মায়াবতী Swami Vivekananda r Mayawati
মায়াবী মায়াবতী
বর্ণালী রায়
বছরের গোড়াতেই রামকৃষ্ণমিশনের কোন একটা অনুষ্ঠানে প্রথম উত্তরাখণ্ডের মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমের কথা জানতে পারি।
আমার এক পরিচিত দাদা আমাকে হঠাৎই বলেন এত জায়গা তো ঘুরে বেড়াও, একবার মায়াবতী ঘুরে এসো। আশ্রমের উত্তর দিক থেকে প্রায় ৩৭০ কিমি পূর্ব থেকে পশ্চিমে নাকি পঞ্চচুল্লি, নন্দকোট, নন্দাদেবী, ত্রিশূল নীলকণ্ঠ,কেদারনাথ,বদ্রীনাথ এইসব বরফের পাহাড় নাকি স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি সেটা পূর্ণিমার রাত হয়, আকাশ পরিষ্কার থাকে, তবে সেই সৌন্দর্য ভাষাতীত। রুপালি হিমালয়ের রূপ নাকি তখন ধ্যানময় মহাদেবের মতো। গল্প শুনে ঠিক করে ফেললাম যেতেই হবে মায়াবতী। কিন্তু তখন জানতাম না, আর দশটা টুরিস্ট প্লেসের মতো চাইলেই মায়াবতী যাওয়া যায় না।
উত্তরাখন্ডের চম্পাবত জেলায় মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমটি অবস্থিত।চম্পাবত থেকে ২২কিমি আর কাছের শহর লোহাঘাট থেকে এর দূরত্ব ৯কিমি। উচ্চতা ১৯৪০ মিটার। মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমটি স্থাপিত হয়েছিল ১৮৯৯ সালের ১৯শে মার্চ।স্বামী বিবেকানন্দের দুই শিষ্য ক্যাপ্টেন জেমস হ্যানরি স্যাভিয়ার আর তার স্ত্রী শার্লট এলিজাবেথ স্যাভিয়র স্বামীজির স্বপ্ন পূরনে এই আশ্রমটি নির্মান করেন।
মায়াবতীরর আশ্রমে থেকতে গেলে কলকাতার এলগিন রোডের অদ্বৈত আশ্রমের হেড অফিস থেকে অনুমতি করাতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ওখানে গিয়ে শুননাম যাওয়ার দিনের তিন মাস আগে থেকে বুকিং নেওয়া হয়। তবে ওনাদের কথা শুনে মনে হল যারা রামকৃষ্ণ মিশনের শিষ্যত্ব নিয়েছেন, তারা অগ্রাধিকার পাবেন। সেটাই স্বাভাবিক। তবুও মনটা খারাপ হয়ে গেল। হয়তো যাওয়াই হবে না। আমি তো মিশনের শিষ্য নয়। বাড়ি ফিরে ফোন করলাম আমার সেই দাদাকে, যার কাছে প্রথম মায়াবতীরর কথা শুনেছিলাম। তিনি আশ্বাস দিয়ে বললেন,ওটা তো বেড়ানোর জায়গা নয়, তপস্যীদের ধ্যান করার জায়গা। বিশ্বাস রাখো, তোমার যদি যাওয়ার থাকে কেউ তোমায় আটকাতে পারবে না। উনি প্রায় এমন কথা বলে থাকেন। সবসময় যে বিশ্বাস করি এমনও নয়। কিন্তু মেল এড্রেসে লিখে পাঠালাম আমার পরিচয়, কেন যেতে চায় ইত্যাদি কথা। পাঠিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছি। বেশ কিছুদিন বাদে মেল এলো, তাতে বুঝলাম আমি ওখানে যাওয়ার অনুমতি নাও পেতে পারি। কিন্তু বিশ্বাস হারায়নি এক মুহূর্ত। বারবার মনে রাখতাম ওই কথাটা, যদি হওয়ার থেকে হবেই। প্রায় গোটা দশেক মেল আদানপ্রদান করে আশ্রমের মহারাজদের বোঝাতে পেরেছিলাম যে আমি শুধু বেড়ানোর জন্য যাচ্ছি না। আর অবাককান্ড এই গোটা সময়ে অদ্বৈত আশ্রমের ইতিহাস, স্বামীজির স্বপ্ন, নানা গল্প আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে, ছবি তোলা, লেখার চেয়েও মায়াবতীকে কাছ থেকে অনুভব করার ইচ্ছাটা তীব্রতর হচ্ছিল।
১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টম্বর স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতার পর তিনি আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে বেদান্তের সার্বজনীনতা প্রচার করে বেড়াচ্ছিলেন। মিঃ স্যাভিয়ার আর মিসেস স্যাভিয়ার লণ্ডনে স্বামীজির সাথে দেখা করে, তার কথা শুনে তার কাছে শিষ্যত্ব গ্রহনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।