Ochena Purulia r anache kanache
অচেনা পুরুলিয়ার আনাচে কানাচে
@Barnali Roy
ডিজিটাল ইন্ডিয়া বাইরেও একটা ভারতবর্ষ আছে। কিছু মানুষ আছে যাদের অনেকেই গোটা ভারতবর্ষ তো দূরস্থান পশ্চিমবঙ্গে বাস করেও কল্লোলিনী কলকাতার কথাও জানে না। যারা আমাদের এই ভারতবর্ষের মাটিতেই জন্ম নিয়েছে, বসবাস করছে। তাদেরই আদিবাস ভূমি এই মাটি। যাদের আমার সাঁওতাল বলি। যদিও আদিবাসীদের মধ্যেও অনেক ভাগ আছে। কিন্তু আমরা শহুরে তথা কথিত সভ্য মানুষের আদিবাসী মানুষ মানেই বুঝি সাঁওতাল।আজকাল আবার শহুরে বাঙালীর হিরিক উঠেছে গ্রামের মেঠো পথে বেড়াতে যাওয়ার। নাগরিক তকমা মুছতে মরিয়া বাঙালী দোল থেকে পিকনিক সব উৎসব উদযাপনের জন্য বেছেনিচ্ছে লালমাটির দেশকে। দীপুদা (দীঘা,পুরি,দার্জিলিং) ছেড়ে পুরুলিয়া। যদিও ওই দেশের ভূমি পুত্রদের এবিষয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। তারা নিজেদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটুকু নিয়ে দিব্বি আছে। আর আছে তাদের নিজস্ব প্রথা,পরব,মেলা।
আগামনী বর্ষাকে সাথে নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের এক সকালে চার বন্ধু মিলে বেড়িয়ে পড়েছি। নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যানিং নেই। পুরুলিয়াকে কাছ থেকে দেখবো কটাদিন। আর যদি কোন মেলা পরব দেখা যায়। আরছিল একটা সুপ্ত বাসন। অযোধ্যা পাহাড়ে বৃষ্টি দেখবো। সে যাই হোক সেটা তো প্রকৃতির মেজাজ।
খোঁজ পেয়ে একটা মেলা দেখতে গিয়েছিলাম পুরুলিয়ার চাকোলতোড় গ্রামে। ছাতা প্রব। আসানসোল টাটানগর লাইনে পুরুলিয়ার পরের স্টেশনইনহল টামনা। কয়েকহাত দূরেই ছাতা মেলার মাঠ।
এই ছাতা পরবের শুরুটা নিয়ে বেশ কিছু গল্প শুনতে পেলাম। একদল বলল পঞ্চকোট রাজার সাথে ছাত্নার রাজার যুদ্ধ বাঁধলে পঞ্চকোট রাজা জয়ী হন, তারই বিজয় উৎসব ছাতা পরব। আবার কেউ কেউ বলেন ইংরেজদের বিরূদ্ধে সাঁওতালদের সংগঠিত করে, পঞ্চকোট রাজা যুদ্ধ লড়েছিলেন। শয়ে শয়ে সাঁওতাল একত্রিত হয়ে এই মেলার মাঠে শপথ গ্রহণ করে করে। আর তারই প্রতীক স্বরূপ ছাতা তোলা হয়। তবে গল্প বা ইতিহাস যাই থাকুক না কেন, এই পরবটা যে নিখাদ সাঁওতালদের পরব, তার টের পেলাম। হাজার হাজার মেয়ে, পুরুষ,বাচ্চা,বুড়ো সাঁওতাল দলে হেঁটে, সাইকেলে,ট্রেকারে চেপে ছাতা পরবে আসছে। বিশাল শাল কাঠের ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। আর সেই ম্যারাপের মাঝেই দুটো শাল কাঠকে কপিকল সিস্টেমে এমনভাবে আটকানো হয়েছে, যাতে ছাতাটাকে পতাকার ম্পতো উঁচুতে খাড়া করা যায়। আওসলে সাদা মখমল কাপড়ে মোড়া থাকে আসল ছাতাটা। লোক মুখে শুনলাম ছাতাটা সোনার। সারা বছর ওটা রাজবাড়ির মন্দিরে থাকে। পরবের দুদিন মেলার মাঠে থাকে। বেশ অবাক লাগছিল গল্পগুলো শুনে পঞ্চকোট রাজা নিজে সাঁওতাল না হয়েও এটা সাঁওতাল পরব। পুরোহিত মশাই ওই শালের গুড়ির নীচে বসে কুলদেবতার পূজা করে চলেছে। অবশেষে এওল সেই প্রতীক্ষিত সময়। দেখলাম হৈ হৈ বেঁধে গেছে। কি না রাজা আসছে। রাজা এলেন কাসর,ঘন্টা,শঙ্খ, শিঙা ধামসা,মাদল বাজনা বাজিয়ে। পরনে রাজবেশ, মাথায় পাগরি,পায়ে নাগরাই,কোমরে তলোয়ার গোঁজা। পঞ্চকোট রাজবংশের বর্তমান বংশধর অমিত রায়। সে এক জমজমাট ব্যাপার। ততক্ষণে মেলা ফাঁকা। ছাতার মাঠ উপচে পড়ছে। লোকের মাথা লোক খাচ্ছে। রাজা এসেছেন।এবার ছাতা উঠবে।রাজা এসে প্রশেসন নিয়ে ছাতার চার পাশ ঘুরছেন। পর পর তিন পাক। তারপর সষ্টাঙ্গে কুলদেবতাকে প্রণাম জানালেন। রাজার সাথে উপস্থিত সবাইও প্রনাম করছে। তারপর রাজা সরাসরি হেঁটে চলে গেলেন উঁচু একটা বেদির উপর প্রথমটা বুঝতে পারিনি,তারপর লক্ষ্য করে দেখলাম রাজা একটা সাদা রং এর রুমাল উড়িয়ে দিলেন ছাতার দিকে তাকিয়ে। আরসাথে সাথেই ওই শেগুন কাঠের কপিকলের সাহায্যে ছাতা তোলা হল প্রায় আকাশ ছুঁই ছুঁই। সাথে সাথে হাত তালি দিয়ে জনগন অভিবাদন জানালো। এরপর সবাই মেলার মাঠের দিকে চলে গেল। শুনলাম ছাতাটা নাকি পরেরদিন পর্যন্ত এমনভাবেই থাকে। তারপর আবার ফিরে যায় রাজবাড়িতে। আমরাও গেলাম মেলার মাঠে। দেখলাম সারি সারি দোকান। জিলিপি, তেলেভাজা, কাঁচের চুড়ি, খেলনাপাতির দোকান। আর দেখলাম ধামসা মাদলের দোকান। আর এখানেই মেলার রূপটা বদলে গেল। সার বেঁধে সাজানো আছে ধামসা মাদল। লাল,নিল রংকরা। ছোট বড় নানান মাপের।
