Purulia r Matha Pahar e Mathaburu r Golpo

                   
             মাঠাবুরুর জঙ্গলে  
       @Barnali Roy   
                                         



জঙ্গলের নুড়ি পাথরের রাস্তা ধরে হাঁটতে কতদূর চলে এসেছি সেটাও আন্দাজ পাচ্ছি না।
মাথার উপর সূর্য গনগন করছে।বিশাল বিশাল শাল,পিয়া শাল,মহুয়া গাছের মাঝে মাঝে ছোট ছোট কাঁটা গাছের ঝোপ পেরিয়ে পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি।বেড়িয়েছিলাম মাঠা পাহাড়ের মাথায় চড়ব বলে,কিন্তু প্রায় ঘন্টা তিন ধরে মাঠা পাহাড়ের চারিপাশের জঙ্গলে চর্কিপাক খাচ্ছি।
পাহাড় যেমন তেমনই আমরাই আর তাতে ওঠার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না।
দড়দড় করে ঘামছি,ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে জঙ্গলের মাঝেই একটা পাথরের উপর বসে পড়েছি।নীল আমায় বলল,হ্যা রে  হাঁটতে হাঁটতে শেষ মেষ শুন্ডি পৌঁছে যাব না তো?
ঘাম মুছতে মুছতে আমি বললাম কত ভাল হত যদি গুপিগাইনবাঘাবাইনের জুতো জোড়া পাওয়া যেত।
এত তো জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়াই ভুতের রাজা গেল কই?
সে যাত্রায় শুণ্ডি পৌঁছায়নি ঠিকই কিন্তু এক মজার কান্ড হয়েছিল।ওই কথা বলার পর আবার
হাঁটা শুরু করেছি।হঠাৎ দেখি নীল হাত পা নেড়ে চিৎকার করে উঠল,দাদুও দাদু মাঠায় ওঠার
পথ কোন দিকে?কিন্তু আশ্চর্য ভাবে দাদুর কোন বিকার নেই,তাকাচ্ছেই না লোকটা।অনেক্ষন ডাকাডাকি
করে ফল না পেয়ে নিজেরাই গেলাম লোকটার কাছে।ওই গভীর জঙ্গলের ভিতর একফালি চাষ জমি।ভাবা
যায়।আমার কাছে যেতেই দাদু যেন ভূত দেখল।এক চিৎকার দিয়ে কিসব বলতে লাগল হাত পা নেড়ে।




আমি ভয় পাওয়ার বদলে ফিক করে হেসে ফেললাম।আর নীল আমার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকালো।
কিন্তু কি করবো আমার যে বড্ড গুপীগাইন বাঘাবাইন গল্পের শুণ্ডির সেই বুড়োলোকটার কথা মনে পড়ে
গেল।আর এরজন্য পুরো নীল দায়ী।যা হোক অনেক কষ্টে বুঝেছিলাম আমারা মাঠা পেরিয়ে প্রায় চার কিমি চলে
এসেছি।এটা অন্য একটা গ্রাম নাম দুয়ারসিনি।আরে হ্যাঁ কথায় কথায় বলতে ভুলে গেছিলাম,আজ সকালে
এসেছি পুরুলিয়া জেলার মাঠাগ্রামেমাঠাবুরু র নামে এই পাহাড়, এই গ্রাম।আরে সেই তখন থেকে তো ওই
পাহাড়ে ওঠারই চেষ্টা চালাচ্ছি।আর দেখুন কান্ড পৌঁছে গেলাম দুয়ারসিনি।
যদিও সোনায় সোহাগা হয়েছে।আল পথের জবজবে কাঁদা,চোরকাঁটার পথ পেড়িয়ে ঢুকে পড়েছি একটা ছবির
গ্রামে।হাঁপিয়ে গিয়ে বসলাম এক মাটির দাওয়ায়।জল চাইতেই গৃহকর্ত্রী আসন পেতে দুলেন,ঘটি ভরে ঠান্ডা জল
দিলেন।আহ! কি ঠান্ডা।দেখলাম দুজন মহিলা পদ্মফুলের বীজ আর পাঁপড়ি দিয়ে কি যেন বানাচ্ছেন।জিজ্ঞাসা
করায় জানলাম বাতের ব্যাথার ঔষধ তৈরি করছে ওরা।সামনেই সব্জি ক্ষেতে চাষ হচ্ছে।গ্রামের বাড়ির উঠোন
দাওয়া পেরিয়ে মেন রোডে পৌঁছালাম।কিছুটা হেঁটে এসে একটা ম্যাজিক ভ্যান পেলাম।মাঠায় নামিয়ে দিল।



