Machli Mela

মছলিমেলা
বর্ণালী রায়


পলাশের বনে ফাল্গুনের  জোৎস্ননায় অশরীরিদের অবছায়া উপস্থিতির ঘ্রান নেওয়ার এখনো দেরী আছে কিছুটা ,এখন বাংলা জুড়ে মেরু বাতাসের শীতল দাপাদাপি আর সূর্যদেবের উত্তরে যাবার পালা I ঠিক এই সময় গ্রাম বাংলা ভেসে যেত হরেক রকম  মেলায়, নিজের অবসর  যাপনের  আনন্দে I বিভিন্ন রকম মেলা বসে সারা বাংলার কোনায় কোনায়। বাংলার আনাচে কানাচে বৈচিত্র্যের কৌলিন্য দেশভাগ পরবর্তী সময়েও অবাক করার মতো I যেমন ধরুন উৎসবের কথা ,শহর বাংলার কথা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পশ্চিম বাংলার গ্রামে গঞ্জে মফস্বলে কত যে বিচিত্র রকমের মেলা নিয়ে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মানুষ মেতে ওঠে তাঁর হিসাব জীবনের গতানুগতিকতায় রাখা হয় না প্রায় করোর ই I পৌষ সংক্রান্তির দিন দক্ষিণ 24 পরগনার সাউথ বিষ্ণুপুরে পুরোনো জিনিসের(2nd Hand) মেলা ,হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের আলুর দমের মেলা I আজ আরেকটা বিচিত্র মেলার কথা বলছি তা হল হুগলি জেলার আদিসপ্তগ্রামের কেষ্টপুরে মাছের মেলা I
হুগলি জেলার আদিসপ্তগ্রামের কেষ্টপুরে প্রত্যেক বছর পয়লা মাঘ। শুধু মাত্র একদিনের জন্যে বসে মাছের মেলা। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ৫০০বছরের বেশি  পুরোনো এই মেলাতেই সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী বৈষ্ণব মানুষজন মাছ খান I আজও ধর্মবিশ্বাস এবং ব্যবসা একসাথে মিলেমিশে রমরমিয়ে চলছে এই মাছের মেলা Iআখড়ায়  রাধাকৃষ্ণের নাম সংকীর্তন চলতে থাকে আর বেলা যত বাড়ে ভক্তের দল ভীড় করে মেলা প্রাঙ্গনে I একদিকে মাছ কেনা ,মাছ রান্না করে খাওয়া অন্যদিকে ভক্ত মিলন এই নিয়ে মাছের মেলা চলে আসছে বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে I







এই মাছের মেলা শুধু মেলা নয় এটা বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষের এক গুরুত্বপূর্ণ  মিলনক্ষেত্র I কিন্তু শুনতে কেমন যেন বেসুরো লাগে মাছের মেলায় বৈষ্ণব মিলন  ক্ষেত্র I এর ইতিহাস অন্য রকম I জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ৫০০ বছর আগে তৎকালীন সপ্তগ্রাম বর্তমান আদিসপ্তগ্রামেI Iগ্রামের কাছেই ইতিহাস বিখ্যাত সপ্তগ্রাম বন্দর। সপ্তগ্রামের রাজা ছিলেন হিরণ্যদাস মজুমদার। তাঁর ভাই গোবর্ধন দাসের ছেলে রঘুনাথ, রাজামশাইয়ের আদরের ভাইপো, সকলের নয়নমণি। ধনদৌলতে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ধমর্প্রাণ বালকটি মাত্র পনেরো বছর বয়েসে পায়ে হেঁটে পুরী চলে যান। সেখানে তাঁর দেখা হয় নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সঙ্গে। মহপ্রভুর আদেশেই তিনি কৃষ্ণপুরে ফিরে আসেন। তাঁর ফিরে আসা উপলক্ষ্যেই ১ মাঘ উৎসব শুরু হয়েছিল।