মেলার ভিতর দিকে যত এগোচ্ছি মেলার রূপ বদলে যাচ্ছে। নানান ধরনের বিষয় নিয়ে চলছে জুয়া খেলা। সেগুলো কোনটা কোনটা যেমন মজার তেমন কোনটা আবার বিপদজ্জনক। আর ভিড় উপছে পড়ছে সেইসব দোকানে। চলছে সাপের খেলা।ধারালো ছুড়ি পায়ে হাসিল মুরগির যুযুধান লড়াই। পাহুর মুরগির নিলাম চলছে জোড় কদমে। মেলার এক কোনে মঞ্চ বেঁধে চলছে পুরুকিয়ার নাচনিদের অনুষ্ঠান। আর বসেছে নানা স্বাদের আদিবাসী খাবারের দোকান। শুয়োরের রান্না করা মাংস থেকে মহুয়া,রসু সবই পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। মেলার এই অচেনা ছবির সাথে সাথে কিছু চেনা ছবিও দেখতে পাচ্ছি। বাচ্চারা হাওয়াই মিঠাই হাতে ভিড় করেছে নাগর দোলনার কাছে। উপচে পড়েছে ভিড়। লক্ষ্য করে দেখলাম বেশিটাই সাঁওতাল মানুষ দের। শুনেছি নাকি প্রথা আছে মেয়েদের নাকি একবার এই মেলায় আস্তেই হয়। ওদের একান্ত নিজেস্ব কিছু প্রথা আছে সঙ্গী নির্বাচনের। কিন্তু সেখানে নাগরিক সভ্যতার প্রবেশ নিষেধ,আর তাই এর বেশি জানতেও পারি না আমরা। ফেরার পথে দেখলাম যে দলে দলে সাঁওতাল মেয়েরা মেলার মাঠে বসে আছে, কেউ দল বেঁধে, কেউ একা একা। ওরা যেন কিসের অপেক্ষা করছে। মনে মনে ভাবলাম আমার চেনা ভারতবর্ষের ভিতরে যেমন একটা ভারত আছে, তেমনি হয়তো বিকেলের এই মেলাটা একটা সাধারণ রূপ। আসল উৎসব শুরু হবে নগর ঘুমিয়ে পড়লে।
এই সব ভাবতে ভাবতে ফিরে এলাম শহর পুরুলিয়ার হোটেলে। বেশ অনেকটা রাত। পরদিন একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম লালমাটির জঙ্গলে। চলে গেলাম বাঁকুড়া,পুরুলিয়া,পশ্চিম মেদিনীপুর তিন জেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। আর মজার কথা হল এই গ্রামগুলোর সবটাই ঝাড়খন্ড সীমান্তবর্তী।তিন জেলা আর দুই রাজ্যের সীমান্তের অচেনা এই গ্রামগুলোতে তথাকথিত নাগরিক ভিড় নেই। আছে অচেনা মানুষ।তাদের রহস্যময় জীবন যাপন, বন্য আনকোররা কুমারী প্রকৃতি, অনেক অজানা গল্প।
মানবাজার সার্কিটের কুইলাপালের কাছাকাছি পাড়ডি নামে একটা গ্রামে। একটা মাত্র থাকাখাওয়ার জায়গা নিরঞ্জন হোটেল। সেখানে দুপুরের খাবার কথা বলে এগিয়ে গেলাম এক অচেনা আদিবাসী গ্রাম লেওয়াগারার দিকে। সাধারন মানুষের বড় একটা যাতায়াত নেই সেখানে। আপাতভাবে সেয়াটা পর্যটনস্থলও নয়। তবু একটা ঝুলনের মতে সাজানো গ্রাম। ছোট ছোট মাটির বাড়ি তার গায়ে রকমারি আলপনা অ্যাঁকা। মোরগঝাড়, ধানের ছড়া,জ্যামেতিক ছবি, বিভিন্ন পশুপাখির ছবি,ওদের নানা নিজস্ব প্রতীক, মোটিফ। নানারকম প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে ছবিগুলো আঁকা। নিকানো উঠোন। রাস্তার উওপর, উঠোন জুড়ে ছড়ানো ধান। হাঁস মুরগির অবাধ বিচরন। গ্রামের লোকজন নিজেরা নিজেদের মতো দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। কোন কোন বাড়ির বাইরে ধামসা মাদল ঝোলানো আছে। গ্রামের মধ্যিখানে মাঝিথান। গ্রামে ঢোকার মুখে নজর এল শালের থান।
আমাদের সাথে এক বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে গবেষনা করছেন সাঁওতাল জনজীবন নিয়ে। তাঁর চেনা জানার সুত্রেই মিলেছে এই গ্রামে প্রবেশের ছাড়পত্র। ওনার কাছেই জানলাম এই শালের থানটি নাকি খুব পবিত্র। গ্রামের সব ধর্মীয় আচার আচরন এখানেই সম্পন্ন হয়। গ্রামটা পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখতে লাগলাম। পুরো গ্রামটাই জঙ্গল। আমরা বেশ খানিকটা উপরে উঠলাম। অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট চালা বাড়ি, অল্প বিস্তর ধানিজমি আর অনন্ত বিস্তৃত সবুজ জঙ্গল।
ফেরার পথে পেলাম সুতানের গভীর জঙ্গল। লাল মাটীর রাস্তা আর চারিপাশ শাল, পিয়াশাল,সেন্দ্রা,মাদার, বহেরা,নিম,সেগুন, কূর্চি,শিরীষ,মহুয়া গাছের সারি। বুনো বুনো মাতাল করা গন্ধ। হলুদ,সবুজ,লাল।নীল প্রকৃতি উজার করে দিয়েছে এখানে নানা রঙের ছটা। সাথে একটা অচেনা রোমাঞ্চকর অনুভূতি। সব কিছুই যেন চোখের সামনে আছে,তবু মনের মধ্যে জেগে আছে একটা রহস্যের অনুভূতি। জঙ্গলের ভিতর একটা আদিমতা নজর পরে। আমার বন্ধুটির মুখেই শুনলাম জঙ্গলে হায়না,হাতি,ভাল্লুক এর মতো সব জন্তুর দেখা পাওয়া যায়। জঙ্গলের গভীরে আছে একটা আধপোড়া বনবাংলো। যার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নাম না জানা একটা নদী। বাংলোর বাইরে বিশাল মাঠে বড় বড় গাছের ছায়ায় খানিকটা জুড়িয়ে নিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। জঙ্গল থেকে দুই কিমি দূরে সুতান গ্রাম। সাঁওতাল,ভূমিজ,ওরাও,মুন্ডা জন জাতীর বাস।