আমেরিকায় টানা তিন বছরের বেশি অবিরামভাবে বেদান্ত প্রচারের কাজ করতে করতে স্বামীজির শরীর খুব দুর্বল হওয়ায় বিদেশী বন্ধুরা তাকে সুইজারল্যাণ্ডের সুন্দর আবহাওয়ায় বেড়াতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানকার আল্পস পর্বতের সৌন্দর্য স্বামীজিকে হিমালয়ের কোলে একটা আশ্রম স্থাপনের স্বপ্নকে আরো উদ্দীপিত করে। ইচ্ছা প্রবল হয়। স্যাভিয়ার দম্পতিকে আগেই জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটা মঠ চাই যেখানে সমস্ব কাজকর্ম ছেড়ে জীবনের বাকী দিনগুলি ধ্যান করে কাটাতে পারি। মঠটি হবে শুধু কর্ম আর ধ্যানের জন্য।’’ তিনি চেয়েছিলেন অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করতে। অদ্বৈত এমন এক সাধন প্রনালী, যা মানুষকে পূর্ণ স্বাবলম্বন প্রদান করে, এবং তার সমস্ত পরাধীনতা, কুসংস্কার দূর করে আমাদের সব রকম দুঃখ সহ্য করার কাজ করার সাহস যোগায়, শেষে এটাই আমাদের মুক্তিলাভের সাহায্য করে।
অবশেষে স্যাভিয়রদের নিয়ে স্বামীজি ভারতে আসেন। আলমোড়ায় থেকে আশ্রমের জায়গার খোঁজ শুরু হয়। অবশেষে ১৮৯৯ সালে জেনারেল ম্যাকগ্রেগরের কাছ থেকে গ্লেন গাইল টি কিনে নেন স্যাভিয়ার দম্পতি, যা এখনকার মায়াবতী৷ সেখানেই আশ্রম তৈরি হয়৷ তৈরি হয় অদ্বৈত সাধনার পীঠস্থান৷ স্বামীজির স্বপ্নকে সফল করতে স্যাভিয়ার দম্পতি ছাড়াও আরো অনেকের ভূমিকা অনস্বীকার্য৷ তাঁদের মধ্যে স্বামী স্বরূপানন্দ, স্বামী বিরজানন্দ, স্বামী বিমলানন্দ, মোহনলাল শা থলঘড়িয়া অন্যতম৷ আশ্রম স্থাপিত হবার পর এখান এথকে “প্রবুদ্ধ ভারত’ নামের পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়৷
যত পড়ছিলাম, যত জানছিলাম তত যাবার ইচ্ছাটা তীব্র হচ্ছিল৷ অবশেষে ছাড়পত্র এল দিন পনেরো আগে৷ অকালতখ এক্সপ্রেসে চেপে কলকাতা থেকে বেরেলি স্টেশন পৌঁছে গেলাম তখন সকাল আটটা বাজে৷ আগে থেকে গাড়ি বলা ছিল৷ স্টেশনের বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন লক্ষ্ণণ সিং অধিকারী ৷গাড়ি ছুটে চলল লালকুঁয়া, কাঠগোদাম হয়ে পাহাড়ের দিকে৷ পাহাড়ের পাকদণ্ডী পেরিয়ে অজস্র পাহাড়ি গ্রাম পেরিয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা রাস্তা অতিক্রম করে আমরা লোহাঘাট পৌঁছালাম৷ এখনো ৯ কিমি রাস্তা৷ এদিকে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে৷ সন্ধ্যার আগে পৌঁছানোর কথা বলেছেন অধ্যক্ষ মহারাজ৷ কিন্তু লোহাঘাটের পর পেট্রোল পাম্পের পাশ দিয়ে গাড়িটা ইউটার্ন নিতেই সব উদ্বেগ উধাও হয়ে গেল ম্যাজিকের মতো৷ আমি জানি না সেটা রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য় না অন্য কিছু৷ মন একটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আশ্রমের গেটের বাইরে৷ গাড়ি বাইরে রেখে পায়ে হেঁটে আশ্রমের ভিতরে গিয়ে সোজা আশ্রমের অফিসে চলে গেলাম৷ কিছু নিয়ম মাফিক সই সাবুদের পর মহারাজ ঋষি কুটিরের চাবি দিয়ে দিলেন হাতে৷ গাড়ি নিয়ে কশেকশো মিটার নিচে যেতে হল৷ এখানেই অতিথি নিবাস৷ আমি “ঋষি কুটির’ এ থাকার ঘর পেয়েছি৷ আরেকটি গেস্ট হাউস আছে সামনেই “বিবেকানন্দ ভবন’৷ দুটি গেস্ট হাউসই চমৎকার৷ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম৷ ঘরে দুটি খাট, একটি আলনা৷ একটি পড়ার টেবিল আছে৷ শীতের জন্য পর্যাপ্ত লেপ, কম্বল, আধুনিক টয়লেট সবরকম সুব্যবস্থা আছে৷ কিন্তু মজার বিষয় আপনাকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য কিন্তু কেউ নেই৷ আর এখানেই মায়াবতী আশ্রমের বিশেষত্ব, যেখানে তাঁদের কর্মধারা আমাদের প্রতি পদে মনে করায় আমরা সবাই এক৷ নিজের কাজ নিজে করাতে বিশ্বাস করায়৷ আর আশ্চর্য আমাদের কিন্তু বিন্দুবিসর্গ অসুবিধা হয় না৷ সেটা এক তলায় নেমে খাবার জল আনাই হোক আর ঘর, বাথরুম পরিচ্ছন্ন রাখাই হোক৷ ঘরে