Barshajapan e Chilapata Mendabari r Jangol
বর্ষাযাপনে চিলাপাতার (মেন্দাবাড়ি)জঙ্গলে
বর্ণালী রায়
ঘড়িতে সবে সন্ধ্যা সাতটা।বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে।ঘুটঘুটে অন্ধকার।কটেজের ছাদে
এত জোড় শব্দ হচ্ছে যেন মনে হচ্ছে ইট,পাটকেল ছুঁড়ে মারছে কেউ।তার উপর ঘনঘন বাজ পড়ছে।
শুনশান কটেজ।একটা ঘরে আমরা দুজন,অন্য ঘরে তালা মারা।সঞ্জয়ও তাড়াতাড়ি রাতের খাবার ঘরে
দিয়ে ঘুমোতে চলে গেছে।ব্যালকনিতে ঝুলানো হ্যারিকেনটা হাওয়ায় এত জোরে দুলছিল যেন মনে হচ্ছিল
এই পড়ে ভেঙে যাবে।আমি হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দিলাম।
ঘরে শুধু দুটো মোমবাতি জ্বলছে।দক্ষিণের জানালাটা
সেই থেকে হাওয়ায় খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে।বৃষ্টিরর ছাট এসে মুখে হাতে গায়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে।মন্দ লাগছে
না।নানান গানের সুর সেই থেকে মনে পাক খাচ্ছে।এই যেমন ধরুন..."এই ঝড় ঝড় মুখর বাদল দিনে...."কিংবা
"এমন দিনে তারে বলা যায়..."।নেহাত গলায় সুর নেই নইলে এমন পরিবেশে গান গাওয়াটা বা পাওয়াটা
অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আমরা আজ সকালে এসে পৌঁছেছি মেন্দাবাড়ি জঙ্গল ক্যাম্পে।
চিলাপাতার জঙ্গল দেখতে
এসেছি।এই জঙ্গলটা একটু অন্যরকম। একদিকে জলদাপাড়া ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঞ্চুয়ারী অন্যদিকে
বক্সা টাইগার রিজার্ভ। মাঝের হাতি চলাচলের এই গ্রীন করিডোরটাই চিলাপাতা।এখনো এখানে জঙ্গল
গভীর থেকে গভীরতর। একেবারে আনকোরা, কুমারী জঙ্গল।
আলিপুরদুয়ারে নামার পর থেকেই দেখছি আকাশের মুখ ভার।ড্রাইভার দাদা বলল জঙ্গলে এবার
আগে ভাগেই বর্ষা নেমেছে।মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল।যেতে হবে ২৮কিমি পথ।অভ্যাসবশত গাড়িতে
উঠেই ড্রাইভার দাদাকে রেডিও অন করতে বললাম।চালাতেই শ্রীকান্ত আচার্যের গলায় ভেসে উঠল....
আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম..."।মন ভাল করাএকের পর এক প্রেমের গানে
সফর চলল।দমনপুর,গরমবস্তি,নিমতি পেরিয়ে গাড়ি পিচ রাস্তা ছেড়ে বাঁ হাতে জঙ্গলের পথে ঢুকে গেল।
কাঁদাপথ ধরে একটা ছোট কাঠের সাঁকো পেরিয়ে গাড়ি এসে থামল মেন্দাবাড়ি জঙ্গল ক্যাম্পের সামনে।
ব্রিটিশ আমলের একটা কাঠের বাংলোকে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কাঠ,বাঁশ,বেত,ইট দিয়ে মেরামতি করে আধুনিক
রূপ দেওয়া হয়েছে।
