Silary Gaon
রূপসী সিলারি
বর্ণালী রায়
আজ যে জায়গার গল্প বলব সেটা এখন লোকজন আকচার যাচ্ছে আসছে।কিন্তু আমি যেবার প্রথম এই গ্রামে গেছিলাম তখন সেটা কুমারী গ্রাম ছিল।আজ থেকে বছর দশ আগের কথআ।তখন সবে সবে একা একা বেড়িয়ে পড়ছি ব্যাগ কাঁধে।
ক্লান্ত শরীর, আর ধস্ত মনটাকে যখন বয়ে নিয়ে চলা দায় হয়ে ওঠে তখন দুরন্ত গতিকে বারবার ছুটে যাই জঙ্গলে, পাহাড়েপ্রকৃতির নিশ্ছিদ্র গহনতার মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করতে৷ প্রতিবারের মতো এবারও উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে একইরকমই উন্মাদনা অনুভব করছিলাম৷ আমার প্রাণের শহর৷ এর প্রতিটি জনপদের প্রতি আমার অপার আকর্ষণ৷ এবার গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গও সিকিমের সীমানার কাছাকাছি বঙ্গের প্রান্তীয় জনপদ, নাম সিলারি গাঁও৷ সিলারি কথাটির অর্থ এমন একটি জনপদ যেখানে প্রচুর পরিমাণে গাছ জন্মায়৷ এই অঞ্চলটিতে প্রচুর সিঙ্কোনা গাছ দেখা যায়৷ বহু প্রাচীনকাল থেকে এই অঞ্চলটিই সিনকোনা উৎপাদনের প্রাণ কেন্দ্র৷
শান্ত নিরিবিলি জনপদটিতে মোটামুটি ৩০ ঘর মানুষের বাস৷ দীনতা এদের নিত্যসঙ্গী৷ কিন্তু আতিথেয়তা এদের মজ্জাগত৷ তাই তো লেপচা, গোর্খা, নেপালী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ঘরের মানুষ৷ এদের অর্থনৈতিক অবস্থান যতই প্রান্তীয় হোক না কেন মনের দিক থেকে এরা বড়ই উদার৷ এদের রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় গৃহের অন্দর ও বাহির সজ্জায়৷ সুসজ্জিত ফুলের বাগান৷
পরিচ্ছন্ন ঘরবাড়ি৷সিলারি গাঁওয়ের বিশেষত্ব কাঞ্চনজঙ্ঘা৷ পশিচ্মবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ৷ সিলারি গাঁও যেন ব্যালকনি যেখানে থেকে প্রায় ১৮০০ কোণের সুদৃশ্য বরফের পাহাড়ের চূড়াগুলি চোখে পড়ে৷ পরস্পর জুড়ে থাকা বরফের পাহাড়ের চূড়ায় সূর্য়ের আলো পড়ে বিচ্ছুরিত জীবিকাই হল সিনকোনা চাষ৷ এছাড়াই বড় এলাচ, ভুট্টা, সবজিচাষও হয়৷ কিছু সময় যাবৎ স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটন শিল্পকেও জীবিকা হিসেব বেছে নিয়েছেন৷
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশেনে নামতেই সবুজের হাতছানি আমার মনকে চঞ্চল করে তোলে৷ তাই প্রতিবারের মতো এবারও নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের বড় ফুটব্রিজটাতে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিলাম তাঁর শোভা যদি একটুও নজরে আসে৷ কোন একবার উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে এই ফুটব্রিজে দাঁড়িয়েই সৌভাগ্য হয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্ত তুষার শৃঙ্গ দেখবার৷ তাই সেই থেকে এখানে এলে প্রতিবারই চেষ্টা চালাই৷ কিন্তু এবার হল না৷ নেমে থেকেই দেখছি আকাশের মুখ ভার৷ তাই কিছুটা মন খারাপ করেই এগিয়ে এলাম স্টেশনের বাইরে৷ স্টেশনের বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল মণি৷ ফোনে যোগাযোগ করতেই হাসিমুখে মণি থাপা এগিয়ে এসে আমাদের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে নিল৷ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছেড়ে, শিলিগুড়ি শহর পার করে সালুগাড়া পেরিয়ে গাড়ি ছুটে চলল মহানন্দা অভয়ারণ্যের বুক চিড়ে তিস্তা নদীকে কখনো ডানদিকে, কখনো বাঁদিকে রেখে দুরন্ত গতিতে মণির গাড়ি এগিয়ে চলল৷