একটা নিময়বিধির কাগজ লাগানো আছে৷ সেখান থেকেই দেখলাম চারবেলা খাবার নির্দিষ্ট টাইম আছে৷ রাতের খাবার খেতে খেতে হবে রাত সাড়ে আটটায়৷ তার আগে সারাদিনের ক্লান্তি কাটিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম৷ আশ্রমে যেতে হলে বেশ খানিকটা পথ চড়াই পেরিয়ে যেতে হয়৷ রাস্তা বা সিড়ি যেটা খুশি ব্যবহার করা যায়৷ আমরা খুব ক্লান্ত ছিলাম বলে গাড়ি নিয়েই গেলাম৷ নিয়মানুবর্তিতা যে কোন কাজকে একটা মাত্রায় পৌঁছে দিতে পারে৷ তারই আদর্শ উদাহরণ হিসেবে আশ্রমের প্রতিদিনের জীবন ধারাকে তুলে ধরা যায়৷ আমরা যে কদিন ছিলাম প্রতিদিন চারবেলা প্রায় পঞ্চাশ ষাটজন মানুষের খাবার বানানো, খাবার দেওয়া, দেখাশোনা করা, সমান বণ্টন, খেতে বসার আগেই থালা গ্লাস হাজির করা, প্রতিবেলায় স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের মেনু তৈরি করা, কে খেতে এল না এল তার হিসেব রাখা সবেতেই নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি৷ পুরো আশ্রমের প্রধান হিসেবে যেমন অধ্যক্ষ মহারাজ আছেন৷ তেমনি খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে লাইব্রেরি, রিডিং সেশন, গান বাজনা, বাগান দেখা, খামার বাড়ি, হাসপাতাল সব কিছুরই দায়িত্বই অন্যান্য মহারাজদের উপর ভাগ করে দেওয়া৷ দুপুরে আর রাতে প্রার্থনীয় ব্রহ্ম সংগীত গাওয়ার পর খাবার খাওয়ার রীতি চালু আছে৷ রাতে খাবার সেদিন রিডিং সেশন ছিল৷ স্বামীজির ক্রিয়াযোগ বইটি থেকে কয়েকটি পাতা পড়ে শোনালেন মহারাজ৷ মিনিট দশেকের সেশন৷ তারপর যে যার মতো গেস্ট হাউসে ফেরা৷ রাতের এই সেশন বসে স্বামীজির স্মৃতিধন্য আশ্রমের গোল কামড়াতে, যেখানে থাকতেন পড়াশুনো করতেন, আলোচনা করতেন৷ তিনি দিন পনেরো ছিলেন এখানে৷ এখন সেখানের আশ্রমের অভ্যন্তরীণ লাইব্রেরি৷ পরদিন সকাল পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল৷ গেস্ট হাউস থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম আশ্রমে৷ মূল গেট দিয়ে ঢুকেই প্রজ্ঞা ভবন৷ তার পাশ দিয়ে হেঁটে ভিতর দিকে যাওয়া যায়৷ সামনেই আছে বিশাল ফুলের বাগিচা৷ হলুদ রঙের একেশিয়া ফুলের বাহার৷ লাল, নীল, বেগুনি নানা রং বাহারি ফুলের পসরা৷ তার সাথে আছে আপেল, ন্যাসপাতি, প্লাম, এপ্রিকট, এলমণ্ড নানা ফুলের গাছের সম্ভার৷ দেখলাম সকাল থেকে মালি গাছেদের পরিচর্যা করছে৷ সেইই বলল, মহারাজদের তত্ত্বাবধানেই মূলত যাবতীয় কাজ হয়৷ এই বাগিচা ছাড়াও উপর দিকে সরোবরের পাশে যে সবজি বাগান আছে সেখানেও পরিচর্যার লোক আছে৷ আশ্রমের মধ্যেই একটা লোহার রেলিং ঘেরা খোলা জায়গা আছে, ওপাশেই গভীর খাদ আর জঙ্গল৷
ওই মালিই বলল, মায়াবতীতে এখনো নাকি চিতাবাঘ, বন ভল্লুক, বার্কিং ডিয়ার, সজারু, নানা জাতের সাপ আছে৷ আর থাকবে নাই বা কেন? পুরোটাই তো গভীর জঙ্গল৷ আশ্রমের সব অংশে প্রবেশ নিষেধ৷ আর সত্যিই তো যত বেশি লোকজনের আগমন বাড়বে তত বেশি সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে৷ তবে সত্যি এটাই যে মায়াবতীর এই পরিবেশ খুব চঞ্চল মানুষকেও স্থির হতে শেখায়৷ এপাশ ওপাশ করতে করতেই সাড়ে সাতটা বেজে গেল৷ প্রাতরাশ করতে আবার লোকজনের ভিড় হয়ে এল৷ আমি এবার গুটিগুটি পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম বিবেক সরোবর৷ ছোট একটা জলাশয়৷ স্বামী এখানে নাকি আসতে পায়চারি করতে পছন্দ করতেন৷
