চোখ জুড়িয়ে যাওয়া শাল-পলাশের হাওয়া

            শাল-পলাশের গ্রাম  

   @Barnali Roy


টেনিদার মতো এবার আমরাও চলেছি ঝন্টিপাহাড়ির দেশে।
প্রতি রবিবারের মতো সেদিন বিকালের আড্ডায় ঠিক হল সামনের সপ্তাহান্তের ছুটিতে আমরা যাব অযোধ্যা পাহাড়। 
সোনালি  তো সে কথা শুনে খেপে লাল।বলে কিনা আর কতবার অযোধ্যা যাবে,রাম ও মনে হয়,এতবার
যায় নি।
সে অবশ্য ঠিক বলেছে সোনালি।  নয় নয় করে বার তিন আমারা গেছি অযোধ্যা পাহাড় । অতএব অযোধ্যা বাতিল।
কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে আমাদের দলের অর্ক  হঠাৎ বড়ন্তির নাম প্রস্তাব
করলো।আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম সেটা আবার কোথায়?
পুরুলিয়া জেলার সাঁলতোড় ব্লকের অর্ন্তগত রামচন্দ্রপুর সেচ প্রকল্পের জন্য প্রায় ২কিলোমিটার 
বিস্তৃত একটা জলাধার তৈরি করা হয়েছে বড়ন্তি গ্রামে।বড়ন্তি পাহাড় আর মুরাডি পাহাড়ের মধ্যবর্তি
স্থানে অবস্থিত ছোট একটা গ্রাম বড়ন্তি।
পাঁচ জন দল বেঁধে হাজির হয়েছি  হাওড়া স্টেশনে নির্ধারিত দিনে।সারাদিন অফিস,স্কুল ঠেঙিয়ে রাতের
 হাওড়া-আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার। পরদিন ভোর ৫টাতে আদ্রা পৌঁছানোর কথা।
অন্তু হঠাৎ গাড়িটার হাল হিসেব দেখে ভবিষ্যৎবানী করে বসলো,কাল দুপুরের আগে আমরা পৌঁছাতে পারবো 
না।সেই শুনে অর্ক  তো ক্ষেপে লাল।এবার টিম ম্যানেজার অর্ক।যাবতীয় দায়িত্ব ওর ঘাড়ে।
ঝগড়া থামাতে আমাকে ফিল্ডে নামতে হল অবশেষে।বাজি হল যে হারবে কাল সকালের নাস্তা তার পকেট 
থেকে।