দুপুরে ফিরে এলাম পারাডির নিরঞ্জন হোটেলে। স্নান সেরে মাছ ভাত খেয়ে আবার বেড়িয়ে পড়লাম। এই পারাডির মোড়েই আছে তিনটি জেলার যোগসূত্র। একটা রাস্তা গেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের বাঁশপাহাড়ির দিকে, অপর রাস্তাটি পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ানের দিকে, একটি শহর বাঁকুড়ার দিকে আর একটি ছেন্দাপাথর হয়ে ফুলকুসুমার দিকে।
পাড়াদি মোড় থেকে তিন কিলোমিটার যেতেই ঝিলমিলির জঙ্গল। নিবিড় বনাঞ্চলের মাঝে একটা পর্যটক আবাস। এখান থেকে কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গেলেই কল্যানসায়র নামে একটা জলাশয়। সেখানে নাকি সিজিনে পদ্ম ফুল ফোটে। এখান থেকে আমরা চলে গেলাম জঙ্গল, পাহাড়, ঘেরা ড্যাম তাল বেড়িয়া।
রাউতোড়া গ্রামের পাশেই এই জলাধার। চারপাশ পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা। এই জলাধারে বাঁধ দিয়ে খালের সাহায্যে গ্রামে জল সরবরাহ করা হয়। নির্জন এক অনন্য সুন্দর পরিবেশে এত সুন্দর ড্যামটি কেমন যেন ব্রাত্য হয়ে পড়ে আছে। মাঝিরা টায়ার নিয়ে ড্যামের জল থেকে মাছ ধরছে। চারিপাশের পাহাড়, জঙ্গলের ছায়া পড়েছে ড্যামের জলে। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে।
আমরা ফিরে এলাম পারাডির সেই অখ্যাত হোটেলে। রাত কাটল গান, গল্প আর আড্ডায়। সাথে রইল জঙ্গলের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। যত রাত বাড়তে লাগল অজানা অচেনা সব শব্দ কান ঘেষে চলতে লাগল।
পরদিন সকাল সকাল বেড়িয়ে পৌঁছে গেলাম লালজল গ্রামে। সেখানে পৌঁছে পরিচয় হল লালজলদেবী পাহাড়ের কোলে বাসন্তিদেবীর মন্দিরের পুরহিত চুনারাম মাহাতোর সাথে। কাছের গ্রামেই তাঁর বাড়ি। তবে ছোটবেলা থেকেই তিনি এই মন্দিরে দেবীর সেবা করেন। এই পাহাড়ের গুহায় থাকতেন সাধু রামস্বরূপ দাস। তিনি নাকি মুখে কোন কথা বলতেন না। দূর দূরান্ত থেকে তাঁর ভক্ত সমাগম হত। গ্রামের মানুষের দেওয়া ফল আর দুধ খেয়েই তিনি বেঁচে ছিলেন।শোণা যায় তখন এখানে গভীর জঙ্গল। একটি বাঘ ছিল সাধুর সর্বদার সঙ্গি। বাঘটি অসুখে মারা যাওয়ার কিছুদিন পর সাধুবাবাও তাঁর শোকে দেহ রাখেন। পাহাড় ডিঙিয়ে আমরা সাধুর গুহায় বসেই এসব গল্প শুন ছিলাম। সমস্ত গ্রামটা খেঁজুর গাছে ঘেরা। জাগায় জাগায় খেঁজুর গাছে হাড়ি বাঁধা। এমন সুযোগ হাত ছাড়া করা গেল না। খেঁজুর গুড় কিনে নিয়ে আবার রওনা দিলাম।
এবারের গন্তব্য বেলপাহাড়ির কাঁকড়া ঝোড় গ্রাম। গভীর জঙ্গলে ঘেরা আদিবাসী গ্রাম। জঙ্গলের মাঝে এক প্রাচীন ভৈরবের মন্দির।
ঘন জঙ্গলের মাঝে কে বানালো এই মন্দির? পূজারীই বা কে? ঘন্টা বাজাতেই ভিতরে থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর কন্ঠস্বর ব্যোম ভোলে শংকর মহারাজ। একটু ভয় হল। শুনেছি এসব অঞ্চলে বহু তান্ত্রিক আছেন যারা সাধনা করেন। তাই ওনার নৈঃশব্দ্য সাধনাতে ব্যাঘাত না ঘাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
আগে কাঁকড়া ঝোড়ে থাকার জন্য ইয়ুথ হোস্টেল ছিল। এখন সেখানে গ্রামের মানুষজনই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে।
যদিও বেশ কয়েকদিন ধরে পুরুলিয়ার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তবুও শহরের ক্লান্তি পিছু ছাড়ছেনা। প্রাণান্তকর গরমের পর ছটফট করছিলাম বৃষ্টির জন্য। আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামলো। এতদিন ধরে তেঁতে থাকে মাটি জলের পরশ পেয়ে তৃষ্ণা মেটালো, কিন্তু আমার তৃষ্ণা তো মিটছে না। আমাকে পুরুলিয়া যেন আরো কাছে ডাকছে। অযোধ্যা পাহাড়ে বৃষ্টি দেখার হাতছানিকে এড়িয়ে গিয়ে কাজে ডুব দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। বুঝতেই পারছেন ভিষণ অলস আর কর্মবিমুখ মানুষের সমস্যা আর কি!
