খাজুরাহো Khajuraho
খাজুরাহো এক অনিন্দ্য শিল্পকর্ম
বর্ণালী রায়
বুন্দেলখন্ডের খাজুরাহো মন্দির সেই নির্মাণের শতক থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের মনে বিশ্ময়ের উদ্রেক করে চলেছে। পূর্ণিমার রাতে খোলা আকাশের নীচে মন্দির চত্বরের পিছনের মাঠে বসে খাজুরাহো মন্দিরের ইতিহাস,মিথ, অমিতাভ বচ্চনের ব্যরিটোন,লাইট এন্ড সাউন্ডের মোহময় হাতছানি বিশ্ময়কে আবেশে পর্যবশিত করে মুহূর্তেই । ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজ,অপ্সরীদের নুপুরের ঝংকার,রাজা প্রজার কথোপকথন কল্পনাকে প্রশ্রয় দেয় বাস্তবরূপদানের জন্য। মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের উদ্যোগে নির্মিত এই ৫০ মিনিটের অডিও ভিস্যুয়াল প্রদর্শনীতে খাজুরাহো মন্দির তৈরির সমকাল প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। সেখানে উঠে আসে কী ভাবে বুন্দেলখণ্ডের রাজপুত চান্দেলা রাজাদের আমলে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এই বিপুল ভাস্কর্য।১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা দেওয়ার পর থেকেই বিদেশি ট্যুরিস্টের বাড়বাড়ন্ত। গরম কালের তিন-চার মাস বাদ দিলে প্রায় সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে।
বলা হয়ে থাকে বারানসীর এক ব্রহ্মণের এক অনিন্দ্য সুন্দরী কন্যা ছিল। তার নাম হেমবতী। কিন্তু ব্রাহ্মণের এই কন্য খুব অল্প বয়সেই বিধবা হয়। জ্যোস্নাশোভিত গ্রীষ্মের রাতে এই বিধবা কন্যা পদ্মপুকুরে স্নান করতে গেলে চন্দ্র দেব তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পড়েন। পরে চন্দ্র দেবতা মানুষের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন, এবং তারা দুই জনে একে অন্যের সাথে মিলিত হন। যখন তাদের মোহ কাটে তখন চন্দ্র দেবতা নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং নিজে নিজেকে অভিশাপ দিতে থাকেন একজন বিধবার সাথে এই ধরনের অনৈতিক কাজের জন্য। সেই সাথে চন্দ্রদেব হেমবতীকে অর্শিবাদ করেন যে, তার গর্ভে যে সন্তান জন্ম হবে সেই সন্তান হবে সিংহ পুরুষ এবং বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। এই ঘটনার পর হেমবতী নিজ গৃহ ত্যগ করে খাজুরপুর (খাজুরাহো) তে আসেন এবং এখানে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এই পুত্র সন্তানের নাম রাখেন চন্দ্রবর্মন। চন্দ্রবর্মন এর সাহস ও শক্তি সম্পর্কে বলা হয় যে,- মাত্র ১৬ বছর বয়সে সে খালি হাতে বাঘ ও সিংহ শিকার করতে পারতেন। পরবর্তীতে তিনি চন্দ্র দেবের আর্শিবাদের কারনে এই অঞ্চলের রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি তার মায়ের ইচ্চায় এই অঞ্চলে ৮৫টি মন্দির নির্মান করেন। এই মন্দির গুলো লেক ও বাগান দ্বার পরিপূর্ণ ছিল। তিনি খাজুরাহোতে একটি যজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন যাতে তার মায়ের পাপ মোচন হয়।