বাড়ি থেকে সবাই রাতের খাওয়া সেরে এসেছি, অতএব চটপট চাদর টেনে ঘুম।সারাদিনের ক্লান্তি শেষে নিশ্চিন্ত 
নিদ্রা।
ঘুম ভাঙলো,পড়ে গেলুম, পড়ে গেলুম চিৎকারে।আমি ছিলাম মিডিল বাঙ্কে ধড়ফড় করে উঠে বসে
দেখি,আপার বাঙ্ক থাকে অন্তু ঘুমের ঘোরে চেঁচাচ্ছে। অন্যদিকের আপারে ছিলেন এক বিহারী ভদ্রলোক।
দেখলাম তিনিও উঠে বসেছেন।কান্ড দেখে বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন,"এ লেড়কা ক্যায়া পাগল
কি তরহা বকবকা রহে হো,খামোশ।"
সব ঠাণ্ডা। 
কিন্তু আমার আর ঘুম এল না।ঘড়িতে দেখলাম  ভোর ৪.১০।বাঙ্ক থেকে নেমে নিচের সিটে
বসলাম।দেখলাম  ঝন্টিপাহাড়ি স্টেশন টা গেল।টেনিদা,ভ্যাবলা, হাবুলদের কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছে
গেছি আদ্রা জংশন টেরই পাইনি। 
না গাড়ি একদম রাইট টাইম। এখান থেকে মুরাডি যাবার ট্রেন আধঘণ্টা বাদে। তাই আমরা আদ্রা স্টেশনেই
চা-নাস্তা সেরে নিলাম। অন্তু বেচারা কাছুমাচু মুখে টাকা মেটালো।
আদ্রা স্টেশনটা বেশ বড়,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্ম। বাঁকুড়া থেকে একটা মেমু লোকাল এল।এটা
আসানসোল যাবে।আমরা নেমে যাবো মুরাডিতে।আদ্রা থেকে কয়েকটা স্টেশন। মাত্র ২২কিলোমিটার 
রাস্তা।
এখানকার ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতাটা একটু অন্যরকম।সব ট্রেন রুটেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে।এখানে
যেসব প্যাসেঞ্জাররা সফর করছে বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষ। ছেলেদের পড়নে লুঙ্গী, গামছা, ধুতি,কারোর
কারোর পড়নে প্যান্ট-জামা,যদিও সে সংখ্যাটা খুবই কম।মেয়েরা সকলেই শাড়ি পড়েছে কিন্ত
পড়ার ধরনটা আলাদা।হাটুর ওপর তুলে কোমড়ে আবার আলাদাভাবে একটা কাপড় বাঁধা প্রায় সকলের
সাথেই আছে ঝুঁড়ি,দাঁ,কোদাল, কাস্তে,আবার অন্যান্য যন্ত্রপাতি। ট্রেনটা বেশ ভিড় ছিল।ভয় হচ্ছিল এতগুলো
লোক ঠিকঠাক নামতে পারবো তো।মুরাডি আসতে দেখলাম আমাদের স্থানীয় সহযাত্রীরা কি
সুন্দর সহযোগিতা করে নামিয়ে দিল আমাদের ।ট্রেনে উঠেই প্রথমে মনে হয়েছিল যাদের সাথে ছোঁয়া লাগলে
আমাদের  গায়েও মাটি লেগে যাবে,তাদেরই আন্তরিকতাকে গায়ে মেখে আমরা মুরাডিতে নেমে
পড়লাম।
মুরাডি একটা ছোট্ট স্টেশন। স্টেশন লাগোয়া বাজার।মুরাডি থেকে বড়ন্তি ৬কিলোমিটার রাস্তা।
একটা গাড়ি বলা হয়েছিল,দেখলাম স্টেশনের বাইরে সেটা হাজির।কিন্তু ওখানে যাবার আগে
আমাদের দুপুরের খাবার জন্য বাজার করে নিয়ে যেতে হবে। বড়ন্তিতে যে বাগানবাড়ি তে আমাদের
থাকার ব্যবস্থা সেখান থেকে এমনই বলা হয়েছে।যদিও ওরাও সব ব্যবস্থা করে দেয়,তবু আমরা
নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নিজেরাই দায় নিয়েছি।
নিপাট এক গ্রাম্য বাজার। কোনা প্রাচুর্য নেই।আগের রাতে মনে হয় হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে।কাদা
প্যাঁচ প্যাঁচে রাস্তাঘাট। ওর মধ্যেই মহানন্দে আমরা মুরগির মাংস, আর টুকটাক সব্জি কিনে গাড়ি করে
রওনা দিলাম।বাজারের দায়িত্ব বরাবরের মতো সোনালী আর পিকলুর।গাড়িতে উঠে ওরা অর্ক কে
হিসেব বোঝাতে লাগলো।আমি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়েছি খোলা হাওয়ার জন্য।
কাঁদা মাখা কাঁচা রাস্তা,মাটির বাড়ি, অলি-গলি,বাঁশঝাড় ছোটখাটো ঝোপঝাড় পেড়িয়ে মেঠো পথের
বাঁকে  বড়ন্তি ড্যাম। ড্যামের পাশ ঘেঁষে লাল মাটির রাস্তা ধরে আমরা পৌঁছে গেলাম গ্রামে।
ছবির মতন গ্রাম।মাটির বাড়ি, খড়ের চালা,নিকানো উঠোন,মাটির দাওয়ায় শুকাতে দেওয়া আচার, বড়ি, লাঙল, 
চাষাবাদের সরঞ্জাম,পুকুরঘাট,চাপাকল,আর আছে রাঢ় বাংলার ঐতিহ্য দেওয়ালচিত্র।ঠিক যেন ছোট
বেলার ড্রইং খাতায় আঁকা গ্রাম।
আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে একটা ছোট্ট বাগানবাড়িতে।যাবতীয় ব্যাবস্থা অর্ক কোলকাতা
থেকে করেই এসেছে।বাড়িটার নামটা ভারি সুন্দর 'মন পলাশ'।বাড়ির কেয়ারটেকার  শম্ভু আর
ওর স্ত্রী চাঁপা।দুটো  কটেজ।একটা চারজনের আর একটা দুজনের।তবে দেখলাম আরও দুজন অনায়াসে থাকতে পারবে।