তার পাশ দিয়ে হেঁটে উপরে উঠলেই পরপর সবজি ক্ষেত, গোশালা৷ তার পাশের রাস্তাটা জঙ্গলের ভিতরে চলে গেছে যেখানে স্বামী স্বরূপানন্দ ধ্যান করতেন৷ গল্প শুনেছি প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার শেষে হিমালয়ে রাত্রি নেমে এলে স্বামী স্বরূপানন্দ গভীর জঙ্গলের মাঝে আত্মচিন্তায় মগ্ন হতেন৷ এমনই একদিনের ঘটনা৷ গভীর রাতে ধ্যানান্তে আশ্রমে ফিরতে গিয়ে বাঘের মুখে পড়েন৷ তারপরই মাদার স্যাভিয়ার আশ্রমের কাছাকাছি জঙ্গলের ভিতর অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গাতে এই কুঠিয়া নির্মাণ করে দেন৷ যেখানে তিনি ধ্যান জপ বেদান্ত আলোচনায় নিমগ্ন হতে পারতেন৷ তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সেই কুঠিয়া আজও বিরাজমান স্বরূপানন্দ পয়েন্টে৷ টিনের ছাউনি তারের জাল, পাকা মেঝে৷ সাধুরা এখানে মাঝে মাঝে রাতে ধ্যান করে কাটান এখানে৷
ওখান থেকে হেঁটে এসে পৌঁছে গেলাম চ্যারিটেবল হাসপাতালের কাছে৷ নাম কৃপালয়া৷ পাঁচতলা ভবন৷ এখানে বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্রসূতি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, এক্সরে, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, বিভিন্ন বিভাগ, রোগীদের থাকার ঘর, ডাক্তারদের থাকার জায়গা৷ সব মিলিয়ে যে কোন আধুনিক হাসপাতালের সমতূল্য৷ নানা রাজ্য থেকে প্রথিতযশা ডাক্তাররা এসে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যান এখানে৷ বিনামূল্যে এখানে সবরকম চিকিৎসা করা হয়৷ এ যেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ৷
আবার হেঁটে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসের দিকে চোখে পড়ল ক্যাপ্টেনস হাউস৷ গেস্ট হাউসের চত্বরেই আছে মাদার স্যাভিয়ারের সামার্স বাংলো৷
এইসব দেখতে দেখতেই প্রায় দুপুর৷ ঋষি কুটিরের দোতলাতে আমাদের ঘর৷ সেখানেই আছে মেডিটেশন রুম৷ পর্দা ঘেরা এক বিশাল ঘর৷ অন্ধকার৷ শুধু দূরে ওম প্রতীকটির উপর স্পটলাইট ফেলা৷ আত্মনিমগ্নতা ছাড়া কোন অনুভবই যেখানে প্রশ্রয় পায় না৷
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আশ্রম থেকে একজন গাইড দেওয়া হল, গভীর জঙ্গলের রাস্তায় উচুঁ নিচু পাথুরে রাস্তা দিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার হেঁটে আমরা ধরমগড় গেলাম৷ টিনের ছাউনি, তারের জাল আর পাকা দেওয়ার ঘেরা একটা কুটির৷ কুটিরের গায়ে লেখা আছে স্বামীজি৷ এখানে ১৮৮৭ সালে ধ্যানরত হয়েছিলেন৷ বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে ফিরে এলাম আশ্রমে৷
ফিরে এসে দেখলাম আশ্রমের সামনেই “প্রবুদ্ধ ভারত’ ভবনটি খোলা আছে৷ এখানে বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি ভাষায় আশ্রম প্রকাশিত বিভিন্ন বই, জার্নাল রাখা আছে৷ পড়াশোনা, কেনা সবকিছুর সুযোগ আছে৷ ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে৷ আশ্রমে সোলার লাইটগুলি জ্বলে ওঠে৷ সেদিন রাতে খাবার পর গানবাজনার আসর বসল৷ একজন মহারাজ গাইলেন, একজন বাজালেন৷ মাঝে মাঝে তারা গানের পিছনের গল্প বলতে লাগলেন৷ সব মিলিয়ে এক অনাবিল আনন্দধারা৷ সকাল-বিকেল তারা অতিথিদের সেবা করছেন, নিজেদের নির্ধারিত কাজও করছেন, তবু তার মাঝেই সাধনায় লিপ্ত থাকছেন৷ আশ্রম তখন শুনশান৷ সেই নিঃসীম নিমগ্নতায় শুধু কাফল পাকো পাখিটি এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে দিন রাত৷
লোহাঘাট থেকে ৭ কিমি দূরে এবট মাউন্ট বলে একটা ঐতিহাসিক পাহাড়ি জায়গা আছে৷ যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরিসীম৷ এখানে ব্রিটিশ গথিক আর্কিটেকচারে তৈরি একটা চার্চ, কতগুলি কটেজ আছে৷ লোহাতি নদী এই লোহাঘাটের প্রাণকেন্দ্র৷ আর আছে শহর থেকে ৮ কিমি দূরে বানাসুরের কেল্লা৷
অদ্বৈত আশ্রমে থাকার অনুমতি না মিললে মায়াবতীকে কাছ থেকে জানা যাবে না ঠিকই,, তবে উপায় না থাকলে লোহাঘাটে কে এম ভি এন এর হোটেল ছাড়াও অনেক প্রাইভেট হোটেল আছে৷
