Chandipur to Kasafol Beach Trekking
চাঁদিপুর টু কাসাফল : বিচ ট্রেকিং
বর্ণালী রায়
সবাই পাহাড় চড়ে, আমরা গেছিলাম এবার সমুদ্র চড়তে।হা হা হা! বুঝলেন না তো বন্ধুরা!
আসলে সব ফিল্ডেই তো নানা রকম পরীক্ষা নিরিক্ষা চলছে,টুরিজমেও এইসব পরীক্ষা নিরিক্ষা করছে একদল ভ্রমণ পাগল মানুষ।সেই সূত্রেই এখন একটা নতুন ট্রেন্ড 'বিচ ট্রেকিং'।ব্যাকপ্যাকারস দলের সদস্যরা এইরকমই একটা বিচ ট্রেকিং এর আয়োজন করেছিল কদিন আগেই।আমি সাধারণত ট্যুর দলের সাথে বেড়াতে যেতে চাই না।আমার মনে হয় কোথাও যেন একটা স্বাধীন ছন্দে পতন।যা হোক এবারের হাতছানিটা ছিল একটু আলাদা।২২ জন অজানা আদেখা অপরিচিত মানুষের সাথে একটা রাত,১৪ কিলোমিটার বিচ ধরে ধরে হাঁটা(কাঁদা মাটি,বালি,জল,শামুখ,কাঁকড়া কি নেই সে পথে),নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে টেন্টে রাত্রিযাপন ।সবটা শুনে কেমন যেন লোভ হল । হিসেব করে দেখলাম রাতটা জোৎস্নারাত।চুম্বকের মতো টানে হ্যাঁ করে দিলাম।যেই বলা সেই কাজ।টাকা এডভান্স করার পরে মাথায় এল বালাসোর অব্দি ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে যে।কিন্তু দোলের দিন কিভাবে বালাসোর অব্দি ট্রেনের টিকিট পাব আমি সাতদিন আগে?মগের মুলুক হলেও পেতাম, কিন্তু ধৌলি এক্সপ্রেসে অসম্ভব।বেড়াতে যাওয়ার টিমের একটা দল তৈরি হচ্ছিল হোয়াটসঅ্যাপে,সেখানেই সদ্য পরিচিত বন্ধুরা মিলে সাত জনের একটা টিম করে গাড়ি করে যাওয়ার প্ল্যানিং হল। ব্যাস সব মুশকিল আসান।
নির্ধারিত দিনে ব্যাগ কাঁধে রওনা দিলাম। ডানলপ মোড়ে পৌঁছে গেলাম রাত বারোটা নাগাদ।সহ যাত্রী বন্ধুরা একে একে উপস্থিত । কলকাতা মুম্বাই হাইওয়ে ধরে আমরা রওনা দিলাম।রাতের কোলকাতা বড় সুন্দর।কল্লোলীনির গন্ডী পেরিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। কোলাঘাটে সাময়িক বিরতি নিয়ে আমারা ভোর পাঁচটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম বালাসোর। রাতভর জেগে সবাই একটু ক্লান্ত। হাঁটতে হবে গোটা দিন, তাই অগত্যা একটা হোটেলে দুটো রুম নিয়ে কয়েক ঘন্টা বিশ্রাম নেওয়া হল। মনে একরাশ উত্তেজনা।এক ঝাঁক নতুন মানুষ,তাদের নতুন নতুন গল্প।
ঠিক দশটার সময় বালাসোর স্টেশন চত্বরে সবাই দেখা করার কথা।সেইমতন পৌঁছে গেলাম।অনেকেই এসে গেছে।প্রাথমিক পরিচয় পর্ব সেরে আমরা কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে জল খাবার সারলাম ধোসা খেয়ে।কে জানে আবার কখন খাবার জোঁটে।এবার অটোতে উঠে পৌঁছে গেলাম চাঁদিপুর বিচ।সেখানে যে যার লাস্ট মিনিট কেনা কাটা সেরে হাঁটা শুরু করলাম। আজ ৮ কিলোমিটার হাঁটা।
বিচ ধরে হাঁটা আর এমনকি, এই ভেবে তো নতুন বন্ধুদের সাথে গল্পে মেতেছি।টনক নড়ল প্রায় ২কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর। বালিয়াড়ি শেষ হয়ে যেখানে সবুজ ঘাসের জমি মাঠের মতো লাগছিল দূর থেকে।আরে না না এতো পুরো জল কাঁদা। সেই জল কাঁদা বাড়তে বাড়তে ক্রমে গোড়ালি থেকে হাঁটুতে উঠল,যত যাই তত পাক।জুতো খুলে অনেক আগেই হাতে নিয়েছি।কিন্তু এবার তো আর শরীরটাকে নাড়াতে পারছি না,কি কান্ড!অবশেষে নতুন বন্ধুরা ত্রাতার ভূমিকায় এলেন।কেউ দাদা,কেউ ভাই,কেউবা বন্ধু হয়ে আমায় পাকচক্র থেকে শুধু ত্রান করলেন তাই নয় বাকি পথ হাতে ধরে,কখনো প্রায় পাঁজা কোলে উতরে দিলেন।
এভাবে খাবি খেতে খেতে যখন নদীর ধারে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে দুপুর আড়াইটে।মাথার উপর সূর্য গনগন করছে।আধাবুক জলে নেমে কোনোমতে খাবি খেতে খেতে নৌকায় উঠে পড়লাম। তিন টে নৌকা বুড়িবালাম নদী বেয়ে এগিয়ে চলেছে কোনো এক অজানা দিগন্তে।
