বরফ ঘেরা লাচুং
বরফ ঘেরা লাচুং
@Barnali Roy
বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।লাচুং নদী যেন দলা পাকিয়ে পাকিয়ে ফোস ফোস করছে।আমার
ঘরের জানালা থেকে একটু আগেই যে প্রান খোলা নদী দেখেছিলাম,এখন সেই ই
কেমন অবাধ্য হয়ে দিকভ্রান্তের মতো ছুটে চলেছে পাহাড়ের বাঁকে।উত্তর সিকিমের একটা ছোট্ট
গ্রাম লাচুং এসে পৌঁছেছি আজ বিকেল চারটে নাগাদ।ম্যানেজারকে বলে কয়ে নদীর পাশের খোলা
জানালাওয়ালা ঘরটা ম্যানেজ করেছি।চারপাশ বিশাল বিশাল পাহাড়ে ঘেরা।প্রতিটা পাহাড়েরই যেন বরফের
চাদর মুড়ে শীত ঘুম দিচ্ছে। কি অদ্ভুত লাগছে দেখে।কোনোটা ধ্যানমগ্ন কোনো ঋষি, কোনোটা ঘুমন্ত কুম্ভকর্ণ,কোনোটা আবার যুবতী মেয়ে।
সিকিমের চার জেলার মধ্যে উত্তর সিকিম আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় এবং জনসংখ্যার দিক থেকে ছোট। সাধারণত ভুটিয়া, লেপ্চা, তিব্বতীদের বসবাস। হিমালয় পর্বতমালার অবর্ণনীয় ও নাটকীয় দৃশ্য দেখার
জন্য উত্তর সিকিমের তুলনা হয় না। অনেক উচ্চতায়, অনেক লেক আর হাজার ঝর্নার একত্র বাস। ধন্যবাদ জানাতে হয় বিআরও মানে বর্ডার রোড অর্গানাইজেশনকে। এই বিআরও-র কল্যাণে অনেক দুর্গম এলাকায় যেতে পারছি। পর্বতের পর পর্বত, ছোট থেকে শুরু করে অনেক বড় ঝর্না পেরিয়ে আমরা চলছি। চারশ,পাঁচশ ফুট উপর থেকে খাড়া নিচের দিকে নেমে আসা ঝর্নার জল পাথরে আছড়ে পড়ে মুহূর্তে ফেনায়িত মেঘ তৈরি করে। একটু রোদ পড়লেই দেখা যায় রংধনুর জেগে ওঠা ।
প্রায় প্রতিটি মাইলস্টোনের পাশে সুন্দর কিছু তথ্য বা নির্দেশিকা দেয়া থাকে। ‘If married divorce speed,This
is highway not runway'এর মত মজাদার সব উক্তি।দু একটি চেকপোস্টে পরবর্তী গন্তব্যের সে দিনের তথ্য দেয়া থাকে, রাস্তা বরফে ঢাকা কিনা বা ল্যান্ড স্লাইড হয়েছে কিনা ইত্যাদি।উত্তর সিকিমের দুটো উপত্যকা ও দুটো
নদীর সংযোগস্থলে চুংথাং। লেচাংচু নদী ও লাচেনচু নদী মিলে এর নাম হয়েছে তিস্তা। ইন্ডিয়া আর্মির বড় একটা বেস ক্যাম্পও এখানে
আমরা যে লাচুং গ্রামে আছি তার উচ্চতা ৯৬০০ ফুট।লাচুং শব্দের অর্থ ছোট পর্বত। লাচুং এক সময় তিব্বতের অংশ ছিল। ১৯৫০ সালে অধিকৃত হওয়ার আগে ছিল তিব্বত ও সিকিমের বাণিজ্য পরিচালনার কেন্দ্র। পরে বন্ধ