বর্ণালী রায়
বছরের গোড়াতেই রামকৃষ্ণমিশনের কোন একটা অনুষ্ঠানে প্রথম উত্তরাখণ্ডের মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমের কথা জানতে পারি।
আমার এক পরিচিত দাদা আমাকে হঠাৎই বলেন এত জায়গা তো ঘুরে বেড়াও, একবার মায়াবতী ঘুরে এসো। আশ্রমের উত্তর দিক থেকে প্রায় ৩৭০ কিমি পূর্ব থেকে পশ্চিমে নাকি পঞ্চচুল্লি, নন্দকোট, নন্দাদেবী, ত্রিশূল নীলকণ্ঠ,কেদারনাথ,বদ্রীনাথ এইসব বরফের পাহাড় নাকি স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি সেটা পূর্ণিমার রাত হয়, আকাশ পরিষ্কার থাকে, তবে সেই সৌন্দর্য ভাষাতীত। রুপালি হিমালয়ের রূপ নাকি তখন ধ্যানময় মহাদেবের মতো। গল্প শুনে ঠিক করে ফেললাম যেতেই হবে মায়াবতী। কিন্তু তখন জানতাম না, আর দশটা টুরিস্ট প্লেসের মতো চাইলেই মায়াবতী যাওয়া যায় না।
উত্তরাখন্ডের চম্পাবত জেলায় মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমটি অবস্থিত।চম্পাবত থেকে ২২কিমি আর কাছের শহর লোহাঘাট থেকে এর দূরত্ব ৯কিমি। উচ্চতা ১৯৪০ মিটার। মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমটি স্থাপিত হয়েছিল ১৮৯৯ সালের ১৯শে মার্চ।স্বামী বিবেকানন্দের দুই শিষ্য ক্যাপ্টেন জেমস হ্যানরি স্যাভিয়ার আর তার স্ত্রী শার্লট এলিজাবেথ স্যাভিয়র স্বামীজির স্বপ্ন পূরনে এই আশ্রমটি নির্মান করেন।
মায়াবতীরর আশ্রমে থেকতে গেলে কলকাতার এলগিন রোডের অদ্বৈত আশ্রমের হেড অফিস থেকে অনুমতি করাতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ওখানে গিয়ে শুননাম যাওয়ার দিনের তিন মাস আগে থেকে বুকিং নেওয়া হয়। তবে ওনাদের কথা শুনে মনে হল যারা রামকৃষ্ণ মিশনের শিষ্যত্ব নিয়েছেন, তারা অগ্রাধিকার পাবেন। সেটাই স্বাভাবিক। তবুও মনটা খারাপ হয়ে গেল। হয়তো যাওয়াই হবে না। আমি তো মিশনের শিষ্য নয়। বাড়ি ফিরে ফোন করলাম আমার সেই দাদাকে, যার কাছে প্রথম মায়াবতীরর কথা শুনেছিলাম। তিনি আশ্বাস দিয়ে বললেন,ওটা তো বেড়ানোর জায়গা নয়, তপস্যীদের ধ্যান করার জায়গা। বিশ্বাস রাখো, তোমার যদি যাওয়ার থাকে কেউ তোমায় আটকাতে পারবে না। উনি প্রায় এমন কথা বলে থাকেন। সবসময় যে বিশ্বাস করি এমনও নয়। কিন্তু মেল এড্রেসে লিখে পাঠালাম আমার পরিচয়, কেন যেতে চায় ইত্যাদি কথা। পাঠিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছি। বেশ কিছুদিন বাদে মেল এলো, তাতে বুঝলাম আমি ওখানে যাওয়ার অনুমতি নাও পেতে পারি। কিন্তু বিশ্বাস হারায়নি এক মুহূর্ত। বারবার মনে রাখতাম ওই কথাটা, যদি হওয়ার থেকে হবেই। প্রায় গোটা দশেক মেল আদানপ্রদান করে আশ্রমের মহারাজদের বোঝাতে পেরেছিলাম যে আমি শুধু বেড়ানোর জন্য যাচ্ছি না। আর অবাককান্ড এই গোটা সময়ে অদ্বৈত আশ্রমের ইতিহাস, স্বামীজির স্বপ্ন, নানা গল্প আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে, ছবি তোলা, লেখার চেয়েও মায়াবতীকে কাছ থেকে অনুভব করার ইচ্ছাটা তীব্রতর হচ্ছিল।
১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টম্বর স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতার পর তিনি আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে বেদান্তের সার্বজনীনতা প্রচার করে বেড়াচ্ছিলেন। মিঃ স্যাভিয়ার আর মিসেস স্যাভিয়ার লণ্ডনে স্বামীজির সাথে দেখা করে, তার কথা শুনে তার কাছে শিষ্যত্ব গ্রহনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।