভেতর দিয়ে নীচে নামার জায়গা। সমস্ত রাস্তাটার কিছুকিছু অংশ সিঁড়ি করা আছে। বাকি অংশ অপরিসর পাহাড়ি পাথুড়ে রাস্তা। খুবই খাড়াই। মনে হচ্ছে প্রায় সত্তর ডিগ্রি কোণ করে নীচের দিকে নামছি। কোথাও কোথাও দেহের ভারসাম্য রাখতেও সমস্যা হচ্ছে। কখনও সামনের দিকে ঝুঁকে তো কখনো পিছন দিকে হেলে এগিয়ে চলেছি। কিছুটা গিয়েই গ্রামটা শেষ হয়ে গেল। এখানে গ্রাম বলতে বড়জোর পাঁচ-ছটা বাড়ি। দু’পাশে ঘন জঙ্গল আর মাঝখানের সরু খাড়াই রাস্তা দিয়ে আমরা নেমে চলেছি। কিছুদুর এগোনোর পরই মনে হল জঙ্গলের মধ্যখানে আর বোধহয় রাস্তা নেই।
ডং জন বললো এখান দিয়েই আসতে হবে। কিছুর গভীর জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম দূরে একটা পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তার গায়ে ছোট ছোট পাহাড়িয়া গ্রাম জমাট বেঁধে আছে। ডং জন-কে জিজ্ঞাসা করলাম গ্রামটা কতদূরে মৃদু হেসে ছেলেটা উত্তর দিল ‘বহুত দূর’।
ডং জন অনেক ঔষধি গাছ দেখালো। আগাছার মতো গজিয়ে ওঠা এসব গাছ যে এত মূল্যবান সেটা ওর কাছে শুনলাম। যেতে যেতে দেখলাম কোথাও কোথাও প্রচুর সিঙ্কোনা গাছ হয়ে আছে। কোথাও আবার বড় এলাচ। প্রচুর মুলি বাঁশের ঝাড় দেখলাম। ঝকেঝকে ফার্ণ গাছ হয়ে আছে। মাকড়সাগুলো কী ভয়ঙ্কর দেখতে !
কোনোটা কালো, কোনোটা ধূসর, কোনোটা নীল-হলুদ। আমাদের ওদিকে এসব খুব একটা দেখা যায়না। বিশাল বিশাল রোমশ পা যেন তেড়ে তেড়ে আসছে। গুরুংসাহেব আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “ও মাই গড ! ইজ দিস ট্যারেন্টুলা।” ডংজন আশ্বাস দিল, “নেহি সাহাব, ডরিয়ে মত। কুছ নেহি হোগা।” মাকড়সার জাল হাত দিয়েই সরাতে লাগল ডং জন।
মনে হচ্ছেঅনেকক্ষন ধরে হাঁটছি। আদিম রহস্যময় ভূমির বুক চিরে আমরা কয়েকজন এগিয়ে চলেছি। প্রকৃতি যেন এখানে প্রতিমূহুর্তে রহস্যময়, একটু করে এগোচ্ছি, আর মনে হচ্ছে রাস্তা ফুরিয়ে গেছে। এখানেই দেখা মিলল সেই ভয়ঙ্কর লাল কিড়ালুর। কোথাও কোথাও খুব বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। বিশ্রাম নিয়ে খুব বেশি সময়ও অপচয় করা যাচ্ছেনা। ফিরতে হবে সন্ধের আগেই।
আকাশে সূর্যের তেজ প্রখর হলেও কোথাও কোথাও জঙ্গল এতে ঘন যে তা ভেদ করে সূর্যের আলো আমাদের কাছে পৌঁছতে পারছেনা। বিশালদেহী সব শ্যাওলা ধরা গাছের সারি, নীচে ছোট ছোট আগাছা, ঝোপঝাড় আর পাথুড়ে রাস্তা। চিৎকার করলে নিজের কথা নিজে শোনা যাচ্ছে। দূরে কোথাও একটা জলের আওয়াজ পাচ্ছি। মাঝেমাঝে ঝকেঝকে পাখি ডানা ঝাপটে টি টি করতে করতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া যে নিস্তব্ধতা অনুভূত হচ্ছে, আমার শহর জীবনের মানচিত্রে তা সত্যি বিরল। ডং জন-কে ছাড়া এক পা এগোনোও সম্ভব নয়। এসে পড়েছি এক প্রাকৃতিক গোলকধাঁধার মধ্যে। প্রকৃতিকে না চিনলে যেখান থেকে ফেরা সম্ভব নয়।