তা, এই উৎসবে মাছেরা যোগ দিল কী করে? উত্তর দিলেন কৃষ্ণপুরের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের সেবায়েত শৈলেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ঘরে ফেরার পর, কৃষ্ণমগ্নপ্রাণ রঘুনাথের খ্যাতি আরও বাড়তে থাকল। তাঁর ভক্তির পরীক্ষা নিতে এলেন ৭০০ বৈষ্ণব। তাঁরা বললেন, ‘আমরা শুধু ইলিশ মাছের ঝোল আর আমের টক খাব।’ বিপদে পড়ে মনে মনে কৃষ্ণকে ডাকতে লাগলেন রঘুনাথ। ভক্তির জোরে জমিদারবাড়ির পুকুর থেকেই ধরা পড়ল জোড়া ইলিশ! আর দেখা গেল, মাঘের শীতেও মন্দির সংলগ্ন আম গাছে ঝুলছে এক ছড়া আম!  সকল কে বসিয়ে খাওয়ান তার সাধন ভূমি কৃষ্ণ মন্দিরের সংলগ্ন মাঠে I বৈষ্ণবরা জবর ঠকলেন। রঘুনাথকে প্রণাম ঠুকে ফিরে গেলেন। মাছের মেলার শুরু সেই থেকে।দিনটা ছিল পয়লা মাঘ ,সেই শুরু আজও এই অসময়ে  রঘুনাথ দাসের অলৌকিক ক্ষমতা মানুষ কে বিশেষত  বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষ কে পয়লা মাঘ টেনে  আনে কৃষ্ণপুরের মাছের মেলায়।








 বিশাল একটা চত্বর জুড়ে মাছের মেলা বসেছে। থরে থরে পনেরো-কুড়ি কিলোর রুই-কাতলা-মৃগেল-ভেটকি ডাঁই করা। অন্য দিকে ইয়াব্বড় ঝুড়ির ভেতর থেকে তরতরিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে কাঁকড়ারা। দরাদরি, কেনাকেটিতে চারিদিক সরগরম। প্রমাণ সাইজের সব মৎস্যাবতার, ঘচাঘচ, ঝপাঝপ শব্দে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছেন। তার পর ভাল মানুষের মতো সিঁধিয়ে যাচ্ছেন বাজারের থলিতে। দশ-পনেরো-কুড়ি কিলোর পেল্লাই মাছ কিনেও ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। দৃশ্য বটে।









এখনও মেলা উপলক্ষে এলাকা সংলগ্ন ব্যান্ডেল, চকবাজার, পান্ডুয়া, মগরা, চন্দননগর তো বটেই, এমন কী শিয়ালদা থেকেও কত লোক আসেন। অনেকেরই উদ্দেশ্য পিকনিক। এই মেলা থেকে মাছ কিনে তাঁরা ঢুকে পড়েন কৃষ্ণপুর দেবানন্দপুরের আমবাগান, কলাবাগানে। সেখানেই জমে ওঠে মৎস্যসহযোগে মহাভোজ। আর আসেন মৎস্যজীবী, মৎস্যবিক্রেতারা। কৃষ্ণপুর দেবানন্দপুরের বাড়ি বাড়ি এই সময় ভিড় জমান আত্মীয়রা। মাছ তো কেনেনই, নানা প্রজাতির বিশালাকৃতি মাছেদের স্বচক্ষে দেখার শখও কম নয়। সব মিলিয়ে প্রায় লক্ষ লোকের সমাগমে জমজমাট মছলিমেলা। প্রদর্শনীও হত। কিন্তু সে সব দিন গিয়েছে।
এবার আসি মাছের মেলায় মাছ প্রসঙ্গে I একদিকে রঘুনাথ দাসের আখড়ায় ভক্তি রসের  আস্বাদন  অন্যদিকে  মাছের আঁশটে গন্ধ গায়ে মেখে মেলায় মাছ খোঁজা I কি মাছ নেই সেখানে?? ভেটকি ,ভোলা,মাগুর ,কই,কালবোস,মৌরালা,ইলিশ ,আড় বাগড় , শঙ্কর,তোপসে,পাবদা,শাল,শোল,বোয়াল ,বান,আইলা ,রূপচাঁদা ,বাঁশপাতা , ফ্যাশা,কাচঁকি,কাজরী ,গুরজালি সহ আরো কত জানা অজানা  মাছ I মেলা থেকে মাছ কিনে বাড়ি আনতে পারেন আবার কেজি হিসাবে টাকার বিনিময়ে  ভাজিয়ে নিতে পারেন মেলা প্রাঙ্গণেI