আমেরিকায় টানা তিন বছরের বেশি অবিরামভাবে বেদান্ত প্রচারের কাজ করতে করতে স্বামীজির শরীর খুব দুর্বল হওয়ায় বিদেশী বন্ধুরা তাকে সুইজারল্যাণ্ডের সুন্দর আবহাওয়ায় বেড়াতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানকার আল্পস পর্বতের সৌন্দর্য স্বামীজিকে হিমালয়ের কোলে একটা আশ্রম স্থাপনের স্বপ্নকে আরো উদ্দীপিত করে। ইচ্ছা প্রবল হয়। স্যাভিয়ার দম্পতিকে আগেই জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটা মঠ চাই যেখানে সমস্ব কাজকর্ম ছেড়ে জীবনের বাকী দিনগুলি ধ্যান করে কাটাতে পারি। মঠটি হবে শুধু কর্ম আর ধ্যানের জন্য।’’ তিনি চেয়েছিলেন অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করতে। অদ্বৈত এমন এক সাধন প্রনালী, যা মানুষকে পূর্ণ স্বাবলম্বন প্রদান করে, এবং তার সমস্ত পরাধীনতা, কুসংস্কার দূর করে আমাদের সব রকম দুঃখ সহ্য করার কাজ করার সাহস যোগায়, শেষে এটাই আমাদের মুক্তিলাভের সাহায্য করে।
অবশেষে স্যাভিয়রদের নিয়ে স্বামীজি ভারতে আসেন। আলমোড়ায় থেকে আশ্রমের জায়গার খোঁজ শুরু হয়। অবশেষে ১৮৯৯ সালে জেনারেল ম্যাকগ্রেগরের কাছ থেকে গ্লেন গাইল টি কিনে নেন স্যাভিয়ার দম্পতি, যা এখনকার মায়াবতী৷ সেখানেই আশ্রম তৈরি হয়৷ তৈরি হয় অদ্বৈত সাধনার পীঠস্থান৷ স্বামীজির স্বপ্নকে সফল করতে স্যাভিয়ার দম্পতি ছাড়াও আরো অনেকের ভূমিকা অনস্বীকার্য৷ তাঁদের মধ্যে স্বামী স্বরূপানন্দ, স্বামী বিরজানন্দ, স্বামী বিমলানন্দ, মোহনলাল শা থলঘড়িয়া অন্যতম৷ আশ্রম স্থাপিত হবার পর এখান এথকে “প্রবুদ্ধ ভারত’ নামের পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়৷
যত পড়ছিলাম, যত জানছিলাম তত যাবার ইচ্ছাটা তীব্র হচ্ছিল৷ অবশেষে ছাড়পত্র এল দিন পনেরো আগে৷ অকালতখ এক্সপ্রেসে চেপে কলকাতা থেকে বেরেলি স্টেশন পৌঁছে গেলাম তখন সকাল আটটা বাজে৷ আগে থেকে গাড়ি বলা ছিল৷ স্টেশনের বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন লক্ষ্ণণ সিং অধিকারী ৷গাড়ি ছুটে চলল লালকুঁয়া, কাঠগোদাম হয়ে পাহাড়ের দিকে৷ পাহাড়ের পাকদণ্ডী পেরিয়ে অজস্র পাহাড়ি গ্রাম পেরিয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা রাস্তা অতিক্রম করে আমরা লোহাঘাট পৌঁছালাম৷ এখনো ৯ কিমি রাস্তা৷ এদিকে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে৷ সন্ধ্যার আগে পৌঁছানোর কথা বলেছেন অধ্যক্ষ মহারাজ৷ কিন্তু লোহাঘাটের পর পেট্রোল পাম্পের পাশ দিয়ে গাড়িটা ইউটার্ন নিতেই সব উদ্বেগ উধাও হয়ে গেল ম্যাজিকের মতো৷ আমি জানি না সেটা রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য় না অন্য কিছু৷ মন একটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আশ্রমের গেটের বাইরে৷ গাড়ি বাইরে রেখে পায়ে হেঁটে আশ্রমের ভিতরে গিয়ে সোজা আশ্রমের অফিসে চলে গেলাম৷ কিছু নিয়ম মাফিক সই সাবুদের পর মহারাজ ঋষি কুটিরের চাবি দিয়ে দিলেন হাতে৷ গাড়ি নিয়ে কশেকশো মিটার নিচে যেতে হল৷ এখানেই অতিথি নিবাস৷ আমি “ঋষি কুটির’ এ থাকার ঘর পেয়েছি৷ আরেকটি গেস্ট হাউস আছে সামনেই “বিবেকানন্দ ভবন’৷ দুটি গেস্ট হাউসই চমৎকার৷ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম৷ ঘরে দুটি খাট, একটি আলনা৷ একটি পড়ার টেবিল আছে৷ শীতের জন্য পর্যাপ্ত লেপ, কম্বল, আধুনিক টয়লেট সবরকম সুব্যবস্থা আছে৷ কিন্তু মজার বিষয় আপনাকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য কিন্তু কেউ নেই৷ আর এখানেই মায়াবতী আশ্রমের বিশেষত্ব, যেখানে তাঁদের কর্মধারা আমাদের প্রতি পদে মনে করায় আমরা সবাই এক৷ নিজের কাজ নিজে করাতে বিশ্বাস করায়৷ আর আশ্চর্য আমাদের কিন্তু বিন্দুবিসর্গ অসুবিধা হয় না৷ সেটা এক তলায় নেমে খাবার জল আনাই হোক আর ঘর, বাথরুম পরিচ্ছন্ন রাখাই হোক৷ ঘরে একটা নিময়বিধির কাগজ লাগানো আছে৷ সেখান