Sagardeep.....Gangasagar
সব তীর্থ একবার গঙ্গাসাগর বারবার
@Barnali Roy
গঙ্গাসাগর নিয়ে প্রচলিত আছে এক বিখ্যাত প্রবচন: ‘‘সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।’’ কথাটার যথার্থ ব্যাখ্যা মেলে ‘খনার বচনে’। খনা বলেছেন, ‘‘সারা বছর যাঁরা শয়ন একাদশী, ভৈমী একাদশী, উত্থান একাদশী, পার্শ্ব একাদশী, জন্মাষ্টমী, রামনবমী, শিব চতুর্দশী বা দুর্গার মহাষ্টমীর মতো শাস্ত্রীয় আচারের একটিও পালন করতে পারবেন না, তাঁরা যদি পৌষ সংক্রান্তির দিন শুধু একবার সাগরসঙ্গমে স্নান করেন, তা হলে সর্বতীর্থের পুণ্য অর্জন করবেন।’’
অমোঘ আকর্ষণে প্রতি বছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এবং সাধুসন্ত তীর্থ ও মুক্তির আশায় গঙ্গাসাগরে ছুটে আসেন, এমনকী বিদেশ থেকেও। সাগরদ্বীপ পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। সেই সঙ্গে বিস্তীর্ণ বেলাভূমি জুড়ে বসে নানা পণ্য পসারের এক বিশাল মেলা। শস্ত্রীয় স্নানপর্ব একদিনের হলেও গঙ্গাসাগর মেলা চলে পক্ষকাল।
কপিল মুনির মন্দির
শীতের হিমেল হাওয়ায় বালিয়াড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গমে সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে পুণ্যার্থীরা আদিগন্ত জলসীমায় পৌঁছে যান। সাধারণ তীর্থযাত্রীদের কাছে সাগরমেলার প্রধান আকর্ষণ নাগা সন্ন্যাসী আর হিমালয়ের সাধুসন্ত। কিন্তু ইদানীং বড়মাপের যোগী মহাত্মাদের বড় একটা দেখা যায় না। তবু কিছু ভবঘুরে হটযোগী মাধুকরী বৃত্তিধারী সাধু এবং গৈরিকবসনধারী পরিব্রাজক সাগরমেলা জমিয়ে তোলেন। বিচিত্র কামনাবাসনা নিয়েও একদল মানুষ আসেন, যাঁরা স্নানান্তে প্রার্থনা জানিয়ে সন্তানের স্বাস্থ্য ও অর্থের জন্য মানত করেন।
গঙ্গা নদীর মর্ত্যে প্রত্যাবর্তন ও সাগর রাজার পুত্রদের জীবন বিসর্জনের লোকগাঁথাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই বিখ্যাত তীর্থস্থান গঙ্গাসাগর।কিংবদন্তি আছে, এখানে সাংখ্যদর্শনের আদি-প্রবক্তা কপিলমুনির আশ্রম ছিল। বৈদিক ঋষি কপিল ।হিন্দু ধর্মগ্রন্থে তাঁকে মনুর বংশধর বলা হয়েছে।কপিল ছিলেন একজন বৈদিক ঋষি। তাঁকে সাংখ্য দর্শনের অন্যতম প্রবর্তক মনে করা হয়।ভাগবত পুরাণে তাঁর সাংখ্য দর্শনের আস্তিক্যবাদী ধারাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি ব্রহ্মার পৌত্র মনুর বংশধর।ভগবদ্গীতায় কপিলকে সিদ্ধযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় কপিলের উল্লেখ করেছেন:⇁
“ বৃক্ষের মধ্যে আমি বট, ঋষিগণের মধ্যে আমি দেবর্ষি নারদ, গন্ধর্বগণের মধ্যে আমি চিত্ররথ ও সিদ্ধগণের মধ্যে আমি কপিল। (১০। ২৬) "