নৌকা এসে থামলো একটা ঝাউবনের ধারে।ভাবলাম বুঝি পৌঁছে গেছি।কিন্তু যখন টিম লিডার জানালো যে এখানে মিনিট ৩০ বিশ্রামের পরে আরো দু'ঘন্টা হাঁটতে হবে। এদিক পা জুড়ে কাদা চপ চপ করছে । কোনোমতে নোনা জলে একটু ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে নিলাম।এরপরের পুরো রাস্তাটাই বিচ ধরে। তাই তেমন একটা অসুবিধা হবে না।শ্রান্ত অবসন্ন দেহটাকে টানতে টানতে আমরা ২২জন নবাগত যখন পৌঁছালাম গন্তব্যে।বিশ্বাস করুন সব ক্লান্তি নিমেষে হাওয়া।বিচের গাজিবো(খড় আর বাঁশের তৈরি বিশ্রামস্থান) তে গা এলিয়ে সামনের দুধ সাদা সমুদ্রের উদ্বেলিত ঢেউ সাথে সাথে চাঙ্গা করে দিল আমাদের।
গ্রামটার নাম বাগদা।মূলত জেলেদের গ্রাম।কয়েকজন গ্রামবাসীর সহোযোগিতায় ব্যাকপ্যাকারসের টিম আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছিল।আমাদের জন্য নির্ধারিত ছিল কয়েকটা টেন্ট।একটা টেন্টে তিন জন করে থাকা।মোটামুটি মাথা গোঁজার মতো একটা ব্যবস্থা।কিন্তু ছোট্ট টেন্ট থেকে এক ফালি সমুদ্র ঝাউ জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে।অসুবিধা অনেক কিন্তু মনের খোরাক জুটে গেল ওসব থোড়াই মনে থাকে।
আমাদের মেয়েদের প্রায় আটশো মিটার মতো হেঁটে যেতে হবে গ্রামের একজনের বাড়িতে বাথরুমের ব্যবস্থা হয়েছে। সূর্যের আলো প্রায় নিঃশেষিত।আমরা তিন টে মেয়ে ঝাউ বনের পথ নিয়েছি যাব বলে।একটু এগিয়ে দেখি শ্যাওলাধরা বড় বড় সব গাছ।গাঢ় সবুজ। একটু ছমছমে ভাব। আমরা জোর পায়ে হাঁটতে লাগলাম। ফেরত এসে দেখি এই সন্ধ্যাতেও অনেকেই জলে নেমেছে।আমি ধীর পায়ে বিচের বালির উপর বসলাম। আকাশের একেবারে মাঝখানে চাঁদ।
জোৎস্নার আলোটা ধীরেধীরে বাড়ছে।আলো পড়ে সমুদ্রের জল চিকচিক করছে । বালির উপর চাঁদের আলো আঁকিবুঁকি কেটে যাচ্ছে , ফুরফুরে হাওয়ায় সেই বালি আমাদের সাড়া শরীরময়। মায়াবী জোৎস্না যে কোনো মানুষকে মাতাল করে দেয়।সব মিলিয়ে একটা মায়াবী সন্ধ্যা।
রাত বাড়তেই আয়োজন করা হল ক্যাম্প ফায়ারের।গানে, গল্পে, নাচে,হুল্লোড়ে সময় পেড়িয়ে যায়।এমন সুন্দর মুহূর্তে অচেনা মানুষ কাছের বন্ধু হয়ে যায়,কবি প্রেমিক হয়ে যায়।
রাতের খাবার আমরা বিচে বসে খাবো,চাঁদের আলোতে।মুনলাইট ডিনার।মাংস আর রুটি সহযোগে সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়া সারা হল । আজ ৮ কিলোমিটার হেঁটে সবাই ক্লান্ত,খুব বেশি রাত কেউ জাগতে পারবে না।টেন্টের থেকে মুখ বাড়িয়েও চাঁদের আলোতে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে।চোখ জুড়িয়ে আসে ঘুমে।
পরদিন ৬ কিলোমিটার পথ। আজ হাঁটতে হবে বালিয়াড়ির পথে।রাস্তাটা হুশ করে কেটে গেল একজন পর্বত আরোহী বন্ধু আর এক এডভেঞ্চারপ্রিয় সহযাত্রীর অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে চলে এলাম নদীর পাড়ে।
আজকে নদী পেড়তে হবে মাছের ট্রলারে চেপে।উঠে তো পড়েছ। বিপত্তি ঘটল নামতে গিয়ে।সে একটা সরু পাটাতনে পা রেখে পেড়োতে হবে,একটু এদিক ওদিক হলেই সোজা ঝপাৎ! যাক এ যাত্রায় দুগগা দুগগা বলে দুই বন্ধুর সাহায্যে তরী পাড়ে। যেখানে পৌঁছালাম সেই জায়গাটার নাম কাসাফল।এখানে দুপুরের খাওয়া সেরে গাড়িতে যাব বালাসোর, তারপর যে যার পথে।
এই ছোট্ট ভ্রমণে একসাথে অনেক রোমাঞ্চ ছিল।লালামোহন বাবু এখানে থাকলে চাঁদিপুরের চাঁদ নামে নিশ্চিত একটা উপন্যাস না হোক গল্প লিখতেন।আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ সেসব কি আমরা হবে।আমি বরং সুখস্মৃতিটা বুকে নিয়ে এখনকার মতো আসি।
ছবি সৌজন্যে:ব্যাকপ্যাকার দলের সদস্যবৃন্দ(অরিন্দম,সুরজিৎ,গোপাল)













Comments
Post a Comment