একটা অপরিকল্পিত জার্নি। কিন্তু তাঁর ফলাফল যে এত মধুর হতে পারে আমাদের কারোরই জানা ছিলনা। ঘন জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছিলাম। মাঝে মাঝেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি আসছে। কালো পিচ রাস্তা, ঘন সবুজ জঙ্গল ধুলো ঝেড়ে আরো সজীব সতেজ হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে পুরুলিয়াতে যে বৃষ্টি দেখার ইচ্ছা নিয়ে আমারা এসেছি সেই ইচ্ছা পূর্ণ হল।
অযোধ্যায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল চারটে বেজে গেল। আমাদের যেহেতু কোথাও বুকিং নেই তাই এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু সপ্তাহান্ত তাই সরকারি লজে জায়গা পাওয়া গেল না। আর বেসরকারি যে গুটিকত লজ আছে সেগুলো আমাদের পছন্দ হল না। শেষমেশ অযোধ্যা হিলটপের সবথেকে উঁচু জায়গা কালিপাহাড়িতে পেয়ে গেলাম এক রোমাঞ্চকর থাকার জায়গা । সার সার তাঁবু নতুন পাতা হচ্ছে৷ হোটেলওয়ালা বলল, একদম নতুন কিন্তু সেভাবে কিছুই ব্যবস্থা নেই৷ আমরা বললাম, আমাদের মাটিতে বিছানা পেতে দিন আর কিছুই লাগবে না৷ হোটেলওয়ালা কী ভাবলো জানি না৷ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল৷ ভাবলো কোথা থেকে এসেছে কে জানে৷ লোকে খাট চায়৷ রা মাটিতেই থাকবে পয়সা দিয়ে৷ কিন্তু আমরাই জানি আমাদের এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় আমাদের আনন্দটা তাড়াতাড়ি লাগেজ রেখে আমরা আবার একটু বেড়োলাম আপার ড্যামের দিকে৷
আমাদের হোটেল থেকে সাত আট কিলোমিটার ঘন জঙ্গলের ভিথর দিয়ে রাস্তা৷ শাল, পিয়াল, বাবলা, ডুমুর গাছের জঙ্গল৷ কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে রাস্তাঘাট সব জলে ধুয়ে গেছে৷ সোঁদা মাটির গন্ধে চারিপাশে মঁ মঁ করছে পোড়া পোড়া লাল মাটিতে জল পড়েছে৷ যাওয়ার পথেই চোখে পড়ল শিকার উৎসবের ময়দান৷চারিপাশে জঙ্গলে ঘেৰা একটা ফাঁকা জায়গা৷ রাস্তায় যেতে যেতে চোখে পড়ছে বেশ কিছু সরকারি বিজ্ঞাপন৷ যেখানে লেখা বন্য জীবজন্তুদের শিকার করা আইনত অপরাধ৷ বন্য পশুদের বাঁচতে দিন, সংরক্ষণ করুন ধাঁচের শ্লোগান৷ তার মানে এখানে উৎসব ছাড়াও শিকার প্রবণতা আছে মানুষের৷ আপার ড্যামে পৌঁছে গেছি৷ অযোধ্যা পাহাড় মূলত দলমা পাহাড়েরই অংশ৷ পূর্বঘাট পর্বতের বিস্তারিত শাখা৷ আপার ড্যাম সংরক্ষিত এলাকা৷ চারিপাশের জলাধার সিমেন্ট আর লোহার ব্যারিকেড ঘেরা৷
চারিধার বিস্তৃত নীল জলরাশি৷ অযোধ্যার জঙ্গল, পাহাড় ছাড়াও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে প্রতিটা জলাধার বা ড্যাম ঘিরে৷ আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম দুটোই খুব সুন্দর৷ লোয়ার ড্যামের ধার ঘেঁষে সূর্যাস্তের দৃশ্য ভোলবার নয়৷ খড়ের বেড়া, ড্যাম, মুরগুমা সব কটা ড্যামের প্রকৃতিগত অবস্থান আর সৌন্দর্য অপূর্ব৷ আমরা আবার বর্ষা মাথায় ঘুরছি৷ কালো মেঘের ছায়া, তাতে সবুজ প্রকৃতির সোঁদা গন্ধ সব মিলেমিশে এক রোমান্টিক আবহ গেঁথেছে৷ খড়ের বেড়া ড্যামে যাওয়ার রাস্তাটা ঠিক যেন ঝুলনের মতো সাজানো৷ কুল গাছের সারি, সবুজ ধানক্ষেত, ধুসর পাহাড় ঘেরা সরু রাস্তা গিয়ে পৌঁছেছে ড্যামের পাড়ে৷ টলটল করছে জল৷ চারধারের সবুজ পাহাড়গুলোতে রোদ আর মেঘের খেলা চলছে৷ অনেক পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে৷ মরগুমা, খড়ের বেড়া দু’জায়গাতে থাকার জন্য বেসরকারি ব্যবস্থা আছে৷ টুর্গা, ফসল, বামনি ফলস দেখেও খুব ভালো লাগলো৷ পাহাড়ের উঁচু, নীচু খাঁজ বেয়ে পাথর ডিঙিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা বেশ ভাল৷ এগুলো ছাড়াও অযোধ্যার বন পাহাড়ে উদ্দেশহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেও বেশ ভালই লাগে৷ কাছের টাউন বলতে বাঘমুন্ডি৷ এখানে বেশ বড় একটা লোকালয় আছে৷ স্কুল, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবই আছে৷ কিন্তু কোন সুযোগ সুবিধাই পর্যাপ্ত নয়৷
পুরুলিয়ার থেকে ফেরার পথে এলাম সীতাকুণ্ড৷ বেশ সুন্দর জায়গা৷ একে ঘিরে থাকা ইতিহাটটা আরো বেশি ইন্টারেস্টিং৷ শোনা যায় রাম আর সীতা বনবাসে থাকাকালীন এখানে আসেন৷ সীতার জলপিপাসা পেলে রাম তির ছুঁড়ে মাটি ফুঁড়ে জল বের করে সীতার পিপাসা মেটান৷ সেই থেকেই এই কুণ্ড বা জলের জায়গাটা স্থানীয় মানুষের কাছে পবিত্র স্থান৷ বছরে একবার এখানে মেলাও বসে৷