থেকেই দেখলাম চারবেলা খাবার নির্দিষ্ট টাইম আছে৷ রাতের খাবার খেতে খেতে হবে রাত সাড়ে আটটায়৷ তার আগে সারাদিনের ক্লান্তি কাটিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম৷ আশ্রমে যেতে হলে বেশ খানিকটা পথ চড়াই পেরিয়ে যেতে হয়৷ রাস্তা বা সিড়ি যেটা খুশি ব্যবহার করা যায়৷ আমরা খুব ক্লান্ত ছিলাম বলে গাড়ি নিয়েই গেলাম৷ নিয়মানুবর্তিতা যে কোন কাজকে একটা মাত্রায় পৌঁছে দিতে পারে৷ তারই আদর্শ উদাহরণ হিসেবে আশ্রমের প্রতিদিনের জীবন ধারাকে তুলে ধরা যায়৷ আমরা যে কদিন ছিলাম প্রতিদিন চারবেলা প্রায় পঞ্চাশ ষাটজন মানুষের খাবার বানানো, খাবার দেওয়া, দেখাশোনা করা, সমান বণ্টন, খেতে বসার আগেই থালা গ্লাস হাজির করা, প্রতিবেলায় স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের মেনু তৈরি করা, কে খেতে এল না এল তার হিসেব রাখা সবেতেই নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি৷ পুরো আশ্রমের প্রধান হিসেবে যেমন অধ্যক্ষ মহারাজ আছেন৷ তেমনি খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে লাইব্রেরি, রিডিং সেশন, গান বাজনা, বাগান দেখা, খামার বাড়ি, হাসপাতাল সব কিছুরই দায়িত্বই অন্যান্য মহারাজদের উপর ভাগ করে দেওয়া৷ দুপুরে আর রাতে প্রার্থনীয় ব্রহ্ম সংগীত গাওয়ার পর খাবার খাওয়ার রীতি চালু আছে৷ রাতে খাবার সেদিন রিডিং সেশন ছিল৷ স্বামীজির ক্রিয়াযোগ বইটি থেকে কয়েকটি পাতা পড়ে শোনালেন মহারাজ৷ মিনিট দশেকের সেশন৷ তারপর যে যার মতো গেস্ট হাউসে ফেরা৷ রাতের এই সেশন বসে স্বামীজির স্মৃতিধন্য আশ্রমের গোল কামড়াতে, যেখানে থাকতেন পড়াশুনো করতেন, আলোচনা করতেন৷ তিনি দিন পনেরো ছিলেন এখানে৷ এখন সেখানের আশ্রমের অভ্যন্তরীণ লাইব্রেরি৷ পরদিন সকাল পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল৷ গেস্ট হাউস থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম আশ্রমে৷ মূল গেট দিয়ে ঢুকেই প্রজ্ঞা ভবন৷ তার পাশ দিয়ে হেঁটে ভিতর দিকে যাওয়া যায়৷ সামনেই আছে বিশাল ফুলের বাগিচা৷ হলুদ রঙের একেশিয়া ফুলের বাহার৷ লাল, নীল, বেগুনি নানা রং বাহারি ফুলের পসরা৷ তার সাথে আছে আপেল, ন্যাসপাতি, প্লাম, এপ্রিকট, এলমণ্ড নানা ফুলের গাছের সম্ভার৷ দেখলাম সকাল থেকে মালি গাছেদের পরিচর্যা করছে৷ সেইই বলল, মহারাজদের তত্ত্বাবধানেই মূলত যাবতীয় কাজ হয়৷ এই বাগিচা ছাড়াও উপর দিকে সরোবরের পাশে যে সবজি বাগান আছে সেখানেও পরিচর্যার লোক আছে৷ আশ্রমের মধ্যেই একটা লোহার রেলিং ঘেরা খোলা জায়গা আছে, ওপাশেই গভীর খাদ আর জঙ্গল৷
ওই মালিই বলল, মায়াবতীতে এখনো নাকি চিতাবাঘ, বন ভল্লুক, বার্কিং ডিয়ার, সজারু, নানা জাতের সাপ আছে৷ আর থাকবে নাই বা কেন? পুরোটাই তো গভীর জঙ্গল৷ আশ্রমের সব অংশে প্রবেশ নিষেধ৷ আর সত্যিই তো যত বেশি লোকজনের আগমন বাড়বে তত বেশি সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে৷ তবে সত্যি এটাই যে মায়াবতীর এই পরিবেশ খুব চঞ্চল মানুষকেও স্থির হতে শেখায়৷ এপাশ ওপাশ করতে করতেই সাড়ে সাতটা বেজে গেল৷ প্রাতরাশ করতে আবার লোকজনের ভিড় হয়ে এল৷ আমি এবার গুটিগুটি পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম বিবেক সরোবর৷ ছোট একটা জলাশয়৷ স্বামী এখানে নাকি আসতে পায়চারি করতে পছন্দ করতেন৷