একটা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ঘর। সাথে লাগোয়া ব্যালকনি।কেয়ারটেকার সঞ্জয় ছেত্রী আমাদের
মালপত্র ঘরে পৌঁছে চা,জলখাবারের ব্যবস্থা করতে গেছে।এদিকে এক দু ফোঁটা বৃষ্টিও শুরু হয়েছে।কটেজের
পিছন দিকটায় গামহার,জারুল,কৃষ্ণচূড়া,খয়ের,বাবলা,অমলতাস আরো নাম না জানা গাছের পাঁচমিশালি
জঙ্গল।আর আছে প্রায় মজে যাওয়া বুড়ি নদী।
চায়ের কাপ হাতে ব্যালকনিতে বসেছি।দূর থেকে মনে হচ্ছে আকাশের মেঘে যেন কতরকম আকিঁবুকিঁ কাটা।
কোন মেঘ যেন হাতির মত শূঁড় উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কোনটা আবার দাঁড়ি বুড়ো। ছোটবেলায় খেলার ছলে
এমন কত নাম দিতাম মেঘেদের।যে মেঘ শৈশব ফিরিয়ে দেয় তাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলাম না।বেশ জোর
নামলো বৃষ্টিটা।সঞ্জয়কে বললাম কটেজে যখন অন্য কোনো গেষ্ট নেই তখন ভাতের বদলে গরম খিচুরি আর
ডিম ভাজা হোক।বৃষ্টি হবে আর বাঙালি খিচুড়ি খাবে না, তা হয়।
খাওয়া সেরে ব্যালকনীতে রাখা বেতের চেয়ারে বসে বসে বৃষ্টি দেখছি। একটা মেঘলা দিনে অলস বৃষ্টি যাপন।
এর আগে তেমন ভাবে জঙ্গলে বৃষ্টি দেখা হয়নি।জঙ্গল যেন আরো আদিম হয়ে উঠছে।হাওয়ায় একটা সুন্দর
গন্ধ পাচ্ছি সেই থেকে।কোনো বুনো ফুল হতে পারে কিংবা ভেজা মাটি,আবার গাছের গন্ধ ও হতে পারে।
ব্যালকনির কার্নিশ বেয়ে বেয়ে জলের বিন্দুগুলো একটার সাথে আরেকটা লেগে বড় হচ্ছে আর টুপটাপ শব্দে
মাটিতে পড়ছে।কখোন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই নেই।সঞ্জয়ের ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল।চা নিয়ে এসেছে ও।
সন্ধ্যে নেমে এসেছে। বৃষ্টিটাও ধরে এসেছে।ঝি ঝি পোকার ডাকে জঙ্গল ক্যাম্প মুখরিত।সঞ্জয়কে বললাম কাল
জঙ্গল দেখতে যাব।গাড়ি, পারমিট সব ব্যবস্থা ওরাই করে।দেখছি বলে চলে গেল সঞ্জয়।সেই দুপুর থেকেই
কারেন্ট অফ।ব্যালকনিতে একটা হ্যারিকেন ঝুলছে।চারিপাশ ঘন কালো অন্ধকার। নানাধরনের অজানা
আওয়াজ ভেসে আসছে।বেশি শুনতে পাচ্ছি ব্যঙেদের আওয়াজ। একজন ডাকছে অন্যজন সাড়া দিচ্ছে,আবার
সে চুপ তো অন্যজন। প্রায় সাতটা নাগাদ প্রবল বৃষ্টি নামল সঙ্গে ঝড়।মাঝে মাঝে বেশ ভয় ভয় করছে।একে
গভীর জঙ্গল,তার উপর প্রবল বর্ষন।কটেজের মাথায় দুমদাম আওয়াজ। চমকে দিচ্ছে থেকে থেকে।ছুটে
জানালা বন্ধ করতে গিয়ে এদিকের জানালার কপাট ধড়াস করে খুলে গেল,ব্যালকনির হ্যারিকেনটা জোর জোর
দুলতে লাগল।সব মিলিয়ে বেশ একটা গা ছমছম পরিবেশ।
মুরগির ঝোল আর রুটি দিয়ে রাতের খাবার সেরে বিছানায় চলে গেলাম।রিনিরিনি বৃষ্টির তালে তাল মেলাতে
মেলাতে ঘুম নেমে এল চোখ জুড়ে।