কটেজের চারিপাশে প্রচুর গাছ-গাছালি। শম্ভুর কাছে জানতে চাইলে সে বলল বেশিরভাগটা পলাশ গাছ।
এছাড়াও আছে শাল,শিমূল, পিয়াল। মার্চ মাসে নাকি সারাটা গ্রামে আগুন জ্বলে।পলাশ ফুলের লাল রঙে
ঝলসে ওঠে বড়ন্তির প্রকৃতি। 
এই বাড়িটার আশেপাশে ও আরো কয়েকটা থাকার জায়গা আছে।কি সুন্দর সুন্দর নাম।পলাশ বাড়ি,আরণ্যক,
মানভূম আরো কত কি।মোট কথা সব কিছুতেই একটা বন্য ছোঁয়া আছে।সরু সরু মাটির রাস্তার দুধারে শুধুই 
পলাশ গাছের জঙ্গল। ইচ্ছে হল আরো একবার পলাশের আগুন দেখতে আসবো। 
কটেজ দুটোর সামনেই বসার জায়গা। কেয়ারি করা ফুলের বাগান।চাঁপা বলল,পাশের ওই জঙ্গলটা না থাকলেই
ড্যাম টা দেখা যেত পরিষ্কার ।আমি বললাম,'তাহলে তোমরা গাছ কেটে পরিষ্কার করো না
কেন?'চাঁপা জিভ বার করে বলল,'পাপ হবে কিনা,পাপ দিবে। '
সত্যিই নিজেকে কেমন অপরাধি মনে হল,এক গ্রাম্য অশিক্ষিত বউয়ের প্রকৃতি কে ঈশ্বর জ্ঞানে পূজা করায়।
গরম গরম ভাত,মুরগীর মাংস, মুসুরির ডাল আর ঝিরিঝিরি আলুভাজা। দারুন রান্নার হাত চাঁপার।কতোইবা
বয়স বড়োজোর ষোল-সতেরো। ওর একটা ছেলে আছে তিন বছরের।ওদের মধ্যে মেয়ের বয়স বারো
কি তেরো হলেই বিয়ে দিতে হয়,নইলেই গ্রাম ছাড়া।
অন্ত হঠাৎ পেটে হাত বুলাতে বুলাতে পিকলুকে বলছে শুনলাম, খাওয়াটা বড্ড বেশি হয়েছে বুঝলি,একটু
হেঁটে আসি চল।
আমি বললাম চল সবাই যাই।
গ্রামে আজ কি একটা পরব আছে।গান বাজছে খুব।আর বাড়ির মেয়ে বউরা খড়ি মাটি,সবুজ পাতা,বুনো ফল,
ইত্যাদি পেশাই করে রং বার করছে।সেই রং দিয়ে বাড়ির মাটির দেয়াওয়ালের গায়ে চলেছে ছবি আঁকা।
চাঁপাকেও দেখলাম  ছবি আঁকতে। জানতে চাইলে ও বলল আজ 'গরু খুঁটা' আছে। 
আসলে উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ সেই প্রাচীন কাল থেকেই প্রকৃতির, ও তার সম্পদের পূজা করে চলেছে।