ফিরে এসে গল্পটা করছিলাম আমাদের কেয়ারটেকার ঠাকুরদাস মাহাতোকে।সে তো হেসেই খুন।
হাওড়া থেকে রাতের আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে এসে পরদিন ভোর সাড়ে সাতটা তে এসে পৌঁছালাম
বরাভূম স্টেশনে।জায়গাটার নাম বলরামপুর।ওখান থেকে দীপকদার মারুতি ভ্যানে করে প্রায় ১৮কিমি
দূরের মাঠা গ্রামে এসে পৌঁছেছি, ঘড়িতে তখন বেলা সাড়ে আট টা।পথে রাঙা ডি,রসুল ডি,ডাভা গ্রাম পেড়িয়ে
আধ ঘন্টার পথ।হরি মন্দিরের গা ঘেঁষে পাকা রাস্তা ছেড়ে মাঠা মোড় থেকে একটা রাস্তা বেঁকে গেছে মোড়ামের
পথ ধরে।কিছুটা এগোতেই একটা উঁচু নীচু ঢেউ খেলানো জমির উপর একচালা একটা বাড়ি।আমার এক
পরিচিত বন্ধু বেশ কিছু বছর আগে চাষের জন্য জমি কিনেছিলেন।কিন্তু রুখা জমিতে যতটা না ফসল ফলে,
তার চেয়ে ক্যাম্প বাঁধা হয় বেশি।হ্যাঁ পাহাড় চড়া যাদের নেশা শীতের সময়টা তারা ছুটে আসে মাঠা পাহাড়ে
রক ক্লাইম্বিং এর কোর্স করতে।




আমরা আস্তানা নিলাম ওই একচালা ঘরে।বদ্ধ গরম,আর ঘরে দুটো খাটিয়া আর
একটা টেবিল ফ্যান।সে যা হোক আমাদের দেখভালের দায়িত্ব ঠাকুরদাস মাহাতোর।টিউকলের ঠান্ডা জলে হাত
পা ধুয়ে গরম গরম লুচি আর আলুর দম দিয়ে জলখাবার টা সেরে নিলাম।ভাবা যায়,এই প্রত্যন্ত গ্রামেও নাকি
এসব। একেই বলে কপাল।তার পরই গেছিলাম মাঠা পাহাড়ে চড়তে। আর তখন ঐ কান্ড।
ফিরে তো এলাম বিফল হয়ে।ঠাকুরদাস দা কথা দিল সে দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর রোদ পড়লে নিয়ে যাবে
আমাদের।নীল তো খুব খুশি।সান সেটের ছবি পাবে মাঠার উপর  থেকে।
মাছের ঝাল আর ভাত খেয়ে দাওয়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছি,ঠাকুরদাস দা হাজির একটা কাটারি আর লাঠি নিয়ে।
আমরাও ওর পিছন পিছন হাঁটা দিলাম। বাড়িটার পিছনের সরু রাস্তাটা সোজা জঙ্গল পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে।
খানিকটা এগোনোর পর দেখলাম ঠাকুরদাস দা এমন একটা পাথরের উপর উঠল যেটার গায়ে জংলি
গাছপালা ভর্তি।নীল বা আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি এটা পথ হতে পারে।সকালে তো এটার পাশ দিয়েই
গেছি।এ এদের পক্ষেই সম্ভব।ঠাকুরদাস একটু করে এগোচ্ছে আর ডালপালা ছাটছে।ওর কাছেই শুনলাম
১লা মাঘ মাঠাবুরুর পূজা হয়।সেই সময় হাজার হাজার পূন্যার্থীর ভিড় হয়।শ য়ে শ য়ে পাঁঠা,মুরগি, পায়রা,
হাঁস বলি হয়।মেলাও বসে পূজা উপলক্ষ্যে।দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে জড়ো হয়।ঝুমুর গান,ধামসা, মাদলের
তালে তালে সাঁওতাল নারী পুরুষ মেতে ওঠে আনন্দে।