আবার অন্যত্র মিথটি একটু ভিন্ন ভাবে পাওয়া যায, সেটি হলো- হেমবতী কালিঞ্জার রাজ্যের রাজা ব্রাহ্মণ মনি রামের বিধবা কন্যা। একদিন মনিরাম ভুলবশত আমাবশ্যাকে পূর্ণিমা রাত হিসেবে রাজার সামনে উপস্থাপন করে। এই বিষয়টি হেমবতী জানার পর অত্যান্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। বাবার এই ভুলের কারণে বাবার সম্মান যদি নষ্ট হয় তবে হেমবতী তা সহ্য করতে পারবেন না। তাই তিনি চন্দ্র দেবতার নিকট প্রার্থনা করতে থাকেন। চন্দ্রদেবতা এই রূপ সুন্দরী কিশোরীর রূপে অভিভুত এবং তার প্রেমে পড়ে মনের ইচ্চা পুরণ করেন, এবং তারা একে অন্যের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে যখন মনি রাম এই বিষয়টি জানতে পারেন তখন নিজে নিজেকে অভিশাপ দেন এবং পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়। এরপর হেমবতী গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, তার নাম রাখেন চন্দ্রতেয় এবং ধারণা করা হয় এই পুত্র সন্তাই পরবর্তীতে চান্দেলা রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা । চান্দেলারা মনিরামের পাথরের মুর্তিটিতে মুনিয়া দেবে নামে পূজা করে থাকেন।
খাজুরাহো বর্তমান মধ্যপ্রদেশের ছত্রপুর জেলায় অবস্থিত। ট্রেনে খাজুরাহো যেতে গেলে হাওড়া থেকে জবলপুরগামী যে কোনও ট্রেনে মধ্যপ্রদেশের সাতনা স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়া যায়, ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা। মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের গেস্টহাউসেও থাকতে পারেন বা কোনও বেসরকারি হোটেলে।
মন্দির শহরে পৌঁছে প্রথম সন্ধ্যেয় একটু আশপাশ ঘুরে দেখতে পারেন। রুপোর অ্যান্টিক গয়নার দোকান রয়েছে অনেকগুলো। রয়েছে বেশ কিছু কিউরিও শপ। সেখানে মধ্যপ্রদেশের নিজভূমের শিল্প-ভাস্কর্যের ভাণ্ডার। বহু প্রাচীন জিনিসের সন্ধান মিলে যেতে পারে।পরদিন ভোর ভোর চলে আসুন মন্দিরে।ভোর ৬টা থেকে খুলে যায় চত্বরটি।একজন সরকারি গাইডের সাথে ঘুরে দেখে নিন আমাদের ভারতবর্ষের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্য ।
মন্দির চত্বরে ঘুরতে ঘুরতে ইতিহাসের পাতাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।ভারতীয় দর্শনের সাথে সাথে সনাতন হিন্দুধর্মের মেলবন্ধন,বাস্তবের সাথে শিল্পের মেলবন্ধন দেওয়ালের গায়ে খোদাই হয়ে আছে।ক্ষিতি,অপ,তেজ,মরুৎ, ব্যোম এর মতো পঞ্চতত্ত্ব থেকে শুরু করে ধর্ম,অর্থ,কাম,মোক্ষ এর মতো পুরুষার্থের আধারগুলোকে অনবদ্য পারর্দশীতার সাথে মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মিথুনমূর্তি ছাড়াও মানুষের প্রাত্যহিকজীবনের ব্যস্ততার ছবি,রোজনামচার গল্প লুকিয়ে আছে মন্দিরের গায়ে গায়ে।
এই অনিন্দ সুন্দর মন্দিরটির অধিকাংশ স্থাপনা, মূর্তি ও টেরাকোটা বালি পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই মন্দির মূলত শিব, বিষ্ণু ও জৈনদের মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এক দল বিশেষজ্ঞ মনে করেন , হিন্দু ধর্মে ও মানব জীবনে ‘কাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই ‘কামের’ প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন মন্দিরে এই বিষয় গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।জীবের জীবনে 'কামের' বিষয়টিকে মাথায় রেখেই হয়তো এই মন্দির গুলো নির্মান করা হয়েছিল।আবার অনেকেই মনে করেন ‘কামসূত্রের’ বিষয়গুলো এখানে প্রতীকী আকারে দেখানো হয়েছে। আবার এটাও বলাহয় যে, চন্দ্রদেব ও হেমবতীর যৌন মিলনকে স্বর্গীয় বিবেচনা করে স্বর্গের দেবতাদের যৌন আকাঙ্খাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।মন্দিরের শিল্পকলা যে কামসূত্রদ্বারা প্রভাবিত ছিল তা সহজেই বুঝা যায় এইসব মিথুনমূর্তগুলির মাধ্যমে।