তার পাশ দিয়ে হেঁটে উপরে উঠলেই পরপর সবজি ক্ষেত, গোশালা৷ তার পাশের রাস্তাটা জঙ্গলের ভিতরে চলে গেছে যেখানে স্বামী স্বরূপানন্দ ধ্যান করতেন৷ গল্প শুনেছি প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার শেষে হিমালয়ে রাত্রি নেমে এলে স্বামী স্বরূপানন্দ গভীর জঙ্গলের মাঝে আত্মচিন্তায় মগ্ন হতেন৷ এমনই একদিনের ঘটনা৷ গভীর রাতে ধ্যানান্তে আশ্রমে ফিরতে গিয়ে বাঘের মুখে পড়েন৷ তারপরই মাদার স্যাভিয়ার আশ্রমের কাছাকাছি জঙ্গলের ভিতর অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গাতে এই কুঠিয়া নির্মাণ করে দেন৷ যেখানে তিনি ধ্যান জপ বেদান্ত আলোচনায় নিমগ্ন হতে পারতেন৷ তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সেই কুঠিয়া আজও বিরাজমান স্বরূপানন্দ পয়েন্টে৷ টিনের ছাউনি তারের জাল, পাকা মেঝে৷ সাধুরা এখানে মাঝে মাঝে রাতে ধ্যান করে কাটান এখানে৷
ওখান থেকে হেঁটে এসে পৌঁছে গেলাম চ্যারিটেবল হাসপাতালের কাছে৷ নাম কৃপালয়া৷ পাঁচতলা ভবন৷ এখানে বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্রসূতি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, এক্সরে, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, বিভিন্ন বিভাগ, রোগীদের থাকার ঘর, ডাক্তারদের থাকার জায়গা৷ সব মিলিয়ে যে কোন আধুনিক হাসপাতালের সমতূল্য৷ নানা রাজ্য থেকে প্রথিতযশা ডাক্তাররা এসে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যান এখানে৷ বিনামূল্যে এখানে সবরকম চিকিৎসা করা হয়৷ এ যেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ৷
আবার হেঁটে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসের দিকে চোখে পড়ল ক্যাপ্টেনস হাউস৷ গেস্ট হাউসের চত্বরেই আছে মাদার স্যাভিয়ারের সামার্স বাংলো৷
এইসব দেখতে দেখতেই প্রায় দুপুর৷ ঋষি কুটিরের দোতলাতে আমাদের ঘর৷ সেখানেই আছে মেডিটেশন রুম৷ পর্দা ঘেরা এক বিশাল ঘর৷ অন্ধকার৷ শুধু দূরে ওম প্রতীকটির উপর স্পটলাইট ফেলা৷ আত্মনিমগ্নতা ছাড়া কোন অনুভবই যেখানে প্রশ্রয় পায় না৷
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আশ্রম থেকে একজন গাইড দেওয়া হল, গভীর জঙ্গলের রাস্তায় উচুঁ নিচু পাথুরে রাস্তা দিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার হেঁটে আমরা ধরমগড় গেলাম৷ টিনের ছাউনি, তারের জাল আর পাকা দেওয়ার ঘেরা একটা কুটির৷ কুটিরের গায়ে লেখা আছে স্বামীজি৷ এখানে ১৮৮৭ সালে ধ্যানরত হয়েছিলেন৷ বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে ফিরে এলাম আশ্রমে৷
ফিরে এসে দেখলাম আশ্রমের সামনেই “প্রবুদ্ধ ভারত’ ভবনটি খোলা আছে৷ এখানে বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি ভাষায় আশ্রম প্রকাশিত বিভিন্ন বই, জার্নাল রাখা আছে৷ পড়াশোনা, কেনা সবকিছুর সুযোগ আছে৷ ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে৷ আশ্রমে সোলার লাইটগুলি জ্বলে ওঠে৷ সেদিন রাতে খাবার পর গানবাজনার আসর বসল৷ একজন মহারাজ গাইলেন, একজন বাজালেন৷ মাঝে মাঝে তারা গানের পিছনের গল্প বলতে লাগলেন৷ সব মিলিয়ে এক অনাবিল আনন্দধারা৷ সকাল-বিকেল তারা অতিথিদের সেবা করছেন, নিজেদের নির্ধারিত কাজও করছেন, তবু তার মাঝেই সাধনায় লিপ্ত থাকছেন৷ আশ্রম তখন শুনশান৷ সেই নিঃসীম নিমগ্নতায় শুধু কাফল পাকো পাখিটি এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে দিন রাত৷
লোহাঘাট থেকে ৭ কিমি দূরে এবট মাউন্ট বলে একটা ঐতিহাসিক পাহাড়ি জায়গা আছে৷ যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরিসীম৷ এখানে ব্রিটিশ গথিক আর্কিটেকচারে তৈরি একটা চার্চ, কতগুলি কটেজ আছে৷ লোহাতি নদী এই লোহাঘাটের প্রাণকেন্দ্র৷ আর আছে শহর থেকে ৮ কিমি দূরে বানাসুরের কেল্লা৷
অদ্বৈত আশ্রমে থাকার অনুমতি না মিললে মায়াবতীকে কাছ থেকে জানা যাবে না ঠিকই,, তবে উপায় না থাকলে লোহাঘাটে কে এম ভি এন এর হোটেল ছাড়াও অনেক প্রাইভেট হোটেল আছে৷

Comments
Post a Comment