ভোর রাতে ভেঙে গেল ঘুমটা।ঘড়ি দেখলাম সাড়ে চারটে।একটা পাতলা চাদড় জড়িয়ে বারান্দায় এসে
বসলাম।বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছে।বৃষ্টি থেমেছে।গাছের পাতা থেকে,কার্নিশ বেয়ে বৃষ্টির জল পড়ার শব্দ।
এখনো বেশ অন্ধকার। পাখিরা ডাকছে।ধিরে ধিরে আলো ফুটছে।আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে।সিঁড়ি দিয়ে নেমে
কটেজের বাইরে পা বাড়ালাম।এক দু পা এগোতেই কাদাজল পা ভরে গেল।যত্রতত্র গাছের ডাল,পাতা
ছড়িয়ে আছে।চলে এসেছি সেই কাঠের সাঁকোটার কাছে।নীচ দিয়ে একটা নদী গেছে।ওরা বলে গরুমারা
নদী।সবে ভাবছি সাঁকোটাতে অয়া ঝুলিয়ে বসবো। পিছন থেকে সঞ্জয়ের ডাক।এখানে নাকি
প্রায়ই চিতা আসে জল খেতে।তাই বসাটা ঠিক নয়।অগত্যা! ফিরে এসে সাফারিতে যাব বলে রেডি হতে
লাগলাম।
জিপ চলে এসেছে।হুড খোলা জিপ।বৃষ্টি এলে পুরো কাক ভেজা হব..."ছায়া ঘনায়িছে বনে বনে...."।জিপের
সাথে ড্রাইভার আর গাইড সুনীল সিং।বন্দুক আর কুকরি নিয়ে রেডি।।আমি বললাম ও বাবা আবার
এসব লাগবে নাকি?।সুনীল বলল,জঙ্গল ঘনা হ্যায় ম্যাডাম।কাল সারাদিন সারারাত বৃষ্টিতে ভিজেছে
জঙ্গল।গাছ গাছালী ধুলো ঝেড়ে আরো সবুজ ও সতেজ।যত ভেতরে যাচ্ছি রাস্তা আরো অপরিসর হচ্ছে।জঙ্গল
যেন কিছুতেই ঢুকতে দেবে না।পাছে তার রহস্য ধরা পড়ে যায়।রাস্তা অপরিসর।ড্রাইভার আর সুনীল সিং
মাঝেমধ্যেই নেমে কুকরি দিয়ে গাছের ডাল কেটে পরিষ্কার করছে।অনেক জায়গায় যাওয়ার পথে ডাল ভেঙে
পড়ে আছে।আমাদের ওরা কিছুতেই গাড়ি থেকে নামতে দিচ্ছে না।ভেতর দিকে যত যাচ্ছি জঙ্গল তত নিশ্ছিদ্র।
শুনলাম বিকেল চারটের পর থেকে আলো ঢোকে না।দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে।বিশাল বিশাল গাছের গায়ে পুরু
শ্যাওলা। আবার গাছের ঝুড়ির উপর শ্যাওলা পড়ে ইংরাজি সব বর্ণমালা তৈরি হয়েছে।ভারি মজার সে দৃশ্য। যেন
A,D,U,S এইসব বর্ণ গাছের ডালে ঝুলে আছে।
আমাদের জিপ টা এসে থামলো তোর্সা নদীর ধারে একটা নজর মিনারের সামনে।এর ডানদিকেই বিট অফিস।
আমরা নজর মিনারে উঠে বসলাম।যতদূর চোখ যায় তোর্সা নদী।ওপারের জঙ্গলটাই জলদাপাড়া।নদীতে কুনকী
হাতিরা স্নান করছে।একটা বাচ্চা ছেলে মাহুত। হাতির শূড়ে চেপে পিঠে উঠছে,মাথায় উঠছে আবার নামছে।জোর
বৃষ্টি এল।প্রকৃতি তার মোহিনী রূপে সবাইকে ভুলিয়ে দেয়।শহুরে মোড়কের বাইরে বেড়িয়ে মন বলছে চল
ভিজি।বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন হিরের মতো চকচক করছে সূর্যের আলো পড়ে।আকাশের বুক চিড়ে বৃষ্টি বিন্দু