পুরুলিয়ার সব গ্রামগুলোই আনকোরা, সৌন্দর্যের খনি৷ সব গ্রামগুলোর নামের পিছনেই আছে কিছু না কিছু না কিছু ইতিহাস৷ স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, অতীত ঘিরে বহু লোকগাথা, গান, পট, পূজা, লোকাচার, পরব, মেলা তৈরি হয়েছে৷ সব এদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে চলেছে৷ ঝকঝকে রাস্তা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা কিছুর অভাব নেই৷ তবু কোথায় যেন পুরুলিয়া আজও অভিমানী৷ কিছু মানুষ আজও নিজেকে সভাতার অন্তরালে রেখেছে৷ হয়তো মেট্রোপলিটনের সুযোগ সুবিধা এখানে নেই, নেই পাঁচতারা হোটেল৷ কিন্তু প্রকৃতি উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে নিজেকে৷ স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা, সহযোগিতা অবর্ণনীয়৷ লেখার শুরুতেই বলেছিলাম নগর আজ গ্রামমুখী৷ কিন্তু এই গ্রামমুখীনতা যাতে একপেশে না হয়৷ রাঢ় বাংলাকে ভালোবেসে আপন করে কাছে টেনে নিতে হবে৷ তাহলেই অচেনা পুরুলিয়াকে আপন হয়ে যাবে৷ শহর আর গ্রামের সব রহস্য, এটা আমার বিশ্বাস৷ বারবার পুরুলিয়া ছুটে যেতে হবে৷ ওই বন পাহাড়ের গভীরেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য, এটা আমার বিশ্বাস৷
প্রয়োজনীয় তথ্য
কলকাতা থেকে পুরুলিয়া যাবার সবচেয়ে ভালো ট্রেন হল রাত ১১টা ০৫ মিনিটে হাওড়া-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ৫৮০১১৷ ভোর বেলা পুরুলিয়া পৌঁছে যাওয়া যায়৷
থাকার জন্য পুরুলিয়া শহরে সরকারি লজ, গেস্ট হাউস, বনবাংলো ছাড়াও অনেক প্রাইভেট হোটেল, লজ, ভারত সেবাশ্রম আছে৷অযোধ্যা পাহাড়ে থাকার জন্য সরকারি লজের সাথে বহু প্রাইভেট হোটেল আছে৷ পারাডিতে থাকার একমাত্র আস্তানা নিরঞ্জন হোটেল৷
@Barnali Roy
ডিজিটাল ইন্ডিয়া বাইরেও একটা ভারতবর্ষ আছে। কিছু মানুষ আছে যাদের অনেকেই গোটা ভারতবর্ষ তো দূরস্থান পশ্চিমবঙ্গে বাস করেও কল্লোলিনী কলকাতার কথাও জানে না। যারা আমাদের এই ভারতবর্ষের মাটিতেই জন্ম নিয়েছে, বসবাস করছে। তাদেরই আদিবাস ভূমি এই মাটি। যাদের আমার সাঁওতাল বলি। যদিও আদিবাসীদের মধ্যেও অনেক ভাগ আছে। কিন্তু আমরা শহুরে তথা কথিত সভ্য মানুষের আদিবাসী মানুষ মানেই বুঝি সাঁওতাল।আজকাল আবার শহুরে বাঙালীর হিরিক উঠেছে গ্রামের মেঠো পথে বেড়াতে যাওয়ার। নাগরিক তকমা মুছতে মরিয়া বাঙালী দোল থেকে পিকনিক সব উৎসব উদযাপনের জন্য বেছেনিচ্ছে লালমাটির দেশকে। দীপুদা (দীঘা,পুরি,দার্জিলিং) ছেড়ে পুরুলিয়া। যদিও ওই দেশের ভূমি পুত্রদের এবিষয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। তারা নিজেদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটুকু নিয়ে দিব্বি আছে। আর আছে তাদের নিজস্ব প্রথা,পরব,মেলা।
আগামনী বর্ষাকে সাথে নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের এক সকালে চার বন্ধু মিলে বেড়িয়ে পড়েছি। নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যানিং নেই। পুরুলিয়াকে কাছ থেকে দেখবো কটাদিন। আর যদি কোন মেলা পরব দেখা যায়। আরছিল একটা সুপ্ত বাসন। অযোধ্যা পাহাড়ে বৃষ্টি দেখবো। সে যাই হোক সেটা তো প্রকৃতির মেজাজ।
খোঁজ পেয়ে একটা মেলা দেখতে গিয়েছিলাম পুরুলিয়ার চাকোলতোড় গ্রামে। ছাতা প্রব। আসানসোল টাটানগর লাইনে পুরুলিয়ার পরের স্টেশনইনহল টামনা। কয়েকহাত দূরেই ছাতা মেলার মাঠ।
এই ছাতা পরবের শুরুটা নিয়ে বেশ কিছু গল্প শুনতে পেলাম। একদল বলল পঞ্চকোট রাজার সাথে ছাত্নার রাজার যুদ্ধ বাঁধলে পঞ্চকোট রাজা জয়ী হন, তারই বিজয় উৎসব ছাতা পরব। আবার কেউ কেউ বলেন ইংরেজদের বিরূদ্ধে সাঁওতালদের সংগঠিত করে, পঞ্চকোট রাজা যুদ্ধ লড়েছিলেন। শয়ে শয়ে সাঁওতাল একত্রিত হয়ে এই মেলার মাঠে শপথ গ্রহণ করে করে। আর তারই প্রতীক স্বরূপ ছাতা তোলা হয়। তবে গল্প বা ইতিহাস যাই থাকুক না কেন, এই পরবটা যে নিখাদ সাঁওতালদের পরব, তার টের পেলাম। হাজার হাজার মেয়ে, পুরুষ,বাচ্চা,বুড়ো সাঁওতাল দলে হেঁটে, সাইকেলে,ট্রেকারে চেপে ছাতা পরবে আসছে। বিশাল শাল কাঠের ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। আর সেই ম্যারাপের মাঝেই দুটো শাল কাঠকে কপিকল সিস্টেমে এমনভাবে আটকানো হয়েছে, যাতে ছাতাটাকে পতাকার ম্পতো উঁচুতে খাড়া করা যায়। আওসলে সাদা মখমল কাপড়ে মোড়া থাকে আসল ছাতাটা। লোক মুখে শুনলাম ছাতাটা সোনার। সারা বছর ওটা রাজবাড়ির মন্দিরে থাকে। পরবের দুদিন মেলার মাঠে থাকে। বেশ অবাক লাগছিল গল্পগুলো শুনে পঞ্চকোট রাজা নিজে সাঁওতাল না হয়েও এটা সাঁওতাল পরব। পুরোহিত মশাই ওই শালের গুড়ির নীচে বসে কুলদেবতার পূজা করে চলেছে। অবশেষে এওল সেই প্রতীক্ষিত সময়। দেখলাম হৈ হৈ বেঁধে গেছে। কি না রাজা আসছে। রাজা এলেন কাসর,ঘন্টা,শঙ্খ, শিঙা ধামসা,মাদল বাজনা বাজিয়ে। পরনে রাজবেশ, মাথায় পাগরি,পায়ে নাগরাই,কোমরে তলোয়ার গোঁজা। পঞ্চকোট রাজবংশের বর্তমান বংশধর অমিত রায়। সে এক জমজমাট ব্যাপার। ততক্ষণে মেলা ফাঁকা। ছাতার মাঠ উপচে পড়ছে। লোকের মাথা লোক খাচ্ছে। রাজা এসেছেন।