পাহাড়ে যতবার আসি এদের অনেক বিষয়ের মধ্যে গাড়ি চালানোর একটা বিষয় আমার খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করে৷ সেটা হল পারস্পরিক সহযোগিতা৷ এইদিকে উঁছু পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ৷ অপরিসর রাস্তা, কিন্তু একে অন্যকে জায়গা করে দিয়ে, সহযোগিতা করে গাড়ি চালায়৷ শহরে এই দৃশ্য বিরল৷ আমরা যারা শিক্ষিত শহরে মানুষ তারা এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি যে, সত্যিকারের এই মানবিক গুণগুলিও অতিরিক্ত পাওনা বলে মনে হয়৷
যাই হোক আমাদের গাড়ি কালিম্পং শহরের বুক চিরে আলগোড়া, পেডাংকে পার করে সিলারি গাঁওয়ের দিকে এগোতে লাগল৷
সিলারি গাঁও প্রবেশের ৪ কিলোমিটার রাস্তাটি খুবই পাথুরে৷ এবড়ো খেবড়ো বিভিন্ন মাপের ছোট বড় পাথরে তৈরি রাস্তা৷ড্রাইভার মণি মজা করে বলল, ডান্সিং রোড৷ আমরাও গাড়ির ভিতর ডান্স করতে করতে দেববারু ঘেরা রাস্তাটি দিয়ে এসে পৌঁছালাম হোম-স্টে নির্মলা-তে৷ সদর অভিনন্দনে আমাদের জন্য নির্ধারিত কটেজগুলিতে নিয়ে যাওয়া হল৷ কালো সবুজ রং করা কটেজগুলি নিজেরাই ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর৷ প্রতিটি কটেজের সবমনে ছোট বারান্দা৷ বারান্দার সামনে বাহির ফুলের গাছ, রংবেরংয়ের অর্কিড৷ কোন যত্ন ছাড়াই বেড়ে উঠেছে৷ বর্ণ বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে৷
হোম-স্টে-তে সবকার আনন্দ হল একটি পরিবারের মধ্যে তাদের মতো করে থাকা এবং আন্তরিক আপ্যায়নের উষ্ণতা উপলব্ধি করা৷ এই হোমস্টেতে সেহেতু বেশিরভাগ বাঙালি পর্যটকরা সারা বছর ভিড় করে থাকে তাই হোমস্টে-তে খাবারেও বাঙালিয়ানা পাওয়া যায়৷ হোমস্টের কটেজের বারান্দার সামনে পাহাড়ের যেঅংশটি একটু বাইরে বেড়িয়ে আছে, তাকে গ্রিল দিয়ে ঘিরে বসার জায়গা করে দেওয়া৷ এই কটেজগুলি সিলারির অন্যান্য কটেজগুলি থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচুতে অবস্থিত৷ সামনের সবুজ পাহাড়, তার পিছনে আরো পাহাড়, তার পিছনে সার বেঁধে পাহাড়৷ পাহাড়ের গায়ে ছোট গ্রাম যেন ছোটবেলায় সাজানো ঝুলন৷ ঘন সবুজের মাঝে ছোটছোট বাড়ি৷ কোথাও আঁকাবাঁকা পথ৷যার শুরু বা শেষ দেখা যায় না৷ কোথাও সরলরেখা, কোথাও বক্ররেখা, কোথাও বৃত্ত, ভারি সুন্দর লাগে পাহাড়ি পথের এইসব জ্যামিতিক বৈচিত্র্যতা, সিলারি গাঁও প্রকৃতির নিবিড় গহনতার মাঝে এক শান্তির আশ্রয়৷