জলের বুকে আলপনা আঁকছে।লম্বা লম্বা সবুজ ঘাসের ডগাগুলো হাওয়ায় লুটিয়ে পড়ছে আবার সোজা হয়ে
যাচ্ছে।বৃষ্টি এখন ইলশে গুঁড়ি।ফেরার পথে সুনীল সিং একটা ভাঙা দূর্গের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প বলছিল।এটার
নাম নল রাজার গড়।গুপ্ত যুগে, আনুমানিকভাবে পঞ্চম শতকে এটা তৈরি হয়েছিল।মানে প্রায় ২০০০ বছরের
পুরানো একটা ইতিহাস।শোনা যায় নিজের সেনাদের ভূটানি রাজার হাত থেকে রক্ষা করতে গভীর এই জঙ্গলে
গড় তৈরি করেছিলেন রাজা।এখন তো শুধুই ভাঙা পাঁচিল,দেওয়াল,ইট পাথরের টুকরো।ভেঙে যাওয়া ইটের
কুলুঙ্গী কাল রাতের ঝড়ে আরো বিপর্যস্ত।এত বছরের প্রাচীন দূর্গ।সব শেষ হয়,কিন্তু ইতিহাসের মৃত্যু নেই।না
জানি কত রহস্য,কত শৌর্য,নল দময়ন্তির প্রেম,যাবতীয় পুরাকীর্তির ইতিহাস বুকে নিয়ে সহস্রাধিক বছর ধরে
গভীর জঙ্গলে বাস এই কুহেলীর।আমরা নামতে চাইলাম।
সুনীল সিং বলল,সাপ হোগা।যেই বলা সাথে সাথেই
দেখি কালো হলুদ ছোপ ছোপ সাপ ভিজে ইটের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে অন্য একটা ইটের ফাঁকে ঢুকে গেল।
জিপ চলছে।অজস্র জঙ্গল ট্রেইল চারিদিকে।মাঝে মাঝেই শুনতে পাচ্ছি পাখির ডানা ঝাপ্টানো।রং বেরং
এর প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে।ভিজে লেপ্টে গায়ে বসছে আবার উড়ে পালাচ্ছে।গাছের ডালে পাখিরা বাসা
মেরামতিতে ব্যস্ত।দূর থেকে দেখছি একটা গাছে ভর্তি লাল লাল ফুল।গাছটা বৃষ্টিতে নুয়িয়ে পড়েছে মাটিতে।
দেখে মনে হচ্ছে যেন গাছটা লাল বেনারসিতে সেজেছে যার গায়ের পাতা গুলো যেন সবুজ মিনাকারী।
জঙহল দেখা কি আর শেষ হয়।প্রতি বাঁকেই যেন নতুন কোনো রহস্য।সুনীল বলল বৃষ্টিতে জীব জন্তু দেখা
পাওয়া যাবেনা।আমি বললাম থাক না ওরা ওদের মতো। আমি তো জঙ্গল দেখতে এসেছি।আর যা দেখছি
তাতে প্রাণ ভরে যাচ্ছে।ঝমঝম করে বৃষ্টি এল।আমরা পুরো কাকস্নান।আদিমতার স্বাদ পেতে নিজেকেও
রাঙাতে হয় প্রকৃতির রঙে।"এসো শ্যামল সুন্দর...."।
মনে হয় প্রায় কটেজের কাছেকাছে চলে এসেছি।সঞ্জয় বাজারের ব্যাগ হাতে ঝপ করে উঠে গেল জিপে।
বলল গাড়ি আমাদের কটেজে নামিয়ে যাবে বাজার করতে।কাছের কোদালবস্তিতে।আমি কটেজে না গিয়ে
ওর পিছু নিলাম।একটা ছোট আদিবাসী গ্রাম।সবাই রাভা জন জাতির।ছোট মতো একটা হাট বসেছে।আমি ঘুরে
দেখছিলাম গ্রাম টা।মাটি আর কাঠের বাড়ি।ছবির মতোন।নিকানো উঠোন।ছবি আঁকা দেওয়াল।কাল রাতে
অনেকের বাড়ির চাল উড়ে গেছে।সারাই চলছে।বাচ্চারা কাদাজল মেখে হুটোপাটি করছে রাস্তায়।কি রে তোদের
স্কুল নেই? যেই বলেছি, মুখের দিকে চেয়ে দে ছুট।