অনেকেই সব সরঞ্জাম সঙ্গে এনে মেলার মাছ কিনে পাশের আম,কলা বাগানে চড়ুইভাতি করেন ওই দিন। দশ-পনেরো কিলোর ভেটকি, সামুদ্রিক শংকর মাছ অগুনতি। রুই-কাতলা-মৃগেলদের কথা তো আগেই বলেছি। ভেটকিই তো কত রকম, কত রঙের। ভোলা ভেটকি, কই ভেটকি, চাঁদা ভেটকি., লাল, কালো, রুপোলি সাদা। সঙ্গে রয়েছে নানা রকম গুড়জালি মাছ, আড় মাছ, ট্যাংরা, হালুয়া, কয়েক ফুট লম্বা পাঙ্গাস, গানদাস, রূপচাঁদা ,পায়রা চাঁদারা। কী বিশাল বিশাল দাঁড়ার চিংড়ি! হারিয়ে যেতে বসা কয়েকটা মৎস্যপরিবারও হাজির। যেমন চ্যাং, শাল, শোল, বোয়াল, ল্যাটা মাছ। এক সময়ে এখানে দেখা যেত বাঙ্গোস, কাকলেশ, বান, গুঁতে, পাঁকালের মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কিছু মাছ। সামুদ্রিক দুর্লভ মাছেদের নিয়ে।
দেখা মিলল হুগলির হালিশহর থেকে আসা বিজ্ঞান পরিষদের সদস্যদের। জানতে পারলাম  ‘এই চত্বরে মোট পঞ্চান্নটা মাছের আর সতেরোটা কাঁকড়ার স্টল ছিল এ বার। কাঁকড়াগুলো কিন্তু এক দাঁড়ার। মানে কাঁকড়াদের দুটো দাঁড়ার মধ্যে একটা ধরার সময়ই ভেঙে গিয়েছিল। মেলায় এক দাঁড়া কাঁকড়াই বিক্রি হয়েছিল ষাট-সত্তর টাকা কিলো।’ দুটো দাঁড়ার কাঁকড়াদের নাকি আর এ দেশের বাজারে দেখাই যায় না। সব বিমানে চেপে চলে যায় বিদেশের বাজারে! সে নিয়ে দুঃখ দেখে মৎস্যবিক্রেতা নারায়ণ দাস হাসলেন, ‘দেশ-বিদেশ, যেখানেই যান, এত বড় আর এত রকমের মাছের দেখা কিন্তু আর কোত্থাও পাবেন না।
পরিশেষে বলি এই মেলায় যাবেন কি ভাবে ? খুব ই সহজ ,হাওড়া -বর্ধমান  মেন্  লাইনের  অন্যতম স্টেশন আদিসপ্তগ্রাম I এখানে নেমে স্টেশন থেকেই পাবেন টোটো,অটো,রিকশাI তারাই আপনাকে নিয়ে যাবে কেষ্টপুরের মাছের মেলাযI যাঁরা দুচাকা বা গাড়ি তে যেতে চান তাদের জন্য তো দিল্লী রোড আর জিটি রোড তো আছেই।

Comments

Popular posts from this blog

Barshajapan e Chilapata Mendabari r Jangol

Silary Gaon

Ochena Purulia r anache kanache