সকালের রোদে যখন সবুজ পাহাড়ের পিছনে রুপালী চূড়াগুলি চকচক করে ওঠে তখন তাঁর শোভা অবর্ণনীয়৷ আবার রাতের বেলা শীতের চাদর গায়ে যদি কটেজের বারান্দায় বসে থাকা যায় তবে দেখা যায় সামনের পাহাড়ে “জোনাকি গ্রাম’৷ সন্ধে নামতেই আলো জ্বলে ওঠে৷ নক্ষত্রের মতো বা জোনাকির মতো অগুনতি আলো জ্বলজ্বল করে ওঠে৷ অবিন্যস্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামগুলি আলো জ্বালিয়ে নিজেদের অজান্তেই একবিন্যাস সৃষ্টি করে৷ তারপর রাত বাড়তে থাকে৷ একের পর এক সব আলো নিভে যায়৷ শুধু রাতের আকাশের তারারা জেগে থাকে, পাহাড়া দেয় তাদের প্রাণের সিলারিকে৷
যেদিন সিলারি পৌঁছালাম সেদিন সারাদিন এক আনকোড়া সৌন্দর্যকে মনের মাঝে গেঁথে নিলাম৷ সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধে, রাত, তারপর গভীর রাত৷ প্রতিক্ষণে রূপ বদল৷ প্রতিবার নতুন করে সেজে ওঠা৷ দুপুর ও বিকেলের সন্ধিক্ষণটা খুবই সুন্দর৷ মেঘগুলো চালাবাড়ির ছাদে উড়ে এসে বসে পাখির মতো৷ নাম না জানা কত রঙবেরঙের পাখি ডানা মেলে উড়ে যায়৷ যেমন তাদের রূপ তেমন কণ্ঠস্বর৷ এরপর সন্ধে নেমে আসে একের পর এক বাড়িতে আলো জ্বলে ওঠে৷ এই আলো মালা দিয়ে তৈরি জোনাকির গ্রাম৷ সভ্যতা-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির থেকে শতশত মাইল দূরে, গতিময়তাকে পিছনে ফেলে অবিরত টেক্কা দিচ্ছে সিলারি৷ তার রূপমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করছে পথিককে৷ পথিকও অবসর খুঁজে নিতে বারবার ছুটে আসছে সিলারিতে৷
পাইন, ফার, ওক, দেবদারু ঘেরা এক বন্য রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি, গন্তব্য রামিতে ভিউ পয়েন্ট৷
ছোটবেলায় জীবনবিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় পাতা, ফুল, ফল, শিরাবিন্যাস সব অধ্যায়গুলিই আজ চোখের সামনে জীবন্ত৷ একটু চড়াই উতরাই পেরিয়ে ৩ কিলোমিটার যেতেই ভিউপয়েন্টে পৌঁছানো গেল৷ নীচে পাহাড়ি নদীর অসংখ্য গতিপথ৷ পাহাড়ে, উপত্যকায়, সমতলে নানারকম জ্যামিতিক রূপে তার বিন্যাস৷ ঈশ্বর যেন ছোট শিশুর মতো পেন্সিল হাতে আঁকিবুকি কেটেছেন মাটির বুকে৷ যতদূর চোখ যায় ছোট ছোট পাহাড়িয়া গ্রাম, কোথাও ধাপ চাষ, কোথাও ঝরনা, কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে পাহাড়৷ সূর্যের আলোর ছটায় প্রকৃতি আরো সবুজ, আরো সতেজ৷ পাহাড়ের উপর থেকে নীচের দিকে তাকালেই বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে৷ মৃত্যুভয় নয়৷ কেমন যেন অসীমতার মাঝে একলা হারিয়ে যাওয়ার ভয়৷
আমাদের এরপরের গন্তব্যটিও কম রোমাঞ্চকর নয়৷ জঙ্গলের রাস্তা ধরে যায় ডামসিং ফোর্ট৷ স্থানীয় একটি ছেলে রিংচেকে সঙ্গী করে আমরা এগোতে লাগলাম৷ ওর কাছেই শুনলাম৷ এই ফোর্টটি ১৬৯০ সালে তৈরি হয়৷ লেপচা রাজা সাইবো আচুক এই ফোর্টটি তৈরি করেন৷ লেপচা রাজা ভুটানীদের কাছে দুর্গটি হেরে যান৷ পরবর্তী ১৮৬৪ সালে ভূটানীরা অ্যাংলো-ভুটান যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে হেরে যায়৷ বর্তমানে দূর্গটি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে৷ এর অধিক ক্ষতি হয়েছে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ভূমিকম্পে৷ তবুও শতাব্দী প্রাচীন এই দুর্গের ধ্বংসপ্রায় দেওয়াল, কোথাও ভাঙা পাঁচিল, কোথায় ছোট একটা ভাঙা ঘর, কোথাও বা বড় এক পাথরের মাঝে গর্ত ঘিরে অনেক ইতিহাস, অনেক গল্প৷ যা সিলারির মানুষরা বংশপরম্পরায় শুনে এসেছে৷ আজ যা তারা পর্যটকদের শোনাতে পারছে৷ আমাকে সবচেয়ে অবাক পাহাড়ের উপরে একটি মঞ্চ৷