এবার ছাতা উঠবে।রাজা এসে প্রশেসন নিয়ে ছাতার চার পাশ ঘুরছেন। পর পর তিন পাক। তারপর সষ্টাঙ্গে কুলদেবতাকে প্রণাম জানালেন। রাজার সাথে উপস্থিত সবাইও প্রনাম করছে। তারপর রাজা সরাসরি হেঁটে চলে গেলেন উঁচু একটা বেদির উপর প্রথমটা বুঝতে পারিনি,তারপর লক্ষ্য করে দেখলাম রাজা একটা সাদা রং এর রুমাল উড়িয়ে দিলেন ছাতার দিকে তাকিয়ে। আরসাথে সাথেই ওই শেগুন কাঠের কপিকলের সাহায্যে ছাতা তোলা হল প্রায় আকাশ ছুঁই ছুঁই। সাথে সাথে হাত তালি দিয়ে জনগন অভিবাদন জানালো। এরপর সবাই মেলার মাঠের দিকে চলে গেল। শুনলাম ছাতাটা নাকি পরেরদিন পর্যন্ত এমনভাবেই থাকে। তারপর আবার ফিরে যায় রাজবাড়িতে। আমরাও গেলাম মেলার মাঠে। দেখলাম সারি সারি দোকান। জিলিপি, তেলেভাজা, কাঁচের চুড়ি, খেলনাপাতির দোকান। আর দেখলাম ধামসা মাদলের দোকান। আর এখানেই মেলার রূপটা বদলে গেল। সার বেঁধে সাজানো আছে ধামসা মাদল। লাল,নিল রংকরা। ছোট বড় নানান মাপের।
মেলার ভিতর দিকে যত এগোচ্ছি মেলার রূপ বদলে যাচ্ছে। নানান ধরনের বিষয় নিয়ে চলছে জুয়া খেলা। সেগুলো কোনটা কোনটা যেমন মজার তেমন কোনটা আবার বিপদজ্জনক। আর ভিড় উপছে পড়ছে সেইসব দোকানে। চলছে সাপের খেলা।ধারালো ছুড়ি পায়ে হাসিল মুরগির যুযুধান লড়াই। পাহুর মুরগির নিলাম চলছে জোড় কদমে। মেলার এক কোনে মঞ্চ বেঁধে চলছে পুরুকিয়ার নাচনিদের অনুষ্ঠান। আর বসেছে নানা স্বাদের আদিবাসী খাবারের দোকান। শুয়োরের রান্না করা মাংস থেকে মহুয়া,রসু সবই পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। মেলার এই অচেনা ছবির সাথে সাথে কিছু চেনা ছবিও দেখতে পাচ্ছি। বাচ্চারা হাওয়াই মিঠাই হাতে ভিড় করেছে নাগর দোলনার কাছে। উপচে পড়েছে ভিড়। লক্ষ্য করে দেখলাম বেশিটাই সাঁওতাল মানুষ দের। শুনেছি নাকি প্রথা আছে মেয়েদের নাকি একবার এই মেলায় আস্তেই হয়। ওদের একান্ত নিজেস্ব কিছু প্রথা আছে সঙ্গী নির্বাচনের। কিন্তু সেখানে নাগরিক সভ্যতার প্রবেশ নিষেধ,আর তাই এর বেশি জানতেও পারি না আমরা। ফেরার পথে দেখলাম যে দলে দলে সাঁওতাল মেয়েরা মেলার মাঠে বসে আছে, কেউ দল বেঁধে, কেউ একা একা। ওরা যেন কিসের অপেক্ষা করছে। মনে মনে ভাবলাম আমার চেনা ভারতবর্ষের ভিতরে যেমন একটা ভারত আছে, তেমনি হয়তো বিকেলের এই মেলাটা একটা সাধারণ রূপ। আসল উৎসব শুরু হবে নগর ঘুমিয়ে পড়লে।
এই সব ভাবতে ভাবতে ফিরে এলাম শহর পুরুলিয়ার হোটেলে। বেশ অনেকটা রাত। পরদিন একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম লালমাটির জঙ্গলে। চলে গেলাম বাঁকুড়া,পুরুলিয়া,পশ্চিম মেদিনীপুর তিন জেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। আর মজার কথা হল এই গ্রামগুলোর সবটাই ঝাড়খন্ড সীমান্তবর্তী।তিন জেলা আর দুই রাজ্যের সীমান্তের অচেনা এই গ্রামগুলোতে তথাকথিত নাগরিক ভিড় নেই। আছে অচেনা মানুষ।তাদের রহস্যময় জীবন যাপন, বন্য আনকোররা কুমারী প্রকৃতি, অনেক অজানা গল্প।
মানবাজার সার্কিটের কুইলাপালের কাছাকাছি পাড়ডি নামে একটা গ্রামে। একটা মাত্র থাকাখাওয়ার জায়গা নিরঞ্জন হোটেল। সেখানে দুপুরের খাবার কথা বলে এগিয়ে গেলাম এক অচেনা আদিবাসী গ্রাম লেওয়াগারার দিকে। সাধারন মানুষের বড় একটা যাতায়াত নেই সেখানে। আপাতভাবে সেয়াটা পর্যটনস্থলও নয়। তবু একটা ঝুলনের মতে সাজানো গ্রাম। ছোট ছোট মাটির বাড়ি তার গায়ে রকমারি আলপনা অ্যাঁকা। মোরগঝাড়, ধানের ছড়া,জ্যামেতিক ছবি, বিভিন্ন পশুপাখির ছবি,ওদের নানা নিজস্ব প্রতীক, মোটিফ। নানারকম প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে ছবিগুলো আঁকা। নিকানো উঠোন। রাস্তার উওপর, উঠোন জুড়ে ছড়ানো ধান। হাঁস মুরগির অবাধ বিচরন। গ্রামের লোকজন নিজেরা নিজেদের মতো দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। কোন কোন বাড়ির বাইরে ধামসা মাদল ঝোলানো আছে। গ্রামের মধ্যিখানে মাঝিথান। গ্রামে ঢোকার মুখে নজর এল শালের থান।
আমাদের সাথে এক বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে গবেষনা করছেন সাঁওতাল জনজীবন নিয়ে। তাঁর চেনা জানার সুত্রেই মিলেছে এই গ্রামে প্রবেশের ছাড়পত্র। ওনার কাছেই জানলাম এই শালের থানটি নাকি খুব পবিত্র। গ্রামের সব ধর্মীয় আচার আচরন এখানেই সম্পন্ন হয়। গ্রামটা পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখতে লাগলাম। পুরো গ্রামটাই জঙ্গল। আমরা বেশ খানিকটা উপরে উঠলাম। অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট চালা বাড়ি, অল্প বিস্তর ধানিজমি আর অনন্ত বিস্তৃত সবুজ জঙ্গল।