ফেরার পথে দেখে এলাম মথুরা চা বাগানের বস্তি।সঞ্জয় বলল জিপ ছোটাও আবার বৃষ্টির গন্ধ আসছে।
এত জোড় শব্দ হচ্ছে যেন মনে হচ্ছে ইট,পাটকেল ছুঁড়ে মারছে কেউ।তার উপর ঘনঘন বাজ পড়ছে।
শুনশান কটেজ।একটা ঘরে আমরা দুজন,অন্য ঘরে তালা মারা।সঞ্জয়ও তাড়াতাড়ি রাতের খাবার ঘরে
দিয়ে ঘুমোতে চলে গেছে।ব্যালকনিতে ঝুলানো হ্যারিকেনটা হাওয়ায় এত জোরে দুলছিল যেন মনে হচ্ছিল
এই পড়ে ভেঙে যাবে।আমি হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দিলাম।
ঘরে শুধু দুটো মোমবাতি জ্বলছে।দক্ষিণের জানালাটা
সেই থেকে হাওয়ায় খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে।বৃষ্টিরর ছাট এসে মুখে হাতে গায়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে।মন্দ লাগছে
না।নানান গানের সুর সেই থেকে মনে পাক খাচ্ছে।এই যেমন ধরুন..."এই ঝড় ঝড় মুখর বাদল দিনে...."কিংবা
"এমন দিনে তারে বলা যায়..."।নেহাত গলায় সুর নেই নইলে এমন পরিবেশে গান গাওয়াটা বা পাওয়াটা
অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আমরা আজ সকালে এসে পৌঁছেছি মেন্দাবাড়ি জঙ্গল ক্যাম্পে।
চিলাপাতার জঙ্গল দেখতে
এসেছি।এই জঙ্গলটা একটু অন্যরকম। একদিকে জলদাপাড়া ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঞ্চুয়ারী অন্যদিকে
বক্সা টাইগার রিজার্ভ। মাঝের হাতি চলাচলের এই গ্রীন করিডোরটাই চিলাপাতা।এখনো এখানে জঙ্গল
গভীর থেকে গভীরতর। একেবারে আনকোরা, কুমারী জঙ্গল।
আলিপুরদুয়ারে নামার পর থেকেই দেখছি আকাশের মুখ ভার।ড্রাইভার দাদা বলল জঙ্গলে এবার
আগে ভাগেই বর্ষা নেমেছে।মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল।যেতে হবে ২৮কিমি পথ।অভ্যাসবশত গাড়িতে
উঠেই ড্রাইভার দাদাকে রেডিও অন করতে বললাম।চালাতেই শ্রীকান্ত আচার্যের গলায় ভেসে উঠল....
আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম..."।মন ভাল করাএকের পর এক প্রেমের গানে
সফর চলল।দমনপুর,গরমবস্তি,নিমতি পেরিয়ে গাড়ি পিচ রাস্তা ছেড়ে বাঁ হাতে জঙ্গলের পথে ঢুকে গেল।
কাঁদাপথ ধরে একটা ছোট কাঠের সাঁকো পেরিয়ে গাড়ি এসে থামল মেন্দাবাড়ি জঙ্গল ক্যাম্পের সামনে।
ব্রিটিশ আমলের একটা কাঠের বাংলোকে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কাঠ,বাঁশ,বেত,ইট দিয়ে মেরামতি করে আধুনিক
রূপ দেওয়া হয়েছে।
একটা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ঘর। সাথে লাগোয়া ব্যালকনি।কেয়ারটেকার সঞ্জয় ছেত্রী আমাদের
মালপত্র ঘরে পৌঁছে চা,জলখাবারের ব্যবস্থা করতে গেছে।এদিকে এক দু ফোঁটা বৃষ্টিও শুরু হয়েছে।কটেজের