এই মন্দির গুলোতে যে সকল মিথুন শিল্পকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার মধ্যে- হালকা মেদ যুক্ত কোমর ও উন্নত বক্ষের নারী, যৌন ক্রীড়ারত অবস্থায় বিভিন্ন প্যানেল চিত্র। বিভিন্ন ধরনের যৌন আসন সহ বিভিন্ন প্রতিলিপি। এছাড়া পশুর সাথে যৌনরত অবস্থায় বিভিন্ন মূর্তি। এই মন্দিরে উৎকীর্ণ নারী চরিত্রের কেউ যৌনরত অবস্থায় আবার কেউ চুল ধোয়া অবস্থায় আবার কেউ নৃত্যরত অবস্থায় আবার কেউ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ব্যস্ত। এখানে যে সকল প্যানেল মূর্তি রয়েছে তার মধ্যে নগ্নাবস্থায় নারীরা তাদের সখীদের সাথে আলাপরত, একধিক নারী একজন পুরুষের সাথে যৌন মিলন রত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও দেবাঙ্গনা শৃঙ্গার করছে, কোথাও কোনও নগরবধূ স্নানের পর তার দীর্ঘ ঘন চুল শুকোচ্ছে বা কোথাও কোনও রাজবালা অপেক্ষায় বসে আছে যুদ্ধ থেকে কখন তার প্রেমিক ফিরবে সেই আশায়। নারী–পুরুষের বাধাহীন যৌনমিলন ও তার মাধ্যমেই জাগতিক অবস্থা থেকে মোক্ষ লাভ।মূর্তিগুলি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল সেই যুগেও রাজা,রাজগুর, শিল্পকারেরা কত সংবেদনশীল ও মননশীল ছিলেন যে মন্দির গাত্রকে এক অপূর্ব রসে সিক্ত করতে পেরেছিলেন।নারী মূর্তিগুলির বিভঙ্গ,সিক্ত বস্ত্র,মুখাবয়বের আঙ্গিক দেখে মাঝে মাঝে ভুলে যাচ্ছিলাম ওগুলো নিষ্প্রাণ।
এছাড়াও বিভিন্ন প্যানেলে বিভিন্ন মিথকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেমন, শিব ও পার্বতীর বিয়ের অনুষ্ঠান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খাজুরাহো মন্দিরে রাজপুতদের বিভিন্ন ঘটনাকেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে,সাধারণ মানুষ, কৃষক, বাদকদল, কুমারেরও, সেনাবাহিনীর প্রতিচিত্র রয়েছে। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন পশুপাখি যেমন-সিংহ, বাঘ, ঘোড়া ও পাখির চিত্রও রয়েছে।মন্দিরে উৎকীর্ণ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে অন্যতম হাতির প্রতিকৃতি।মানুষের কাম,ক্রো, লোভ,মোহ,মদ, মাৎষর্য এই ষড় রিপুকে প্রতীকী আকারে খোদাই করা হয়েছে। স্বর্গীয় উল্লাস ও ভালবাসা, মিথুন--যেটি কামসূত্রের চৌষট্টি কলার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।সেখানে
কাম,ধ্যান,জপ,মুদ্রা সব মিলে মিশে এক স্বর্গীয় আখ্যান রচনা কর, যা কিনা মোক্ষ লাভের পথ প্রদর্শন করে । গাইডের কথা অনুযায়ী ১৬টি চরিত্র তার মধ্যে ১২জন পুরু, ৫জন নারী মূর্তি আর তাদের কাম কলা এই মন্দিরের প্রতিটি ছত্রে বর্ণিত। শিল্পকে রূপকথার রাজ্যে নিয়ে গেছেন যেসব শিল্পকার তাদের কুর্নিশ।এখানে নাকি ৫৬ রকমের চুল বাধাঁ মূর্তিও খুঁজে পাওয়া গেছে।এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও যখন আমি প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত সচেতনভাবে,নিষিদ্ধতার গন্ডিতে থেকে লিখছি, তখন সেই নবম থেকে একাদশ শতকের মানুষেরা শৃঙ্গার,সম্ভোগ,কাম,মিথুনকে শিল্প রূপ দিতে দ্বিধান্বিত হন নি। গবেষকরা দেখেছেন,নারী সেই সময় কতটা আধুনি, শিক্ষিতা ছিল,সম অধিকার ছিল।কিন্তু মধ্যযুগীয় গাঢ় অন্ধকার সেই ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করে পিছনে ঠেলে দিল।