প্রাকৃতিকভাবে নির্মিতও হয়েছে৷ মধ্যের চারপাশে টিলাগুলি এমন হয়ে গে, মনে হচ্ছে ম্ঞ্চকে ঘিরে থাকা হোমস্টে রয়েছে এক একটা গ্যালারি৷ রিংচেনের কাছে শুনলাম যে পথে আমরা ফোর্ট দেখতে এসেছি৷ সেটা প্রকৃতপক্ষে রাজা দূর দেখার আরো একটা শহর৷ ফোর্ট চত্বরে রয়েছে রাজা-রানীর কক্ষের ধ্বংসাবশেষ, রানিদের স্থান সর ইত্যাদি৷ রিনচেন-র কাছেই শুনলাম এখান থেকে নিকটবর্তী শহর হল পেডং৷ তাই কেউ অসুস্থ হলে স্থানীয় ভেষজ দিয়েই চিকিৎসা চালানো হয়৷ এই জঙ্গল মূল্যবান ঔষধি গাছের জন্য পরিচিত৷
সিলারি গাঁও স্বপ্নের গ্রাম৷ যার নির্জনতা, নীল আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া সবুজ পাহাড়, মেঘের সব থেকে মেঘ এসে বৃষ্টির ঝরে পড়া, আদিবাসীদের সারল্য, জোনাকি গ্রাম, আঁকাবাঁকা রাস্তা, জ্যামিতিক নদী—প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটা কবিতা৷ যার কিছুটা খাতায় লেখা যায়, আর কিছুটা থেকে যায় মনের ক্যানভাসে৷
আজকের সিলারি একটু অন্য র।। একটু পেশাদা, জনবহুল।তবুও আমার রূপসী সিলারি আজও মনের কোনে আঁকিবুঁকি কাটে।
বর্ণালী রায়
আজ যে জায়গার গল্প বলব সেটা এখন লোকজন আকচার যাচ্ছে আসছে।কিন্তু আমি যেবার প্রথম এই গ্রামে গেছিলাম তখন সেটা কুমারী গ্রাম ছিল।আজ থেকে বছর দশ আগের কথআ।তখন সবে সবে একা একা বেড়িয়ে পড়ছি ব্যাগ কাঁধে।
ক্লান্ত শরীর, আর ধস্ত মনটাকে যখন বয়ে নিয়ে চলা দায় হয়ে ওঠে তখন দুরন্ত গতিকে বারবার ছুটে যাই জঙ্গলে, পাহাড়েপ্রকৃতির নিশ্ছিদ্র গহনতার মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করতে৷ প্রতিবারের মতো এবারও উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে একইরকমই উন্মাদনা অনুভব করছিলাম৷ আমার প্রাণের শহর৷ এর প্রতিটি জনপদের প্রতি আমার অপার আকর্ষণ৷ এবার গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গও সিকিমের সীমানার কাছাকাছি বঙ্গের প্রান্তীয় জনপদ, নাম সিলারি গাঁও৷ সিলারি কথাটির অর্থ এমন একটি জনপদ যেখানে প্রচুর পরিমাণে গাছ জন্মায়৷ এই অঞ্চলটিতে প্রচুর সিঙ্কোনা গাছ দেখা যায়৷ বহু প্রাচীনকাল থেকে এই অঞ্চলটিই সিনকোনা উৎপাদনের প্রাণ কেন্দ্র৷
শান্ত নিরিবিলি জনপদটিতে মোটামুটি ৩০ ঘর মানুষের বাস৷ দীনতা এদের নিত্যসঙ্গী৷ কিন্তু আতিথেয়তা এদের মজ্জাগত৷ তাই তো লেপচা, গোর্খা, নেপালী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ঘরের মানুষ৷ এদের অর্থনৈতিক অবস্থান যতই প্রান্তীয় হোক না কেন মনের দিক থেকে এরা বড়ই উদার৷ এদের রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় গৃহের অন্দর ও বাহির সজ্জায়৷ সুসজ্জিত ফুলের বাগান৷