পিছন দিকটায় গামহার,জারুল,কৃষ্ণচূড়া,খয়ের,বাবলা,অমলতাস আরো নাম না জানা গাছের পাঁচমিশালি
জঙ্গল।আর আছে প্রায় মজে যাওয়া বুড়ি নদী।
চায়ের কাপ হাতে ব্যালকনিতে বসেছি।দূর থেকে মনে হচ্ছে আকাশের মেঘে যেন কতরকম আকিঁবুকিঁ কাটা।
কোন মেঘ যেন হাতির মত শূঁড় উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কোনটা আবার দাঁড়ি বুড়ো। ছোটবেলায় খেলার ছলে
এমন কত নাম দিতাম মেঘেদের।যে মেঘ শৈশব ফিরিয়ে দেয় তাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলাম না।বেশ জোর
নামলো বৃষ্টিটা।সঞ্জয়কে বললাম কটেজে যখন অন্য কোনো গেষ্ট নেই তখন ভাতের বদলে গরম খিচুরি আর
ডিম ভাজা হোক।বৃষ্টি হবে আর বাঙালি খিচুড়ি খাবে না, তা হয়।
খাওয়া সেরে ব্যালকনীতে রাখা বেতের চেয়ারে বসে বসে বৃষ্টি দেখছি। একটা মেঘলা দিনে অলস বৃষ্টি যাপন।
এর আগে তেমন ভাবে জঙ্গলে বৃষ্টি দেখা হয়নি।জঙ্গল যেন আরো আদিম হয়ে উঠছে।হাওয়ায় একটা সুন্দর
গন্ধ পাচ্ছি সেই থেকে।কোনো বুনো ফুল হতে পারে কিংবা ভেজা মাটি,আবার গাছের গন্ধ ও হতে পারে।
ব্যালকনির কার্নিশ বেয়ে বেয়ে জলের বিন্দুগুলো একটার সাথে আরেকটা লেগে বড় হচ্ছে আর টুপটাপ শব্দে
মাটিতে পড়ছে।কখোন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই নেই।সঞ্জয়ের ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল।চা নিয়ে এসেছে ও।
সন্ধ্যে নেমে এসেছে। বৃষ্টিটাও ধরে এসেছে।ঝি ঝি পোকার ডাকে জঙ্গল ক্যাম্প মুখরিত।সঞ্জয়কে বললাম কাল
জঙ্গল দেখতে যাব।গাড়ি, পারমিট সব ব্যবস্থা ওরাই করে।দেখছি বলে চলে গেল সঞ্জয়।সেই দুপুর থেকেই
কারেন্ট অফ।ব্যালকনিতে একটা হ্যারিকেন ঝুলছে।চারিপাশ ঘন কালো অন্ধকার। নানাধরনের অজানা
আওয়াজ ভেসে আসছে।বেশি শুনতে পাচ্ছি ব্যঙেদের আওয়াজ। একজন ডাকছে অন্যজন সাড়া দিচ্ছে,আবার
সে চুপ তো অন্যজন। প্রায় সাতটা নাগাদ প্রবল বৃষ্টি নামল সঙ্গে ঝড়।মাঝে মাঝে বেশ ভয় ভয় করছে।একে
গভীর জঙ্গল,তার উপর প্রবল বর্ষন।কটেজের মাথায় দুমদাম আওয়াজ। চমকে দিচ্ছে থেকে থেকে।ছুটে
জানালা বন্ধ করতে গিয়ে এদিকের জানালার কপাট ধড়াস করে খুলে গেল,ব্যালকনির হ্যারিকেনটা জোর জোর
দুলতে লাগল।সব মিলিয়ে বেশ একটা গা ছমছম পরিবেশ।
মুরগির ঝোল আর রুটি দিয়ে রাতের খাবার সেরে বিছানায় চলে গেলাম।রিনিরিনি বৃষ্টির তালে তাল মেলাতে
মেলাতে ঘুম নেমে এল চোখ জুড়ে।
ভোর রাতে ভেঙে গেল ঘুমটা।ঘড়ি দেখলাম সাড়ে চারটে।একটা পাতলা চাদড় জড়িয়ে বারান্দায় এসে