হয়ে যায়। সম্প্রতি ভারত সরকার লাচুং টুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ায় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভাল। এখানে প্রতিটি পর্বতচূড়া বরফে ঢাকা থাকে সবসময়। শীতকালে পুরো শহরটাই। ব্রিটিশ পর্যটক জোসেফ ডালটন হুকার লাচুং সম্পর্কে তার বিখ্যাত দি হিমালয়ান জার্নাল-এ লিখেছিলেন, ‘Most picturesque village of Sikkim।’ আসলেই ছবির মত। গ্রামটায় ঢোকবার মুখেই লাল রং এর একটা তোরন আছে। এতে ইংরাজিতে লেখা আছে 'welcome to Lachung'।সিকিমের রাস্তায় এইধরনের তোড়ন প্রায়শই দেখা যায়।বেশীরভাগই লালের উপর তিব্বতি নক্সা খোদাই করা।রাস্তার দুপাশে দেখলাম সারি সারি
রোডোডেন্ড্রন গাছ। এরা বলে গুরাস।এই সময় উত্তর জুড়ে গুরাসের ছড়াছড়ি। লাল,গোলাপি, রানি, বেগুনী কতরকম রং।ব্যাগ রেখেই লবেড়িয়ে পড়েছি।সরু কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছি।হঠাৎ দেখি একটা নুড়ি পথ এঁকেবেঁকে নীচের দিকে নেমে গেছে।আমিও এগোতে এগোতে দেখি পৌঁছে গেছি লাচুংনদীর
পারে।লাচুং আর লাচেন নদী হল তিস্তার উপনদী।লাচুং এই তিস্তা আর লাচুং মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।যেন একটা বাঙালী মেয়ের আর ভুটিয়া ছেলে উচ্ছল প্রেমের গল্প।উত্তরবঙ্গে এলেই বরাবর তিস্তাকে দূর থেকে দেখি গাড়ির পাশেপাশে যেতে।।এই প্রথম এত কাছ থেকে। সবুজ তিস্তা ছোট বড় নুড়ি পাথর পেরিয়ে প্রাণখোলা ভঙ্গীতে এগিয়ে চলেছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। তিস্তা পারের লম্বা লম্বা সারি সারি এক ধরনের গাছ দেখলাম, যার পাতাগুলোই এত সুন্দর যে, যেকোন ফুল কে হার মানিয়ে দিতে পারে।কালো কালো গাছআর
তার হাল্কা সবুজাভ ঝিরঝির বাঁকা পাতা।নদীর জল পাথরের গা বেয়ে ছলাৎছলাৎ করে এগিয়ে চলেছে। খুব মেঘ করেছে।আকাশ কালো করে দু এক ফোঁটা বৃষ্টি ও পড়ছে।আমি তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।
কাল খুব ভোরে বেড়িয়ে দেখতে যাব জিরো পয়েন্ট আর ইয়ুমথাম ভ্যালি।যত রাত বাড়ছে তত মেঘের গর্জন বাড়ছে আর তার সাথে সাথে বৃষ্টি। রাতে খাবার টেবিলে আমাদের ড্রাইভার দাদা বলল এত বৃষ্টি থাকলে কাল যাওয়া যাবে না।আমাদের মন খুব খারাপ হয়ে গেল।সব ভাগ্যের হাতে সব ছেড়ে রুটি,চিকেন আর স্কোয়াশের সব্জিতে মন নিবেশ করলাম।একে প্রত্যন্ত গ্রাম,প্রবল বৃষ্টি, কারেন্ট অফ তাও হোটেলের কর্মচারীরা আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেবা যত্নের।
পরদিন ভোর পাঁচটা নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল।জানালার পর্দা উঠিয়ে দেখলাম ঝকঝকে আকাশ।পর্দা উঠিয়ে জানালা হাট করে খুলে দিতেই একটা কনকনে বরফ ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভিতর উড়ে এল।নদী রাতভর গর্জনের পর এখন শান্ত।জানালা দিয়ে দূরের পাহাড়ে বুদ্ধের মন্ত্র লেখা সাদা সাদা পতাকা দেখা যাচ্ছে।
