Ochena Sundarban
@Barnali Roy

সুন্দরবনের অন্দরে
পথ ধরে অনভ্যস্ত টালমাটাল পায়ে এসে যখন জিরো পয়েন্টে পৌঁছালাম তখন গোধূলি। একপাশে আদিগন্ত
কালিন্দী নদী।দূরেই বাংলাদেশ।পাশেই গহন সুন্দর বন।মানুষ আর বাঘের বসবাসের মধ্যে ফারাক শুধু কয়েক
হাত নদীর।এখানে এসে আলাপ হল বিশ্বরূপ মন্ডলের সাথে।লোকটা বছর দশ আগেও পোচার ছিল।একটা
দেশি পাইপগান দিয়ে নাকি সামনে থেকে চারটে বাঘ মেরেছে।অথচ ছোটখাটো চেহারার অতি সাধারন একটা
লোক।দেশি ও বিদেশি পাচারকারীদের সাথে যোগাযোগ ছিল এক সময়।অনেক কটা কেসও চলছে ওর
নামে।কিন্তু এখন ভদ্রলোক সুন্দরবনের পরিবেশ ও পশুপাখি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ
করছেন।ভারি অবাক হওয়ার মতো গল্প তার।যে লোকটা এক সময় জঙ্গলের সম্পদ চুরি করতো,সেই ই
আজকাল জঙ্গল বাঁচাতে মুভমেন্ট করছে,বই লিখছে সুন্দরবন কে নিয়ে।
| মাছ কাঁকড়া ধরা : সুন্দরবন |
এই অঞ্চলটাতে সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষদের বাস।শূয়র প্রতিপালন এদের জীবিকা।জিরো পয়েন্ট এ
যাদের বাস ওদের মুখেই শুনলাম, সপ্তাহ খানেক আগেও নাকি শেষ একবার বাঘের ডাক শুনেছিলেন ওরা।তবেআয়লার পর বাঘের সংখ্যা কমেছে বলে ওদের ধারণা।
এই জায়গায় শীতকালে নাকি অনেক পরিযায়ী পাখি আসে।সূর্য ডুবছে জঙ্গলের ওপাশে।আকাশের রং গলন্ত
সোনার মতো। ফিরতে হবে এবার।
পরদিন আমরা কালিতলা নদীর ঘাট থেকে মোটর লাগানো নৌকায় চেপে গেলাম ঝিঙেখালি ফরেস্ট
অফিস।এখানকার নদীগুলোর একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে।সকালের দিকে জল কম থাকে বেলা বাড়ার সাথে
সাথে জোয়ার আসে।
রায়মঙ্গল নদী। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। নদীতে গড়ান,গেওয়া,গর্জন গাছের সারি।
ছোট কুঁড়েখালি নদী বড় নদীতে পড়েছে।নৌকাএসে থামল ফরেস্ট অফিসের ঘাটের সামনে।পারমিট নিয়ে
আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।কত অদ্ভুত সব গাছ গাছালি।হেতাল,বয়ড়া,গড়ান, গেওয়া,গর্জন,সুন্দরী,
ক্যাওড়া।সাধারণত আমাদের চারপাশে এমন গাছ চোখে পড়ে না।লোহার জালে ঘেরা পুরো এরিয়া।ওয়াচ
টাওয়ারে উঠে চারপাশের কয়েক কিলোমিটার জঙ্গল চোখে পড়ল।ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ। একেবারে শান্ত
চারিপাশ। পাখির ডাক ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না।ছবি তুলে,নিরিবিলিতে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে
ফেরত এলাম নৌকোর কাছে।নদীতে জল আরো বেড়েছে।হাঁটু জল বেড়ে বুক জল।আসার সময় যে
বাচ্চাগুলো হাঁটুজলে হৈহৈ করছিল, ওরা এখন গাছের ডাল থেকে ড্রাইভ দিচ্ছে।
হাঁড়ি, জাল নিয়ে মহিলা,পুরুষ ব্যস্ত মাছ, কাঁকড়া ধরতে।
শৈশবের হুটোপুটি : সুন্দরবন
নৌকা আবার এগিয়ে চলেছে কালিতলা ঘাটের
দিকে।নদীর একপাশ সেই হলুদ জালে