বারবার সেই অমোঘ উক্তিটা মনে পড়ে,"সত্য সেলুকাস,বড় বিচিত্র এ দেশ।" এই দেশেতেই অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড তৈরি হয়েছে। আবার এই দেশেতেই পুরাকালে গড়ে উঠেছিল খাজুরাহো। ভারতদর্শন সম্পূর্ণ করতে গেলে হয়তো একটা গোটা জীবন লেগে যাবে আর সেই তালিকায় যদি খাজুরাহো না থাকে তা হলে আসমুদ্র হিমাচল চষে ফেললেও ভারতবর্ষকে পুরোটা চেনা হবে না।খেজুরের অনেক গাছ ছিল নাকি এই অঞ্চল। যদিও এখন তার নাম গন্ধ নেই।কিন্তু চান্দেলা রাজবংশের এই অমোঘ কীর্তি যুগে যুগে যেমন প্রশংসা পেয়েছে। সে যুগের ইবন বতুতা থেকে আজকের নানা দেশি বিদেশি গবেষকদের টেনে এনেছে,তেমনই একদল নেটিজেনদের সমালোচনারও সম্মুখীন হতে হয়েছে একে।
৯৫০ শতক থেকে শুরু করে ১০৫০ শতক এই হাজার বছর ধরে তৈরি করা ২১ স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা ৮৫ মন্দিরের মধ্যে এখন মাত্র আর ২২টি ই অস্তিত্বশীল।মন্দিরগুলিকে পশ্চিম,পূর্ব আর দক্ষিণের মন্দির গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। পশ্চিমের মন্দিরের মধ্যে লক্ষ্মণ মন্দির,কান্দারিয়া মহাদেব মন্দির,চৌষট্টি যোগীনি মন্দির,নন্দি,পার্বতী মন্দির উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য গ্রুপের মন্দিরের মধ্যে ব্রহ্মা মন্দির, জাভেরি,দুলাদেও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকের মন্দিরগুলির মধ্যে হিন্দু দেবদেবী, অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু বা শিবের সঙ্গে সঙ্গে জৈন মন্দির ও ৬৪ যোগিনী মন্দিরও রয়েছে। ৬৪ যোগিনী মন্দির খাজুরাহোর সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির এবং অন্যান্য সব মন্দিরের চেয়ে এর দেওয়াল অলঙ্করণ আলাদা।মধ্যযুগে হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি ভক্তিবাদী আন্দোলনও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তাই সব ধর্মের সম্মান রক্ষার্থে চান্দেলা রাজারা জৈন তীর্থঙ্করদের মন্দিরও বানিয়েছিলেন। দক্ষিণ-পূর্বে জৈন মন্দিরগুলির মধ্যে পার্শ্বনাথ, আদিনাথ ও শান্তিনাথের মন্দির পাওয়া যায়। জৈন মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে মধ্যপ্রদেশের আর এক বৈশিষ্ট্য, বাউলি। পাথরের চওড়া প্যাঁচালো সিঁড়ি দিয়ে বেশ খানিক নেমে জলাধার।