এক জায়গায় যাওয়ার পর ডং জন থেমে গেল। চেঁচিয়ে বললো “সামনে রস্যি পুল হ্যাঁয়। থোরা সামহল কে”। দেখলাম পা দেওয়ার জায়গায় চারটে মোটা মোটা হাইটেনশন লোহার তারের মত। কাছে গিয়ে দেখি শিকড় আর তার দিয়ে ব্রিজ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। আর হাত দিয়ে ধরার মতো দু-দিকে দু’টো তার। অনেকটা ভি সেপের। মনে হল আমার হৃদস্পন্দনটা থেমে গেল কিছুক্ষনের জন্য। নীচে অঝোর ধারায় বয়ে চলেছে পাহাড়িয়া নদী। ফেনার মতো সাদা। সাহসে ভর করে যেই না ব্রিজে পা রেখেছি, পুরো ব্রিজ দুলতে শুরু করল। একবার মনে হল এবার মৃত্যু নিশ্চিত। আগে কখনও মৃত্যুভয় এতকাছ থেকে দেখিনি। ভয়ে অনেকে চিৎকার করতে লাগলো। একবার মনে হল ফিরে যাই। এতটা এসে ফিরে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে বোকামি। মনকে সাহস জোগাতে জোগাতে সেতু পাড় হলাম। আরো এক ঘন্টা হাঁটার পর এমন আরো দুটো ব্রিজ পার হতে হল। তারপর পৌঁছে গেলাম আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য ‘Jing Kieng Deingini’— ‘শিকড় ব্রিজ’-এর সামনে। ব্রিজটা ৬৫ ফিট বা ২০ মিটার লম্বা আর প্রায় ৪ ফুট চওড়া। প্রায় একশত বছর বা তারও বেশি পুরানো এই ব্রিজ। এক দিকের পাহাড়ের রবার গাছ থেকে শিকড় বেড় হয়ে খরস্রোতা পাহাড়ি নদী পেরিয়ে তা অন্য পাশের পাহাড়ে গিয়ে মিশেছে। আর এভাবেই তৈরি হয়েছে শিকড়ের ব্রিজ।
অন্যান্য ব্রিজগুলোর থেকে এটার পার্থক্য হল-- এটা দোতলা, সেই জন্যই ‘ডবল ডেকার’। নীচ দিয়ে যে পাহাড়িয়া নদীটি বয়ে চলেছে তার নাম উমাসিয়াং। রুটব্রিজটা যেখানে অবস্থিত তার নিকটবহর্তী গ্রামের নাম ‘নংরিয়াট’। চারিপাশটা পাহাড়ে ঘেরা। শ্যাওল ধরা পাহাড়। একদিকের পাহাড়ে গা বেয়ে কা-লিকাই ঝোড়া অবিশ্রান্তভাবে নদীর উপর পড়ছে। চারিপাশে আবহাওয়া শান্ত শীতল আর চোখের সামনে বিস্ময়। ডং জন বললো একটা রুট ব্রিজ এই রকম আকার পেতে বহু বছর সময় লাগে। শতাব্দী প্রাচীন এই দোতলা শিকড়ের ব্রিজটি প্রাকৃতিক ঝড়-ঝঞ্ঝা-অবক্ষয় পেরিয়ে আজকের এই রূপ ধারণ করেছে।
ব্রিজটার গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম। সত্যি অবিশ্বাস্য ! গাছের মধ্যে তো প্রাণ থাকে এটা যেন পাথর। স্থানীয় গ্রামবাসীরা এই ব্রিজটার উপর দিয়ে যাতায়াত করেন। শিকড়ের শাখা-প্রশাখা বেনুনির মতো চারিদিকে প্যাঁচ খেয়ে খেয়ে একটা দাঁড়াবার বা চলাফেরার মতো জায়গা তৈরি হয়েছে। কখনও কখনও মনে হচ্ছে অসংখ্য বিষধর সাপ কিলবিল করছে। মনের মধ্যে বিস্ময় আবার একটু একটু ভয় নিয়ে সেতুর উপর উঠলাম। চেষ্টা করলাম ঝাঁকিয়ে দেখার। কিন্তু আমি বিফল। আসার পথে যে তিনটে লোহার দড়ির সেতু পেরিয়েছি তার স্থায়িত্ব মজবুতি নিয়ে প্রশ্ন বা দ্বিধা থাকলেও শিকড়ের ব্রীজ নিয়ে কোন দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবকাশ নেই। মনে মনে ভাবলাম প্রকৃতির কাছে আমরা সত্যিই শিশু। যেখানে মানুষ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। প্রকৃতিই বোধ হয় তার সমাধান করে দেয়। আর ‘নংরিয়াট’ গ্রামের অধিবাসীদের জন্য শিকড়ের ব্রীজ সেই আশীর্বাদ। আসার আগে বহু ভেবেছি কিভাবে এই ব্রিজ তৈরী হল, এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই বা কী ! কিন্তু এখানে পৌছানোর পর, শিকড় ব্রিজকে দেখার পর বিস্ময় আর কৌতুহল। ছাড়া কোনো প্রশ্নই থাকে না। যেখানে সবরকম প্রযুক্তি হার মেনেছে প্রকৃতির কাছে।
আমরা শিকড়ের ব্রিজের নীচে পাথড়ের উপর বসে ছিলাম বেশ খানিক্ষন। তখনই লক্ষ্য করলাম ভারতীয় পর্যটকদের তুলনায় বিদেশী পর্যটকরা বেশী ভিড় করছে। রাশিয়া, ইংল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এসেছেন। তাঁদের কেউ ছবি তুলছে, কেউ ছবি আঁকছেন। কেউ আবার শুধুই অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছেন। আমরা একমাত্র ভারতীয় পর্যটক সেই মুহুর্তে যারা উপস্থিত। হাসি মুখে এগিয়ে এলেন এক ফরাসী পর্যটক। নিজের পরিচয় দিলেন জাঁও পাওলো। সুদূর ফ্রান্সে বসেও অগাধ পড়াশুড়া করেছেন ভারতবর্ষের এই অখ্যাত গ্রামের শিকড়ের সেতু নিয়ে। তাঁর কাছেই জানলাম ১৮৪৪ সালে জার্নাল অফ এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলে প্রথম এই রুটব্রিজগুলির কথা জানা যায়। পাওলো ভাঙা ইংরাজীতে আমাদের বললো, ভারতবর্ষ হল ঐতিহ্যের দেশ। ইতিহাস আর সম্পদ এই দেশের প্রতিটা কোণায়। ওর কাছেই শুনেছিলাম জীবন্ত বিস্ময়ের গল্প।
গুরুংসাহেব হঠাৎ তাড়া দিয়ে বললেন এবার ফিরতে হবে। পাওলোকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম বিশ্বের সুদুর এক প্রান্ত ফ্রান্সে বসে একটা ছেলে ভারতবর্ষ নিয়ে যত ভেবেছে, আমার দেশের প্রতি তার মধ্যে যত শ্রদ্ধা সঞ্জিবিত আছে, ভারতকে সে যতটা জানার চেষ্টা করেছে-- আমরা ভারতবাসীরা কি এতটা সচেতন আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে, সম্পদ নিয়ে ?
যাই হোক উপর থেকে নীচে নামতে ২ ঘন্ট মতো সময় লেগেছিল। উঠতে সাড়ে তিন ঘন্টর একটু বেশী। শেষের দিকটা দুর্বিসহ মনে হচ্ছিল। গাছের ডাল ভেঙে তাকে লাঠি করে এগোলাম কিছুটা। আবার কখনও বসে পড়লাম পাথড়ের উপরেই। শেষের আধঘণ্টা প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলাম। অবশেষে যখন পথ শেষ, আমি তখন প্রায় অর্ধচেতন। হাতড়ে হামাগুড়ি দিয়ে ফিরলেও শিকড় ব্রিজের সন্ধানে গিয়ে যা দেখলাম তা মনের মাঝে জ্বলজ্বল করবে চিরকাল।
বিঃদ্রঃ এখন শুনেছি টিকিট কেটে পৌঁছাতে হয়।টুরিস্টদের দৌরাত্ম্যে বেশ কিছু পরিবর্তনও হয়েছে।২০১০ এর সেও আনকোরা আনন্দ আজ না পাওয়া গেলেও,তার সৌন্দর্যে কোনো ঘাটতি নেই।অপূর্ব, বিশ্ময়কর!









Comments
Post a Comment