ফেরার পথে পেলাম সুতানের গভীর জঙ্গল। লাল মাটীর রাস্তা আর চারিপাশ শাল, পিয়াশাল,সেন্দ্রা,মাদার, বহেরা,নিম,সেগুন, কূর্চি,শিরীষ,মহুয়া গাছের সারি। বুনো বুনো মাতাল করা গন্ধ। হলুদ,সবুজ,লাল।নীল প্রকৃতি উজার করে দিয়েছে এখানে নানা রঙের ছটা। সাথে একটা অচেনা রোমাঞ্চকর অনুভূতি। সব কিছুই যেন চোখের সামনে আছে,তবু মনের মধ্যে জেগে আছে একটা রহস্যের অনুভূতি। জঙ্গলের ভিতর একটা আদিমতা নজর পরে। আমার বন্ধুটির মুখেই শুনলাম জঙ্গলে হায়না,হাতি,ভাল্লুক এর মতো সব জন্তুর দেখা পাওয়া যায়। জঙ্গলের গভীরে আছে একটা আধপোড়া বনবাংলো। যার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নাম না জানা একটা নদী। বাংলোর বাইরে বিশাল মাঠে বড় বড় গাছের ছায়ায় খানিকটা জুড়িয়ে নিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। জঙ্গল থেকে দুই কিমি দূরে সুতান গ্রাম। সাঁওতাল,ভূমিজ,ওরাও,মুন্ডা জন জাতীর বাস।
দুপুরে ফিরে এলাম পারাডির নিরঞ্জন হোটেলে। স্নান সেরে মাছ ভাত খেয়ে আবার বেড়িয়ে পড়লাম। এই পারাডির মোড়েই আছে তিনটি জেলার যোগসূত্র। একটা রাস্তা গেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের বাঁশপাহাড়ির দিকে, অপর রাস্তাটি পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ানের দিকে, একটি শহর বাঁকুড়ার দিকে আর একটি ছেন্দাপাথর হয়ে ফুলকুসুমার দিকে।
পাড়াদি মোড় থেকে তিন কিলোমিটার যেতেই ঝিলমিলির জঙ্গল। নিবিড় বনাঞ্চলের মাঝে একটা পর্যটক আবাস। এখান থেকে কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গেলেই কল্যানসায়র নামে একটা জলাশয়। সেখানে নাকি সিজিনে পদ্ম ফুল ফোটে। এখান থেকে আমরা চলে গেলাম জঙ্গল, পাহাড়, ঘেরা ড্যাম তাল বেড়িয়া।
রাউতোড়া গ্রামের পাশেই এই জলাধার। চারপাশ পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা। এই জলাধারে বাঁধ দিয়ে খালের সাহায্যে গ্রামে জল সরবরাহ করা হয়। নির্জন এক অনন্য সুন্দর পরিবেশে এত সুন্দর ড্যামটি কেমন যেন ব্রাত্য হয়ে পড়ে আছে। মাঝিরা টায়ার নিয়ে ড্যামের জল থেকে মাছ ধরছে। চারিপাশের পাহাড়, জঙ্গলের ছায়া পড়েছে ড্যামের জলে। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে।
আমরা ফিরে এলাম পারাডির সেই অখ্যাত হোটেলে। রাত কাটল গান, গল্প আর আড্ডায়। সাথে রইল জঙ্গলের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। যত রাত বাড়তে লাগল অজানা অচেনা সব শব্দ কান ঘেষে চলতে লাগল।
পরদিন সকাল সকাল বেড়িয়ে পৌঁছে গেলাম লালজল গ্রামে। সেখানে পৌঁছে পরিচয় হল লালজলদেবী পাহাড়ের কোলে বাসন্তিদেবীর মন্দিরের পুরহিত চুনারাম মাহাতোর সাথে। কাছের গ্রামেই তাঁর বাড়ি। তবে ছোটবেলা থেকেই তিনি এই মন্দিরে দেবীর সেবা করেন। এই পাহাড়ের গুহায় থাকতেন সাধু রামস্বরূপ দাস। তিনি নাকি মুখে কোন কথা বলতেন না। দূর দূরান্ত থেকে তাঁর ভক্ত সমাগম হত। গ্রামের মানুষের দেওয়া ফল আর দুধ খেয়েই তিনি বেঁচে ছিলেন।শোণা যায় তখন এখানে গভীর জঙ্গল। একটি বাঘ ছিল সাধুর সর্বদার সঙ্গি। বাঘটি অসুখে মারা যাওয়ার কিছুদিন পর সাধুবাবাও তাঁর শোকে দেহ রাখেন। পাহাড় ডিঙিয়ে আমরা সাধুর গুহায় বসেই এসব গল্প শুন ছিলাম। সমস্ত গ্রামটা খেঁজুর গাছে ঘেরা। জাগায় জাগায় খেঁজুর গাছে হাড়ি বাঁধা। এমন সুযোগ হাত ছাড়া করা গেল না। খেঁজুর গুড় কিনে নিয়ে আবার রওনা দিলাম।
এবারের গন্তব্য বেলপাহাড়ির কাঁকড়া ঝোড় গ্রাম। গভীর জঙ্গলে ঘেরা আদিবাসী গ্রাম। জঙ্গলের মাঝে এক প্রাচীন ভৈরবের মন্দির।
ঘন জঙ্গলের মাঝে কে বানালো এই মন্দির? পূজারীই বা কে? ঘন্টা বাজাতেই ভিতরে থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর কন্ঠস্বর ব্যোম ভোলে শংকর মহারাজ। একটু ভয় হল। শুনেছি এসব অঞ্চলে বহু তান্ত্রিক আছেন যারা সাধনা করেন। তাই ওনার নৈঃশব্দ্য সাধনাতে ব্যাঘাত না ঘাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
আগে কাঁকড়া ঝোড়ে থাকার জন্য ইয়ুথ হোস্টেল ছিল। এখন সেখানে গ্রামের মানুষজনই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে।
যদিও বেশ কয়েকদিন ধরে পুরুলিয়ার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তবুও শহরের ক্লান্তি পিছু ছাড়ছেনা। প্রাণান্তকর গরমের পর ছটফট করছিলাম বৃষ্টির জন্য। আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামলো। এতদিন ধরে তেঁতে থাকে মাটি জলের পরশ পেয়ে তৃষ্ণা মেটালো, কিন্তু আমার তৃষ্ণা তো মিটছে না। আমাকে পুরুলিয়া যেন আরো কাছে ডাকছে। অযোধ্যা পাহাড়ে বৃষ্টি দেখার হাতছানিকে এড়িয়ে গিয়ে কাজে ডুব দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। বুঝতেই পারছেন ভিষণ অলস আর কর্মবিমুখ মানুষের সমস্যা আর কি!