পরিচ্ছন্ন ঘরবাড়ি৷সিলারি গাঁওয়ের বিশেষত্ব কাঞ্চনজঙ্ঘা৷ পশিচ্মবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ৷ সিলারি গাঁও যেন ব্যালকনি যেখানে থেকে প্রায় ১৮০০ কোণের সুদৃশ্য বরফের পাহাড়ের চূড়াগুলি চোখে পড়ে৷ পরস্পর জুড়ে থাকা বরফের পাহাড়ের চূড়ায় সূর্য়ের আলো পড়ে বিচ্ছুরিত জীবিকাই হল সিনকোনা চাষ৷ এছাড়াই বড় এলাচ, ভুট্টা, সবজিচাষও হয়৷ কিছু সময় যাবৎ স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটন শিল্পকেও জীবিকা হিসেব বেছে নিয়েছেন৷
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশেনে নামতেই সবুজের হাতছানি আমার মনকে চঞ্চল করে তোলে৷ তাই প্রতিবারের মতো এবারও নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের বড় ফুটব্রিজটাতে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিলাম তাঁর শোভা যদি একটুও নজরে আসে৷ কোন একবার উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে এই ফুটব্রিজে দাঁড়িয়েই সৌভাগ্য হয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্ত তুষার শৃঙ্গ দেখবার৷ তাই সেই থেকে এখানে এলে প্রতিবারই চেষ্টা চালাই৷ কিন্তু এবার হল না৷ নেমে থেকেই দেখছি আকাশের মুখ ভার৷ তাই কিছুটা মন খারাপ করেই এগিয়ে এলাম স্টেশনের বাইরে৷ স্টেশনের বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল মণি৷ ফোনে যোগাযোগ করতেই হাসিমুখে মণি থাপা এগিয়ে এসে আমাদের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে নিল৷ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছেড়ে, শিলিগুড়ি শহর পার করে সালুগাড়া পেরিয়ে গাড়ি ছুটে চলল মহানন্দা অভয়ারণ্যের বুক চিড়ে তিস্তা নদীকে কখনো ডানদিকে, কখনো বাঁদিকে রেখে দুরন্ত গতিতে মণির গাড়ি এগিয়ে চলল৷
পাহাড়ে যতবার আসি এদের অনেক বিষয়ের মধ্যে গাড়ি চালানোর একটা বিষয় আমার খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করে৷ সেটা হল পারস্পরিক সহযোগিতা৷ এইদিকে উঁছু পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ৷ অপরিসর রাস্তা, কিন্তু একে অন্যকে জায়গা করে দিয়ে, সহযোগিতা করে গাড়ি চালায়৷ শহরে এই দৃশ্য বিরল৷ আমরা যারা শিক্ষিত শহরে মানুষ তারা এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি যে, সত্যিকারের এই মানবিক গুণগুলিও অতিরিক্ত পাওনা বলে মনে হয়৷
যাই হোক আমাদের গাড়ি কালিম্পং শহরের বুক চিরে আলগোড়া, পেডাংকে পার করে সিলারি গাঁওয়ের দিকে এগোতে লাগল৷
সিলারি গাঁও প্রবেশের ৪ কিলোমিটার রাস্তাটি খুবই পাথুরে৷ এবড়ো খেবড়ো বিভিন্ন মাপের ছোট বড় পাথরে তৈরি রাস্তা৷ড্রাইভার মণি মজা করে বলল, ডান্সিং রোড৷ আমরাও গাড়ির ভিতর ডান্স করতে করতে দেববারু ঘেরা রাস্তাটি দিয়ে এসে পৌঁছালাম হোম-স্টে নির্মলা-তে৷ সদর অভিনন্দনে আমাদের জন্য নির্ধারিত কটেজগুলিতে নিয়ে যাওয়া হল৷ কালো সবুজ রং করা কটেজগুলি নিজেরাই ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর৷ প্রতিটি কটেজের সবমনে ছোট বারান্দা৷ বারান্দার সামনে বাহির ফুলের গাছ, রংবেরংয়ের অর্কিড৷ কোন যত্ন ছাড়াই বেড়ে উঠেছে৷ বর্ণ বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে৷