আত্মার শান্তির জন্য সারিসারি পতাকা লাগানো।লম্বা লেজওয়ালা একটা সুন্দর নীল হলুদ পাখি সামনের একটা নেড়া ডালে সেই তখন থেকে বসে আছে।এখানে অনেক হিল ময়না দেখেছি কাল থেকে এসে।দূর থেকে লাচুং মনেস্ট্রি থেকে ভেসে আসছে থাংকা র আওয়াজ। মেঘ আর কুয়াশার বুক চিরে একটা গুম গুম শব্দ। দরজায় টোকা।ড্রাইভার দা জলদি রেডি হতে বলছেন।কনকনে যা ঠান্ডা তার কাছে গিজারের গরম জল কিছুই নয়।যা হোক করে রেডি হয়ে গাড়িতে চেপে বসেছি।সাথে করে আমাদের জন্য নেওয়া হয়েছে বরফে হাঁটার জুতো, আর রাবারের হাত মোজা।
পাহাড়ের পাকদণ্ডী পেরিয়ে আমাদের গাড়িটা ধাপে ধাপে উঠে যাচ্ছে।নীচের গ্রামগুলো ধীরে ধীরে গুটি পোকারমতো ছোট হয়ে যাচ্ছে।রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ।জায়গায় জায়গায় ধস নেমেছে।রাস্তার উপর পাথরের চাঁই
এমন ভাবে পরেছে যে গাড়িগুলিকে এক হাত চওড়া সরু ফালি জায়গা দিয়ে পার হতে হচ্ছে।এক একটা গাড়ি
পার হতে অনেক সময় লাগছে।কিছু দূর এগিয়েই দেখলাম সবে রাস্তা পরিষ্কার হল।শুনতে পেলাম কিছুক্ষণ
আগেই একটা বোলেরো কয়েক সেকেন্ডর জন্য বেঁচে গেছে।চলন্ত গাড়ির থেকে হাত দুই দূরে উপর থেকে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল একটা বিশাল পাথর। ওরা বেঁচে গেছে।আমরা শুধু শুনেছি।মৃত্যুকে এত কাছ থেকেদেখা হয়নি।রুদ্ধতার প্রায় ঘন্টা তিন গাড়ি চলার পর যেন এক স্বপ্নের সাম্রাজ্যে এসে পৌঁছেছি।চারিধারে শুধুবরফ আর বরফ।প্রথম দিকটা কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছিল।চকোবার আইসক্রিমের মতো এক একটা পাহাড়।দুধ সাদা কোনোটা।কেউ যেন রুপালী তবক এঁটে দিয়েছে ওদের গায়ে।দূরের পাহাড়গুলো এত চকচক করছে যেন মনে হচ্ছে আকাশের বুকে মাথা ঠেকিয়ে সূর্যের কাছে চলে গেছে ওরা দল বেধে।
গাড়ি এসে থেমেছে
'জিরো-পয়েন্টে'।
এরনাম ইয়ুমসামডং(১৫০০০ফিট প্রায়)।কিন্তু সবাই জিরো পয়েন্ট নামেই ডাকে।নামার আগে
জুতো, হাত মোজা পড়ে নিলাম।সামনেই সুবিস্তীর্ণ সাদা চাদর বিছানো।বরফের উপত্যকা।গুটিকয় চা আর ম্যাগি
র দোকান। একটা বড় গ্লাসের চা ঠান্ডা হতে কয়েক সেকেন্ড লাগছে।এর পর ধু ধু বরফ।কোনোদিকে যাবার রাস্তা
নেই।এবার আমরা প্রায় যুদ্ধং দেহি মনোভাবে যেন কোনো খাজানা লুটের অভিপ্রায়ে লাফিয়ে পড়লাম বরফের
চাদরে।হুটোপুটি,লুটোপুটি করে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলে,বরফ ছোড়াছুড়ি করেও যেন শেষ হচ্ছে না।যতদূর