বসলাম।বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছে।বৃষ্টি থেমেছে।গাছের পাতা থেকে,কার্নিশ বেয়ে বৃষ্টির জল পড়ার শব্দ।
এখনো বেশ অন্ধকার। পাখিরা ডাকছে।ধিরে ধিরে আলো ফুটছে।আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে।সিঁড়ি দিয়ে নেমে
কটেজের বাইরে পা বাড়ালাম।এক দু পা এগোতেই কাদাজল পা ভরে গেল।যত্রতত্র গাছের ডাল,পাতা
ছড়িয়ে আছে।চলে এসেছি সেই কাঠের সাঁকোটার কাছে।নীচ দিয়ে একটা নদী গেছে।ওরা বলে গরুমারা
নদী।সবে ভাবছি সাঁকোটাতে অয়া ঝুলিয়ে বসবো। পিছন থেকে সঞ্জয়ের ডাক।এখানে নাকি
প্রায়ই চিতা আসে জল খেতে।তাই বসাটা ঠিক নয়।অগত্যা! ফিরে এসে সাফারিতে যাব বলে রেডি হতে
লাগলাম।
জিপ চলে এসেছে।হুড খোলা জিপ।বৃষ্টি এলে পুরো কাক ভেজা হব..."ছায়া ঘনায়িছে বনে বনে...."।জিপের
সাথে ড্রাইভার আর গাইড সুনীল সিং।বন্দুক আর কুকরি নিয়ে রেডি।।আমি বললাম ও বাবা আবার
এসব লাগবে নাকি?।সুনীল বলল,জঙ্গল ঘনা হ্যায় ম্যাডাম।কাল সারাদিন সারারাত বৃষ্টিতে ভিজেছে
জঙ্গল।গাছ গাছালী ধুলো ঝেড়ে আরো সবুজ ও সতেজ।যত ভেতরে যাচ্ছি রাস্তা আরো অপরিসর হচ্ছে।জঙ্গল
যেন কিছুতেই ঢুকতে দেবে না।পাছে তার রহস্য ধরা পড়ে যায়।রাস্তা অপরিসর।ড্রাইভার আর সুনীল সিং
মাঝেমধ্যেই নেমে কুকরি দিয়ে গাছের ডাল কেটে পরিষ্কার করছে।অনেক জায়গায় যাওয়ার পথে ডাল ভেঙে
পড়ে আছে।আমাদের ওরা কিছুতেই গাড়ি থেকে নামতে দিচ্ছে না।ভেতর দিকে যত যাচ্ছি জঙ্গল তত নিশ্ছিদ্র।
শুনলাম বিকেল চারটের পর থেকে আলো ঢোকে না।দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে।বিশাল বিশাল গাছের গায়ে পুরু
শ্যাওলা। আবার গাছের ঝুড়ির উপর শ্যাওলা পড়ে ইংরাজি সব বর্ণমালা তৈরি হয়েছে।ভারি মজার সে দৃশ্য। যেন
A,D,U,S এইসব বর্ণ গাছের ডালে ঝুলে আছে।
আমাদের জিপ টা এসে থামলো তোর্সা নদীর ধারে একটা নজর মিনারের সামনে।এর ডানদিকেই বিট অফিস।
আমরা নজর মিনারে উঠে বসলাম।যতদূর চোখ যায় তোর্সা নদী।ওপারের জঙ্গলটাই জলদাপাড়া।নদীতে কুনকী
হাতিরা স্নান করছে।একটা বাচ্চা ছেলে মাহুত। হাতির শূড়ে চেপে পিঠে উঠছে,মাথায় উঠছে আবার নামছে।জোর
বৃষ্টি এল।প্রকৃতি তার মোহিনী রূপে সবাইকে ভুলিয়ে দেয়।শহুরে মোড়কের বাইরে বেড়িয়ে মন বলছে চল
ভিজি।বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন হিরের মতো চকচক করছে সূর্যের আলো পড়ে।আকাশের বুক চিড়ে বৃষ্টি বিন্দু
জলের বুকে আলপনা আঁকছে।লম্বা লম্বা সবুজ ঘাসের ডগাগুলো হাওয়ায় লুটিয়ে পড়ছে আবার সোজা হয়ে