মোড়া কোর এড়িয়া।আরেকটা পাশ অনন্ত জলরাশি। জল আর আকাশ মিলেছে দূরে।
ঘাটে বসে একদল জেলে বাগদার মিন বাছাই করছে। মিনপ্রতি পাঁচ পয়সা লাভ।
আমরা মোটর ভ্যানে করে ফিরে এলাম সুভাষদার বাড়ি।
বাইরে প্রবল বৃষ্টি তাই স্নান করে খেয়ে চলল গল্প।আয়লায় সব ভেসে যাওয়ার গল্প।হঠাৎই সেদিন দুপুরের
খাওয়ার পর দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বৌদি দেখতে পেল,কালিন্দী নদী যেন খেতে আসছে।কিছু বোঝার আগেই ভেসে
গেল সব।ওরা সবাই সাঁতরে পাকা রাস্তায় আসে।তখন আর রাস্তা কোথায় শুধুই জল আর জল।শুধু নোনা
জল।একটা নৌকোর মধ্যে জনাদশ।ভিজে কাপড়ে ওই জড়সড় হয়ে তিন দিন।চারিদিকে তখন শুধুই
জল।জঙ্গলের পশুপাখি আর মানুষ সবাই অসহায় তখন প্রকৃতির কাছে।এরপর শুরু হল খাদ্যসংকটের থেকেও
মারাত্মক সংকট পানীয় জলের অভাব।রিলিফ এল অনেক পরে। শুনেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।আর যারা কাটিয়েছে
তাদের বিপন্নতা ছিল কি মারাত্মক। এইসব গল্প হচ্ছে,আমাদের আসরে যোগদান করলেন লক্ষ্মী ঠাকুমা।বয়স
ষাটের আসে পাশে।গ্রামের সবাই ওনাকে ওই নামেই ডাকে।গ্রামের মানুষ খোলা গায়ে শাড়ি জড়ানো।আমার
পাশে বসতেই আমি দেখলাম ঠাকুমার পিঠে এক খাবলা মাংস নেই।
আমি জানতে চাওয়ায় বললেন,"ওই সে বছর গো মেয়ে,যেবার তোমাদের দাদুকে বাঘে খেল,সেবার তো
আমারেও থাবা দিছিল।আমি নদীর ঘাটে বাসন মাজছিলাম আর তোমাদের দাদু জাল গুটাচ্ছিল।চুপিসারে এল
আর নিয়ে গেল।আমি টের পেতেই যেই এগোলাম এক জোর থাবা।সে কি রক্ত!"
সুন্দরবনের গল্পদাদু
আমরা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।এই মর্মান্তিক বাস্তবটা কি সহজে বলে ফেললেন।
সুভাষদার কাছে এমন কত গল্প শুনলাম।ওদের বাড়ি থেকে হাত কয়েক দূরেই প্রাইমারি স্কুলের মাঠে প্রায় দশ
ফুট লম্বা এক রয়্যাল বেঙ্গলকে জালে বন্দি করার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা আছে বন দপ্তরের কর্মীদের সাথে।
শুনে মনে হল যে সামশের নগরের প্রতি ঘরে ঘরেই এক একজন জিমকরবেট বাস করে।
পরদিন আমরা কুড়েখালি নদীতে নৌকা ভ্রমণে বেড়বো।অপেক্ষা করছি জোয়ার আসার।বেলা এগারোটায়
নৌকা এল।
যিনি চালিয়ে নিয়ে এলেন,তার বয়স আটের কোঠায় হবে।নিবারণ মন্ডল।আগে মাছ,কাঁকড়া ধরতে
গভীর জঙ্গলে যেতেন।এখন বাড়িতে জাল তৈরির কাজ করেন।আর নৌকায় ঘুরে ঘুরে যেটুকু কাঁকড়া পান
সেটাই জোগাড় করেন।আজ আমাদের জলভ্রমণ এ নিয়ে যাবেন।এক ফালি ডিঙি নৌকা এক হাঁটু থকথকে
কাঁদা ভেঙে খালি পায়ে এসে বসলাম নৌকার মাঝের পাটাতনে।দাদু হাল চালিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
নদীর জীবন, জঙ্গলের জীবন চোখের সামনে। একবুক জলে দাঁড়িয়ে ওরা কাঁকড়া খুঁজছে।পায়ের নীচে ধারালো
শ্বাসমূল।
হলুদ নাইলনের জাল কেটে ওরা জঙ্গলে ডুকছে।
"দাদু ওরা আইনকে ভয় পায় না?"