পশ্চিমদিকের মন্দিরগুলিই অবশ্য সবচেয়ে বিখ্যাত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মন্দির বিশ্বনাথ বা মহাদেবের মন্দির। তার পাশেই রয়েছে জগদম্বার মন্দির। এ ছাড়াও লক্ষ্মী, বরাহ অবতার ও বিষ্ণুমন্দির রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এর মধ্যে বরাহ অবতারের গায়ে যে সূক্ষ্ম কারুকাজ তা দেখে সত্যিই মুগ্ধতা আর বিস্ময়ে মাথার মধ্যে ঘোর লাগে।৯X৯ (৮১) গ্রিড-বিশিষ্ট ‘পরম সায়িক’ নকশা দেখা যায় বৃহদাকার প্রথাগত হিন্দু মন্দিরগুলিতে। হিন্দু মন্দির নির্মাণে যে বিভিন্ন প্রকার গ্রিড ব্যবহৃত হয়, এটি তার মধ্যে অন্যতম। এই ধরনের মন্দির হল সামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতির মন্দির। এখানে প্রত্যেকটি সমকেন্দ্রিক নকশার বিশেষ গুরুত্ব আছে। ‘পৈশাচিক পাদ’ নামে পরিচিত বাহ্যিক নকশাটি অসুর বা অশুভের প্রতীক। অন্যদিকে ভিতরের ‘দৈবিক পাদ’ নকশাটি দেবতা বা শুভের প্রতীক। শুভ ও অশুভের মধ্যে এককেন্দ্রিক ‘মানুষ পাদ’ মানবজীবনের প্রতীক। প্রতিটি নকশা ‘ব্রহ্মপাদ’কে ঘিরে থাকে। ব্রহ্মপাদ সৃষ্টিশক্তির প্রতীক। এখানেই মন্দিরের প্রধান দেবতার মূর্তি থাকে। ব্রহ্মপাদের একেবারে কেন্দ্রস্থলটি হল ‘গর্ভগৃহ’। এটি সবকিছু ও সবার মধ্যে অবস্থিত ব্রহ্মের প্রতীক।এটি একটি পবিত্র ক্ষেত্র যার পরিবেশ ও নকশা হিন্দু জীবনদর্শনের প্রতিটি ধারণাকে প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করে।] জীবন সৃষ্টি ও রক্ষার প্রতিটি বিশ্বজনীন উপাদান হিন্দু মন্দিরে উপস্থিত – আগুন থেকে জল, দেবতার মূর্তি থেকে প্রকৃতি, পুরুষ থেকে নারীসত্ত্বা, অস্ফুট শব্দ ও ধূপের গন্ধের থেকে অনন্ত শূন্যতা ও বিশ্বজনীনতা – সবই মন্দিরের মূল আদর্শের অন্তর্গত।
আমাদের সনাতন শাস্ত্রে সবকিছুই এক এবং সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত – এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই হিন্দু মন্দির নির্মাণের মূল নকশাটি প্রস্তুত করা হয়। ৬৪-গ্রিড বা ৮১-গ্রিড গাণিতিকভাবে নির্মিত স্থান ও শিল্পকলায় মণ্ডিত স্তম্ভের মধ্য দিয়ে তীর্থযাত্রীকে স্বাগত জানানো হয়। মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলি – যেমন অর্থ (উন্নতি, সম্পদ), কাম (বিনোদন, যৌনতা), পুরুষার্থ (সদ্গুণ ও নৈতিক জীবন) ও মোক্ষ (জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি, আত্মজ্ঞান) – এগুলির অনুসন্ধানে মানুষকে প্রবুদ্ধ করার জন্য স্তম্ভগুলি খোদাইচিত্র বা মূর্তিতে শোভিত থাকে।মন্দিরের কেন্দ্রে, সাধারণত দেবতার নিচে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপরে বা পাশে, খানিকটা ফাঁকা জায়গা রাখা হয়। এখানে কোনো অলংকরণ থাকে না। এটি সর্বোচ্চ উপাস্য ব্রহ্ম বা পুরুষের প্রতীক। ব্রহ্ম নিরাকার, সর্বত্রব্যাপী, সবকিছুর মধ্যে যোগসূত্ররূপী ও সবকিছুর সারবস্তু। হিন্দু মন্দিরের উদ্দেশ্য ব্যক্তির মনকে পবিত্র করা ও ভক্তের আত্মজ্ঞান জাগরিত করা।
হিন্দুধর্মে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় চেতনার মধ্যে কোনো বিভাজনরেখা নেই। সেই অর্থে, হিন্দু মন্দিরগুলি শুধু পবিত্র স্থানই নয়, ধর্মনিরপেক্ষ স্থানও বটে। এগুলির অর্থ ও উদ্দেশ্য আধ্যাত্মিক জীবনের বাইরে সামাজিক রীতিনীতি ও দৈনিক জীবনের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়ে এগুলিকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান করে তুলেছে।মন্দির আসলে মনের অন্দরমহল।আর তারই প্রস্ফুটন এই খাজুরাহ। যেখানে দেব মূর্তিকে দৈনিক, লৌকিক উপাচারে বাঁধা যায় না,যেখানে প্রেমই ঈশ্বরের কাছে পৌছানোর উপায়।










Comments
Post a Comment