বুঝলাম আজ গো-পূজা।দেয়াওয়ালের গাঁয়ে দেখলাম ওরা এঁকেছে মোরগ ঝাড়,পদ্মফুল,ধানের
শিস,আরো অনেকরকমের ছবি।
এসব দেখতে দেখতে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি ড্যামের ধারে।প্রায় ২কিলোমিটার বিস্তৃত টিলা-পাহাড়ে
ঘেরা স্বচ্ছ নীল জল।পাশ দিয়ে চলে গেছে লাল মাটির রাস্তা।অন্যদিকে সবুজ প্রকৃতি। পাহাড়গুলোর
চূড়াগুলো তীক্ষ্ণ বা সূচালো নয়,অনেকটা অর্ধ চন্দ্রের মতো। 
খুব রুক্ষপ্রকৃতি এখানে।চরমভাবাপন্ন আবাহাওয়া,রুক্ষমাটি রাঢ়বঙ্গের বৈশিষ্ট্য,তার মাঝে এই জলাধার 
এখানকার মানুষকে বেঁচে থাকার শক্তি দিয়েছে।একটু আধটু ফসল ফলছে। 
পিকলু,অর্ক,আর অন্ত সামনের পাহাড়টায় ওঠার চেষ্টা করতে লাগল।আমি আর সোনালি ড্যামে বাঁধানো
পাড়ে বসে ওদের কাণ্ডকারখানা দেখছি।অনেক্ষন চেষ্টার পর ব্যার্থ হয়ে ওরা তিনজন ফিরে এল।আসলে পাহাড়
নুড়ি পাথরে ভর্তি,তাই পা স্লিপ খাচ্ছে।আর তাছাড়া উচ্চতা বেশি না হলেও পাহাড়গুলো বেশ খাড়া।
সূর্যের তেজটা কমে এসেছে।আলোটা তেড়ছা ভাবে জলের উপর পড়ছে।মনে হচ্ছে যেন হিরের মতো ঝলমল
করছে জল টা।
সন্ধ্যে নামার আগেই ফিরতে হবে 'মন পলাশে'।ফেরার পথে দেখলাম অনেক মানুষ আসে পাশের গ্রাম
থেকে নিজেদের গরু নিয়ে বড়ন্তির দিকে যাচ্ছে।আর অদ্ভুত একটা বিষয় চোখে পড়লো, গরুগুলো কে
খুব করে সাজানো হয়েছে।কপালে সিঁদুরের তিলক আঁকা,গলায় গাঁদা ফুলের মালা, চার পায়ে
ঘুঙুর বাঁধা,শিং এও মালা দিয়ে সাজানো। 
গ্রামে ঢুকতেই দেখলাম খুব হইহই।পূজা শুরু হয়েছে।আমরা পাঁচ জন ও সামিল হলাম শম্ভু-চাঁপাদের
আড়ম্বর -আতিশয্যবর্জিত লোকাচারে।যেখানে আন্তরিকতা আর আস্থাই একমাত্র সম্বল।সহায় সম্বল,শিক্ষা,স্বাস্থ্য
কিছুই এদের নাগালে নেই,এমন কি প্রকৃতির রুক্ষতার সাথেও চলে নিয়ত লড়াই,তবু তারই মাঝে ওরা বেঁচে থাকে
এইসব সামাজিক লোকাচার নিয়ে,আস্থা নিয়ে।
কটেজে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়েগেছিল।সেদিন ফিরে আর কিছু খেতে হয় নি।শম্ভুদের পাড়ার
পূজোয় শাল পাতায় করে খাওয়া অতি সাধারণ খিচুড়িও যে সেদিন আমার মতো অতিবড় নাস্তিকের
কাছেও কেন মহার্ঘ্য মনে হয়েছিল,তার উত্তর  এখনো আমার জানা নেই।
যাওয়ার পথ:-----
কলকাতা বড়ন্তির দূরত্ব ২৬৩ কিলো মিটার। 
১.হাওড়া/কলকাতা থেকে আসানসোলগামী যেকোনো ট্রেনে আসানসোল। সেখান থেকে পুরুলিয়াগামী লোকল
ট্রেনে মুরাডি স্টেশন। গাড়ি করে বড়ন্তি।আসানসোল থেকে মুরাডির দূরত্ব ১৯ কিমি।
আসানসোল যাবার জন্য কিছু ভাল ট্রেন....
1. Black Diamond Express/13317 (D-06:15; A-09.38)
2. Howrah Dhanbad AC Exp/12385 (D-08:30; A-11:11)
3. Howrah-Ranchi Shatabdi Express/12019 (D-06.05; A-08.22)
4. Sealdah-Asansol InterCity Express/13503 (D-16.40; A-20:55)
5. Agniveena Express/12341 (D-18:20; A-21:35)

২.হাওড়া/কলকাতা থেকে আদ্রা যেকোনো ট্রেনে। সেখান থেকে আসানসোলগামী ট্রেনে মুরাডি স্টেশন। গাড়ি 
করে বড়ন্তি।আদ্রা থেকে মুরাডির দূরত্ব ২২কিমি।
আদ্রা যাবার কিছু ট্রেন.....
1. Rupashi Bangla Express/12883 (D-06:00; A-10:51)
2. Aranyak Express/12885 (D-7:45; A-12:21)
3. Howrah-Adra Shiromoni Fast Passenger/58015 (D-17:45; A-23:20)
4. Howrah Purulia Express/12827 (D-16:50; A-21:25)
5. Howrah-Chakaradharpur Passenger/58011 (D-23:05; A-05:15)
কলকাতা থেকে দূর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে আসানসোল হয়ে দিশেরগড় ব্রিজ কোতালদি গ্রাম হয়ে 
রামচন্দ্রপুর,মুরাডি হয়েও বড়ন্তি পৌঁছানো যায়।
মুরাডি স্টেশন থেকে বড়ন্তির দূরত্ব ৬কিমি।










Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

Barshajapan e Chilapata Mendabari r Jangol

Silary Gaon

Ochena Purulia r anache kanache