যাচ্ছে।বৃষ্টি এখন ইলশে গুঁড়ি।ফেরার পথে সুনীল সিং একটা ভাঙা দূর্গের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প বলছিল।এটার
নাম নল রাজার গড়।গুপ্ত যুগে, আনুমানিকভাবে পঞ্চম শতকে এটা তৈরি হয়েছিল।মানে প্রায় ২০০০ বছরের
পুরানো একটা ইতিহাস।শোনা যায় নিজের সেনাদের ভূটানি রাজার হাত থেকে রক্ষা করতে গভীর এই জঙ্গলে
গড় তৈরি করেছিলেন রাজা।এখন তো শুধুই ভাঙা পাঁচিল,দেওয়াল,ইট পাথরের টুকরো।ভেঙে যাওয়া ইটের
কুলুঙ্গী কাল রাতের ঝড়ে আরো বিপর্যস্ত।এত বছরের প্রাচীন দূর্গ।সব শেষ হয়,কিন্তু ইতিহাসের মৃত্যু নেই।না
জানি কত রহস্য,কত শৌর্য,নল দময়ন্তির প্রেম,যাবতীয় পুরাকীর্তির ইতিহাস বুকে নিয়ে সহস্রাধিক বছর ধরে
গভীর জঙ্গলে বাস এই কুহেলীর।আমরা নামতে চাইলাম।
সুনীল সিং বলল,সাপ হোগা।যেই বলা সাথে সাথেই
দেখি কালো হলুদ ছোপ ছোপ সাপ ভিজে ইটের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে অন্য একটা ইটের ফাঁকে ঢুকে গেল।
জিপ চলছে।অজস্র জঙ্গল ট্রেইল চারিদিকে।মাঝে মাঝেই শুনতে পাচ্ছি পাখির ডানা ঝাপ্টানো।রং বেরং
এর প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে।ভিজে লেপ্টে গায়ে বসছে আবার উড়ে পালাচ্ছে।গাছের ডালে পাখিরা বাসা
মেরামতিতে ব্যস্ত।দূর থেকে দেখছি একটা গাছে ভর্তি লাল লাল ফুল।গাছটা বৃষ্টিতে নুয়িয়ে পড়েছে মাটিতে।
দেখে মনে হচ্ছে যেন গাছটা লাল বেনারসিতে সেজেছে যার গায়ের পাতা গুলো যেন সবুজ মিনাকারী।
জঙহল দেখা কি আর শেষ হয়।প্রতি বাঁকেই যেন নতুন কোনো রহস্য।সুনীল বলল বৃষ্টিতে জীব জন্তু দেখা
পাওয়া যাবেনা।আমি বললাম থাক না ওরা ওদের মতো। আমি তো জঙ্গল দেখতে এসেছি।আর যা দেখছি
তাতে প্রাণ ভরে যাচ্ছে।ঝমঝম করে বৃষ্টি এল।আমরা পুরো কাকস্নান।আদিমতার স্বাদ পেতে নিজেকেও
রাঙাতে হয় প্রকৃতির রঙে।"এসো শ্যামল সুন্দর...."।
মনে হয় প্রায় কটেজের কাছেকাছে চলে এসেছি।সঞ্জয় বাজারের ব্যাগ হাতে ঝপ করে উঠে গেল জিপে।
বলল গাড়ি আমাদের কটেজে নামিয়ে যাবে বাজার করতে।কাছের কোদালবস্তিতে।আমি কটেজে না গিয়ে
ওর পিছু নিলাম।একটা ছোট আদিবাসী গ্রাম।সবাই রাভা জন জাতির।ছোট মতো একটা হাট বসেছে।আমি ঘুরে
দেখছিলাম গ্রাম টা।মাটি আর কাঠের বাড়ি।ছবির মতোন।নিকানো উঠোন।ছবি আঁকা দেওয়াল।কাল রাতে
অনেকের বাড়ির চাল উড়ে গেছে।সারাই চলছে।বাচ্চারা কাদাজল মেখে হুটোপাটি করছে রাস্তায়।কি রে তোদের
স্কুল নেই? যেই বলেছি, মুখের দিকে চেয়ে দে ছুট।
ফেরার পথে দেখে এলাম মথুরা চা বাগানের বস্তি।সঞ্জয় বলল জিপ ছোটাও আবার বৃষ্টির গন্ধ আসছে।












Comments
Post a Comment