হোম-স্টে-তে সবকার আনন্দ হল একটি পরিবারের মধ্যে তাদের মতো করে থাকা এবং আন্তরিক আপ্যায়নের উষ্ণতা উপলব্ধি করা৷ এই হোমস্টেতে সেহেতু বেশিরভাগ বাঙালি পর্যটকরা সারা বছর ভিড় করে থাকে তাই হোমস্টে-তে খাবারেও বাঙালিয়ানা পাওয়া যায়৷ হোমস্টের কটেজের বারান্দার সামনে পাহাড়ের যেঅংশটি একটু বাইরে বেড়িয়ে আছে, তাকে গ্রিল দিয়ে ঘিরে বসার জায়গা করে দেওয়া৷ এই কটেজগুলি সিলারির অন্যান্য কটেজগুলি থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচুতে অবস্থিত৷ সামনের সবুজ পাহাড়, তার পিছনে আরো পাহাড়, তার পিছনে সার বেঁধে পাহাড়৷ পাহাড়ের গায়ে ছোট গ্রাম যেন ছোটবেলায় সাজানো ঝুলন৷ ঘন সবুজের মাঝে ছোটছোট বাড়ি৷ কোথাও আঁকাবাঁকা পথ৷যার শুরু বা শেষ দেখা যায় না৷ কোথাও সরলরেখা, কোথাও বক্ররেখা, কোথাও বৃত্ত, ভারি সুন্দর লাগে পাহাড়ি পথের এইসব জ্যামিতিক বৈচিত্র্যতা, সিলারি গাঁও প্রকৃতির নিবিড় গহনতার মাঝে এক শান্তির আশ্রয়৷
সকালের রোদে যখন সবুজ পাহাড়ের পিছনে রুপালী চূড়াগুলি চকচক করে ওঠে তখন তাঁর শোভা অবর্ণনীয়৷ আবার রাতের বেলা শীতের চাদর গায়ে যদি কটেজের বারান্দায় বসে থাকা যায় তবে দেখা যায় সামনের পাহাড়ে “জোনাকি গ্রাম’৷ সন্ধে নামতেই আলো জ্বলে ওঠে৷ নক্ষত্রের মতো বা জোনাকির মতো অগুনতি আলো জ্বলজ্বল করে ওঠে৷ অবিন্যস্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামগুলি আলো জ্বালিয়ে নিজেদের অজান্তেই একবিন্যাস সৃষ্টি করে৷ তারপর রাত বাড়তে থাকে৷ একের পর এক সব আলো নিভে যায়৷ শুধু রাতের আকাশের তারারা জেগে থাকে, পাহাড়া দেয় তাদের প্রাণের সিলারিকে৷
যেদিন সিলারি পৌঁছালাম সেদিন সারাদিন এক আনকোড়া সৌন্দর্যকে মনের মাঝে গেঁথে নিলাম৷ সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধে, রাত, তারপর গভীর রাত৷ প্রতিক্ষণে রূপ বদল৷ প্রতিবার নতুন করে সেজে ওঠা৷ দুপুর ও বিকেলের সন্ধিক্ষণটা খুবই সুন্দর৷ মেঘগুলো চালাবাড়ির ছাদে উড়ে এসে বসে পাখির মতো৷ নাম না জানা কত রঙবেরঙের পাখি ডানা মেলে উড়ে যায়৷ যেমন তাদের রূপ তেমন কণ্ঠস্বর৷ এরপর সন্ধে নেমে আসে একের পর এক বাড়িতে আলো জ্বলে ওঠে৷ এই আলো মালা দিয়ে তৈরি জোনাকির গ্রাম৷ সভ্যতা-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির থেকে শতশত মাইল দূরে, গতিময়তাকে পিছনে ফেলে অবিরত টেক্কা দিচ্ছে সিলারি৷ তার রূপমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করছে পথিককে৷ পথিকও অবসর খুঁজে নিতে বারবার ছুটে আসছে সিলারিতে৷
পাইন, ফার, ওক, দেবদারু ঘেরা এক বন্য রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি, গন্তব্য রামিতে ভিউ পয়েন্ট৷