"আইন?"ঠোঁটের কোনায় হাসি এনে নিবারণ দাদু যা বলছিলেন তার সারমর্ম হল,যারা জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে
প্রতিদিন বাঘ,সাপ,কুমিরের পরোয়া না করে গভীর জঙ্গলে যাচ্ছে দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে,তাদের
আবার আইনের ভয়।জীবনটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দেখছি জল জঙ্গলে ওরা কতটা বেপরোয়া।
ও দাদু তুমি বাঘ দেখেছো।
" হ্যা গো দু দুবার গভীর জঙ্গলে একেবারে মুখোমুখি। কি করলে?সে শুধু লাঠিকে ভয় পায়।তার সামনে ভয়
পেলে চলবে নি।চোখে চোখ রেখে লাঠি উচিয়ে তেড়ে যেতে হবে।আমার হেতালের লাঠিখান দেখছো
হেইটাই।"
যত দেখছি,যত শুনছি অবাক হচ্ছি।
দাদুর মুখেই শুনছিলাম বনবিবি আর বাঘ দেবতার গল্প।জঙ্গলের দেবি হলেন বনবিবি,তিনি সব প্রাণিকে
বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেন।আর বাঘকেও এরা দেবতা জ্ঞানে পূজা করে।
দাদুর গল্প শুনতে শুনতেই চলছে ছবি তোলা।নীল হঠাৎ বলল,দাদু নৌকাটা একটু জালের কাছাকাছি নিয়ে চল
দেখি কেমন ছবি আসে।জালের ফাঁক ফোকর দিয়ে লেন্স গলিয়ে ছবি তুলেই যাচ্ছে।আমি ততক্ষন দাদুর সাথে
গল্প করছি।জলে ভেসে যাওয়া পেনের মতো দেখতে গরাণ গাছের ফল,গোল গোল কেওড়া ফল।প্রায় আধাঘণ্টা
পর আবার নৌকা ঘুরিয়ে ফিরে এলাম। রাতে এসে ক্যামেরার ছবি দেখছি কি সুন্দর সব ছবি।নদী,ডিঙা
নৌকা,মাছ-কাঁকড়া ধরার ছবি,জঙ্গলের ছবি।দেখতে দেখতে চোখে পড়ল গাছের পাতার ফাঁকে,গাছের মাথায়
কত সুন্দর সুন্দর পাখি। বেনেবৌ,মাছ রাঙা,কাঠঠোকরা, সুদর্শনা।
রোজনামচা
ফেরার দিন সকালে আমাদের সাথে আলাপ করতে এলেন গ্রামের অসিত বিশ্বাস।কথায় কথায় জানতে পারলাম
ভদ্রলোক ভাল গান গাইতে পারেন।আর বাঘ নিয়ে অনেক গান লিখেছেন।শোনালেনও।
সত্যি কত গুনি মানুষ আছেন এই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।দুঃখ করছিলেন গ্রামের উন্নতির স্থবিরতা নিয়ে।এখনো এ
গ্রামে খবরের কাগজ আসে না,পানীয়জল আনতে হয় বহু দূর থেকে,যোগাযোগব্যবস্থা এখনো দুর্বিষহ, ভাল
কলেজে পড়তে হলে ক্যানিং বা সোনারপুর যেতে হয়।
শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। প্রথমদিন হাঁটতে বেড়িয়ে একটা মদের দোকান চোখে পড়েছিল।যে গ্রামে
নূন্যতম পরিষেবাগুলো অমিল,সেখানে এই দোকানের উপস্থিতি কোন প্রগতির সূচনা করছে।
জানা নেই।অনেক সংশয় আর স্বার্থহীন ভালোবাসা নিয়ে এবার ঘরে ফেরার পালা।
সুন্দরী সুন্দরবন




Comments
Post a Comment