একটা অপরিকল্পিত জার্নি। কিন্তু তাঁর ফলাফল যে এত মধুর হতে পারে আমাদের কারোরই জানা ছিলনা। ঘন জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছিলাম। মাঝে মাঝেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি আসছে। কালো পিচ রাস্তা, ঘন সবুজ জঙ্গল ধুলো ঝেড়ে আরো সজীব সতেজ হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে পুরুলিয়াতে যে বৃষ্টি দেখার ইচ্ছা নিয়ে আমারা এসেছি সেই ইচ্ছা পূর্ণ হল।
অযোধ্যায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল চারটে বেজে গেল। আমাদের যেহেতু কোথাও বুকিং নেই তাই এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু সপ্তাহান্ত তাই সরকারি লজে জায়গা পাওয়া গেল না। আর বেসরকারি যে গুটিকত লজ আছে সেগুলো আমাদের পছন্দ হল না। শেষমেশ অযোধ্যা হিলটপের সবথেকে উঁচু জায়গা কালিপাহাড়িতে পেয়ে গেলাম এক রোমাঞ্চকর থাকার জায়গা । সার সার তাঁবু নতুন পাতা হচ্ছে৷ হোটেলওয়ালা বলল, একদম নতুন কিন্তু সেভাবে কিছুই ব্যবস্থা নেই৷ আমরা বললাম, আমাদের মাটিতে বিছানা পেতে দিন আর কিছুই লাগবে না৷ হোটেলওয়ালা কী ভাবলো জানি না৷ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল৷ ভাবলো কোথা থেকে এসেছে কে জানে৷ লোকে খাট চায়৷ রা মাটিতেই থাকবে পয়সা দিয়ে৷ কিন্তু আমরাই জানি আমাদের এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় আমাদের আনন্দটা তাড়াতাড়ি লাগেজ রেখে আমরা আবার একটু বেড়োলাম আপার ড্যামের দিকে৷
আমাদের হোটেল থেকে সাত আট কিলোমিটার ঘন জঙ্গলের ভিথর দিয়ে রাস্তা৷ শাল, পিয়াল, বাবলা, ডুমুর গাছের জঙ্গল৷ কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে রাস্তাঘাট সব জলে ধুয়ে গেছে৷ সোঁদা মাটির গন্ধে চারিপাশে মঁ মঁ করছে পোড়া পোড়া লাল মাটিতে জল পড়েছে৷ যাওয়ার পথেই চোখে পড়ল শিকার উৎসবের ময়দান৷চারিপাশে জঙ্গলে ঘেৰা একটা ফাঁকা জায়গা৷ রাস্তায় যেতে যেতে চোখে পড়ছে বেশ কিছু সরকারি বিজ্ঞাপন৷ যেখানে লেখা বন্য জীবজন্তুদের শিকার করা আইনত অপরাধ৷ বন্য পশুদের বাঁচতে দিন, সংরক্ষণ করুন ধাঁচের শ্লোগান৷ তার মানে এখানে উৎসব ছাড়াও শিকার প্রবণতা আছে মানুষের৷ আপার ড্যামে পৌঁছে গেছি৷ অযোধ্যা পাহাড় মূলত দলমা পাহাড়েরই অংশ৷ পূর্বঘাট পর্বতের বিস্তারিত শাখা৷ আপার ড্যাম সংরক্ষিত এলাকা৷ চারিপাশের জলাধার সিমেন্ট আর লোহার ব্যারিকেড ঘেরা৷
চারিধার বিস্তৃত নীল জলরাশি৷ অযোধ্যার জঙ্গল, পাহাড় ছাড়াও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে প্রতিটা জলাধার বা ড্যাম ঘিরে৷ আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম দুটোই খুব সুন্দর৷ লোয়ার ড্যামের ধার ঘেঁষে সূর্যাস্তের দৃশ্য ভোলবার নয়৷ খড়ের বেড়া, ড্যাম, মুরগুমা সব কটা ড্যামের প্রকৃতিগত অবস্থান আর সৌন্দর্য অপূর্ব৷ আমরা আবার বর্ষা মাথায় ঘুরছি৷ কালো মেঘের ছায়া, তাতে সবুজ প্রকৃতির সোঁদা গন্ধ সব মিলেমিশে এক রোমান্টিক আবহ গেঁথেছে৷ খড়ের বেড়া ড্যামে যাওয়ার রাস্তাটা ঠিক যেন ঝুলনের মতো সাজানো৷ কুল গাছের সারি, সবুজ ধানক্ষেত, ধুসর পাহাড় ঘেরা সরু রাস্তা গিয়ে পৌঁছেছে ড্যামের পাড়ে৷ টলটল করছে জল৷ চারধারের সবুজ পাহাড়গুলোতে রোদ আর মেঘের খেলা চলছে৷ অনেক পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে৷ মরগুমা, খড়ের বেড়া দু’জায়গাতে থাকার জন্য বেসরকারি ব্যবস্থা আছে৷ টুর্গা, ফসল, বামনি ফলস দেখেও খুব ভালো লাগলো৷ পাহাড়ের উঁচু, নীচু খাঁজ বেয়ে পাথর ডিঙিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা বেশ ভাল৷ এগুলো ছাড়াও অযোধ্যার বন পাহাড়ে উদ্দেশহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেও বেশ ভালই লাগে৷ কাছের টাউন বলতে বাঘমুন্ডি৷ এখানে বেশ বড় একটা লোকালয় আছে৷ স্কুল, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবই আছে৷ কিন্তু কোন সুযোগ সুবিধাই পর্যাপ্ত নয়৷
পুরুলিয়ার থেকে ফেরার পথে এলাম সীতাকুণ্ড৷ বেশ সুন্দর জায়গা৷ একে ঘিরে থাকা ইতিহাটটা আরো বেশি ইন্টারেস্টিং৷ শোনা যায় রাম আর সীতা বনবাসে থাকাকালীন এখানে আসেন৷ সীতার জলপিপাসা পেলে রাম তির ছুঁড়ে মাটি ফুঁড়ে জল বের করে সীতার পিপাসা মেটান৷ সেই থেকেই এই কুণ্ড বা জলের জায়গাটা স্থানীয় মানুষের কাছে পবিত্র স্থান৷ বছরে একবার এখানে মেলাও বসে৷
পুরুলিয়ার সব গ্রামগুলোই আনকোরা, সৌন্দর্যের খনি৷ সব গ্রামগুলোর নামের পিছনেই আছে কিছু না কিছু না কিছু ইতিহাস৷ স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, অতীত ঘিরে বহু লোকগাথা, গান, পট, পূজা, লোকাচার, পরব, মেলা তৈরি হয়েছে৷ সব এদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে চলেছে৷ ঝকঝকে রাস্তা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা কিছুর অভাব নেই৷ তবু কোথায় যেন পুরুলিয়া আজও অভিমানী৷ কিছু মানুষ আজও নিজেকে সভাতার অন্তরালে রেখেছে৷ হয়তো মেট্রোপলিটনের সুযোগ সুবিধা এখানে নেই, নেই পাঁচতারা হোটেল৷ কিন্তু প্রকৃতি উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে নিজেকে৷ স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা, সহযোগিতা অবর্ণনীয়৷ লেখার শুরুতেই বলেছিলাম নগর আজ গ্রামমুখী৷ কিন্তু এই গ্রামমুখীনতা যাতে একপেশে না হয়৷ রাঢ় বাংলাকে ভালোবেসে আপন করে কাছে টেনে নিতে হবে৷ তাহলেই অচেনা পুরুলিয়াকে আপন হয়ে যাবে৷ শহর আর গ্রামের সব রহস্য, এটা আমার বিশ্বাস৷ বারবার পুরুলিয়া ছুটে যেতে হবে৷ ওই বন পাহাড়ের গভীরেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য, এটা আমার বিশ্বাস৷
প্রয়োজনীয় তথ্য
কলকাতা থেকে পুরুলিয়া যাবার সবচেয়ে ভালো ট্রেন হল রাত ১১টা ০৫ মিনিটে হাওড়া-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ৫৮০১১৷ ভোর বেলা পুরুলিয়া পৌঁছে যাওয়া যায়৷
থাকার জন্য পুরুলিয়া শহরে সরকারি লজ, গেস্ট হাউস, বনবাংলো ছাড়াও অনেক প্রাইভেট হোটেল, লজ, ভারত সেবাশ্রম আছে৷অযোধ্যা পাহাড়ে থাকার জন্য সরকারি লজের সাথে বহু প্রাইভেট হোটেল আছে৷ পারাডিতে থাকার একমাত্র আস্তানা নিরঞ্জন হোটেল৷
Comments
Post a Comment