দেখা যায় চাই চাই উঁচু বরফের পাহাড়।ওপাশেই চিনের বর্ডার।আসার পথেই মিলিটারি বাঙ্কার দেখে এসেছি।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে বরফের চাই কোথাও কোথাও গলতে শুরু করছে।অর্ধেক চাঁদের মতো ভেঙে তা থেকে
কাঁচের টুকরোর মতো বিন্দু বিন্দু করে জল হয়ে নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে।প্রায় আধঘন্টা কাটানোর পর আর ঠান্ডায়
পারা যাচ্ছে না।শ্বাস কষ্ট হচ্ছে একটু একটু।গাড়িতে ফের উঠে বসলাম যাব' ইয়ুমথাম ভ্যালি 'র "সিংবা
রডডেনড্রন সাংচুয়া রী"। ইয়ুমথামের উচ্চতা প্রায় ১২০০০ ফিট প্রায়।
পাকদণ্ডী পেরিয়ে বরফ,রুক্ষ,ধূসরতা পেরিয়ে আবার ফুলের রাজ্যের দিকে গাড়ি যাচ্ছে।ইয়ুমথাম কে সিকিমেরভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস বলে।মাইলের পর মাইল ফুল গাছের সারি। কেউ লাগায় নি।যত্ন ও নেয় না কেউ,তবুও গোটা মার্চ এপ্রিল মাস জুড়ে চলে ফুলের উৎসব। কত রঙের রডোডেন্ড্রন।লাল,গোলাপি, বেগুনি, রানি,হলুদ।এছাড়াও বেগুনি, হলুদ থোকা থোকা প্রিমুলাস, পপি,আরো কতধরনের নাম না জানা ফুল পুরো ইয়ুমথাম ভ্যালি জুড়ে ছেয়ে আছে।ঠিক মনে হচ্ছে ফ্যান্সিড্রেস কম্পিটিশন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রতিবছর রোডোডেন্ড্রন উৎসব হয়।ছোট বড় ফুল গাছ আর গাছ ভর্তি ফুলের ডালি।পাথুরে রাস্তার বুকে যেন কেউ ফুলের পাঁপড়ি বিছিয়ে দিয়েছে।যেন কোন মহৎসব।বিস্তৃর্ণ উপত্যকা জুড়ে ফুলের সাজি।আর তার মাঝেই অবাধে ঘুরেবেড়াচ্ছে লম্বা লেজওয়ালা চমড়ি গাইয়ের দল।আর এখানে আছে লাচুং নদী।বরফ ঠান্ডা জলের বুকে বড় বড় নুড়ি পাথরের ছড়াছড়ি। সবুজ স্বচ্ছ কাঁচের মত জল।আর চারপাশ জুড়ে পাইন দেবদারু গাছের আড়াল ঘেঁষে দেখতে পাচ্ছি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল বরফের পাহাড়।পাউহুনরি ,শুন্ধু, সেনপা নামের পাহাড় গুলো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে।এখানে অতো ঠান্ডা নেই।কিন্ত জোড় হাওয়া দিচ্ছে।
এমন শান্ত নিরিবিলি
পাহাড়ের কোলে নদীর ধারে বসে সমস্ত যন্ত্রণা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যায়।আজ প্রকৃতি সারাদিন বেশ সঙ্গ দিল।
এবার ড্রাইভার দাদা খুব জোর হর্ন বাজাচ্ছে।
'চলিয়ে ম্যাডাম বারিষ আ রাহা হ্যায়।'
'কি করে বুঝলে আকাশ তো পরিষ্কার।'
'নেহি বারিষ কা বু আতা হ্যায় হাম লোগো কো।'
কি আশ্চর্য বৃষ্টি আসার আগেই বৃষ্টি র গন্ধ।কই আমি তো পাই না।সেই জন্যই ওরা প্রকৃতির বরপুত্র।আমি নই।
Comments
Post a Comment