পুরুলিয়ার সব পাহাড়ের
পাথরগুলোই কেমন যেন হলদেটে টাইপের।ছোট বড় পাথর বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে।চারিপাশে গভীর জঙ্গল।
ডালপালা ছেঁটে শরীরটুকু ঢোকানোর পথ হচ্ছে মাত্র।পূজার সময়ই একমাত্র জঙ্গল সাফা করা হয়।একটা পাথর
থেকে অন্য একটা পাথরের উচ্চতা বেশখানিকটা করে।আমি হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে, বসে  বসে ঠাকুরদাসের গল্প
শুনতে শুনতে উঠতে লাগলাম।আর নীল ছবি তুলতে ব্যস্ত  হয়ে পড়ল।ডালপালা ছাটতে ছাটতে
এগোচ্ছি,একবার দুবার বিশ্রাম নিচ্ছি।পাথর গুলো বিক্ষিপ্ত ভাবে আছে।তাই কোথাও কোথাও বেশ বেগ পেতে
হচ্ছে।মাঝেমধ্যে ভয়ও হচ্ছে।





জন্তুজানোয়ার ছাড়াও পুরুলিয়ার পাহাড়ের একটা বিপদ হল চোরা
নদীস্রোত।যেকোনো মুহুর্তে হরকা বাণে ভেসে যেতে পারে সব।আমাদের উঠতে প্রায় দুঘণ্টা সময় লেগে গেছে
দেখলাম ঘড়ির কাঁটায়।প্রায় দু হাজার ফুট উঁচু পাহাড়।পাহাড়ের উপর  জঙ্গলের মাঝে একটা কালি
মন্দির।ঠাকুরদাস  দা বলল এখনকার মন্দিরটা খুব পুরানো না হলেও দেবীর থান খুব প্রাচীন।মন্দিরের উলটো
দিকেই একটা বিশাল পাথরের খন্ড।সেটা পেরিয়ে গিয়ে দেখলাম পূজার পুরানো ফুল,মালা,মানদের ঘোড়া
সব ছড়িয়ে পড়ে।




এখান থেকে অনেক দূর  পর্যন্ত দেখা যায়।ঠাকুরদাস দেখাল দূরের চান্ডিল পাহাড় আর চান্ডিল
ড্যাম।সূর্য অস্তগামী। আর সেই সোনালী আভায় সমস্ত গ্রাম,পাহাড়,নদী চকচক করছে।সেই আলো ক্রমশ নীল
থেকে কালচে হয়ে আসছে।নীলের ছবি তোলা শেষ।আমরা বুঝতেই পারিনি কখন অন্ধকার এত ঘন হয়ে
এসেছে।আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম।
ঠাকুরদাস বলল,'ভয় লাই দিদি, মাঠাবুরু আছে কিনি'।



ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সাথে রাতের জঙ্গল যেন জেগে উঠেছে,আরো কতসব বিচিত্র আওয়াজ।পা টিপে টিপে
এক পা দু পা করে নামছি।সাথে ভরসা বলতে মোবাইলের টর্চ।ঠাকুরদাস আগে আমরা পিছনে।থেকে থেকেই
মনে হচ্ছে কেউ যেন পিছু নিয়েছে।নীল আবার মজা শুরু করেছে।এই মোক্ষম সুযোগ বুঝলি ভুতের রাজার
সাথে মিটিং টা ফিক্সড করার।তখন হঠাৎ আমার ডান হাতটা কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগল।আমি তো তেড়ে মেড়ে
চিৎকার দিলাম।ওরা ছুটে এসে লাইট মেড়ে দেখল একটা গাছের ডালে জামাটা আটকে গেছে।বাকি পথটা
নীলকে শাপ শাপান্ত করতে করতে নামলাম।
এই তো নীচে এসেছি।এ যেন এক দীর্ঘ পথ।এ যাত্রায় বেঁচে ফিরেছি যেন।কিন্তু মনের মধ্যে একটা
অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে।আরে আজ পূর্ণিমা। অথচ পাহাড়ের জঙ্গল এত ঘন যে সেটা টেরই পাই নি।পাহাড় থেকে
নেমে একটা উঁচু ঢিবির উপর বসেছি।মাঠা পাহাড় জঙ্গল ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়।পাহাড় অনেক
চড়েছি।ককিন্তু এই রোমাঞ্চ,এই বন্যতা আমাকে এক অন্য স্বাদ এনে  দিয়েছে।মোড়ের মাথায় ত্রিপুরা দাসের
চায়ের দোকানে বসে খেজুরের চপ,আলুর পাকোড়া আর চা দিয়ে সেই আনন্দটা সেলিব্রেট না করে কি ঘরে
ফেরা যায়?তাই এবার আড্ড জমল চায়ের ঠেকে।

Comments

Popular posts from this blog

Barshajapan e Chilapata Mendabari r Jangol

Silary Gaon

Ochena Purulia r anache kanache