ছোটবেলায় জীবনবিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় পাতা, ফুল, ফল, শিরাবিন্যাস সব অধ্যায়গুলিই আজ চোখের সামনে জীবন্ত৷ একটু চড়াই উতরাই পেরিয়ে ৩ কিলোমিটার যেতেই ভিউপয়েন্টে পৌঁছানো গেল৷ নীচে পাহাড়ি নদীর অসংখ্য গতিপথ৷ পাহাড়ে, উপত্যকায়, সমতলে নানারকম জ্যামিতিক রূপে তার বিন্যাস৷ ঈশ্বর যেন ছোট শিশুর মতো পেন্সিল হাতে আঁকিবুকি কেটেছেন মাটির বুকে৷ যতদূর চোখ যায় ছোট ছোট পাহাড়িয়া গ্রাম, কোথাও ধাপ চাষ, কোথাও ঝরনা, কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে পাহাড়৷ সূর্যের আলোর ছটায় প্রকৃতি আরো সবুজ, আরো সতেজ৷ পাহাড়ের উপর থেকে নীচের দিকে তাকালেই বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে৷ মৃত্যুভয় নয়৷ কেমন যেন অসীমতার মাঝে একলা হারিয়ে যাওয়ার ভয়৷
আমাদের এরপরের গন্তব্যটিও কম রোমাঞ্চকর নয়৷ জঙ্গলের রাস্তা ধরে যায় ডামসিং ফোর্ট৷ স্থানীয় একটি ছেলে রিংচেকে সঙ্গী করে আমরা এগোতে লাগলাম৷ ওর কাছেই শুনলাম৷ এই ফোর্টটি ১৬৯০ সালে তৈরি হয়৷ লেপচা রাজা সাইবো আচুক এই ফোর্টটি তৈরি করেন৷ লেপচা রাজা ভুটানীদের কাছে দুর্গটি হেরে যান৷ পরবর্তী ১৮৬৪ সালে ভূটানীরা অ্যাংলো-ভুটান যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে হেরে যায়৷ বর্তমানে দূর্গটি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে৷ এর অধিক ক্ষতি হয়েছে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ভূমিকম্পে৷ তবুও শতাব্দী প্রাচীন এই দুর্গের ধ্বংসপ্রায় দেওয়াল, কোথাও ভাঙা পাঁচিল, কোথায় ছোট একটা ভাঙা ঘর, কোথাও বা বড় এক পাথরের মাঝে গর্ত ঘিরে অনেক ইতিহাস, অনেক গল্প৷ যা সিলারির মানুষরা বংশপরম্পরায় শুনে এসেছে৷ আজ যা তারা পর্যটকদের শোনাতে পারছে৷ আমাকে সবচেয়ে অবাক পাহাড়ের উপরে একটি মঞ্চ৷
প্রাকৃতিকভাবে নির্মিতও হয়েছে৷ মধ্যের চারপাশে টিলাগুলি এমন হয়ে গে, মনে হচ্ছে ম্ঞ্চকে ঘিরে থাকা হোমস্টে রয়েছে এক একটা গ্যালারি৷ রিংচেনের কাছে শুনলাম যে পথে আমরা ফোর্ট দেখতে এসেছি৷ সেটা প্রকৃতপক্ষে রাজা দূর দেখার আরো একটা শহর৷ ফোর্ট চত্বরে রয়েছে রাজা-রানীর কক্ষের ধ্বংসাবশেষ, রানিদের স্থান সর ইত্যাদি৷ রিনচেন-র কাছেই শুনলাম এখান থেকে নিকটবর্তী শহর হল পেডং৷ তাই কেউ অসুস্থ হলে স্থানীয় ভেষজ দিয়েই চিকিৎসা চালানো হয়৷ এই জঙ্গল মূল্যবান ঔষধি গাছের জন্য পরিচিত৷
সিলারি গাঁও স্বপ্নের গ্রাম৷ যার নির্জনতা, নীল আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া সবুজ পাহাড়, মেঘের সব থেকে মেঘ এসে বৃষ্টির ঝরে পড়া, আদিবাসীদের সারল্য, জোনাকি গ্রাম, আঁকাবাঁকা রাস্তা, জ্যামিতিক নদী—প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটা কবিতা৷ যার কিছুটা খাতায় লেখা যায়, আর কিছুটা থেকে যায় মনের ক্যানভাসে৷
আজকের সিলারি একটু অন্য র।। একটু পেশাদা, জনবহুল।তবুও আমার রূপসী সিলারি আজও মনের কোনে আঁকিবুঁকি কাটে।
Comments
Post a Comment