একদা কপিলমুনির ক্রোধাগ্নিতে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র ভস্মীভূত হন এবং তাঁদের আত্মা নরকে নিক্ষিপ্ত হয়। সগরের পৌত্র ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে এসে সগরপুত্রদের ভস্মাবশেষ ধুয়ে ফেলেন এবং তাঁদের আত্মাকে মুক্ত করে দেন (রামায়ণ, বালকাণ্ড, ৪৩ অধ্যায়)। মহাভারতের বনপর্বে তীর্থযাত্রা অংশে গঙ্গাসাগর তীর্থের কথা বলা হয়েছে। পালবংশের রাজা দেবপালের একটি লিপিতে তাঁর গঙ্গাসাগর-সঙ্গমে ধর্মানুষ্ঠান করার কথা বলা হয়েছে। ইতিহাস আর জনশ্রুতিতেই নয়,মৎস্য, বায়ু এবং পদ্মপুরাণ শাস্ত্রেরও সাগরতীর্থ সম্পর্কে নানা কথা আছে। কালিদাসের ‘রঘুবংশ’ এবং মধ্যযুগের কয়েকটি মঙ্গলকাব্যেও ছড়িয়ে আছে গঙ্গাসাগর প্রসঙ্গ। ‘মহাভারতে’-এর বনপর্বে দেখা যায়, স্বয়ং যুধিষ্ঠির সাগরসঙ্গমে এসেছিলেন। মেগাস্থিনিস, হিউয়েন সাঙের বিবরণেও গঙ্গাসাগর স্থান পেয়েছে।
সাগরদ্বীপ-- বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবনাঞ্চলের এই দ্বীপটিরই পৌরাণিক নাম শ্বেতদ্বীপ বা মতান্বরে জম্বুদ্বীপ । এরই দক্ষিণাংশে গঙ্গা যেখানে সাগরের সঙ্গে মিলেছে, সেই স্থানটি গঙ্গাসাগর নামে খ্যাত। প্রত্যেক বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি মকরসংক্রান্তি বা পৌষ-সংক্রান্তির পূণ্যতীথিতে লাখো লাখো লোকের সমাগম ঘটে এই সঙ্গমে। এই সমাগমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিরাট মেলা যার নাম গঙ্গাসাগর-মেলা।যুগ যুগ ধরে সাধুসন্ত ও মোক্ষকামী মানুষের এত ভিড় এই মেলা ও পূণ্য তিথিকে কেন্দ্র করে। গঙ্গাসাগর মেলা দ্বিতীয় বৃহত্তম হিন্দু মেলা (কুম্ভমেলার পরে)।প্রতিবছর মকর সংক্রান্তির দিন এখানে বহু লোক তীর্থস্নান করতে আসেন; তবে বিহার-উত্তরপ্রদেশ থেকে আগত অবাঙালি পুণ্যার্থীদের ভিড়ই হয় সর্বাধিক।প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে এখানে বিরাট মেলা হয়। এই সময় বহু তীর্থযাত্রী এখানে হুগলি নদীর মোহনায় তিনদিন ধরে স্নান করেন এবং স্থানীয় কপিল মুনি মন্দিরে পূজা দেন।
এক সময় গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রথা ছিল। সন্তানহীনরা এই মর্মে মানত করতেন যে, তাঁদের সন্তান হলে প্রথমটিকে সাগরে অর্ঘ দেবেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ওয়েলেসলি এসে দেখলেন, ওই বছরেই তেইশটি শিশু সন্তান বিসর্জনের ঘটনা ঘটেছে। পরে আইন করে এই নির্মম প্রথা তিনি নিষিদ্ধ করে দেন। কিন্তু পরনো প্রথা স্মরণে আজও কখনও চোখে পড়ে প্রথম সন্তানকে সাগরজলে বিসর্জন দিয়েই তুলে নিচ্ছেন কোনও মা। রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় সাগরসঙ্গমে সন্তান বিসর্জনের করুণ কাহিনী তো সকলেরই জানা।
লোক কথা আছে, রামের পূর্বপুরুষ অযোধ্যার সূর্য বংশের পরাক্রমশালী রাজা সগর ৯৯ বার অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রের সমতুল্য মর্যাদাশালী হতে প্রয়োজন আর একটি যজ্ঞ।শততম যজ্ঞের সময় দেবরাজ ইন্দ্র ঈর্ষান্বিত হয়ে অযোধ্যার ঈক্ষাকু বংশের রাজা সগরের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া চুরি করে পাতালপুরী অর্থাত্ গঙ্গাসাগরে কপিল মুনি নির্জন আশ্রমের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র।স্বর্গের নদী গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণের কাহিনিতে কপিল একজন প্রধান চরিত্র।সগরের ষাট হাজার পুত্র ঘোড়াটিকে খুঁজতে বেরলেন। তাঁরা কপিলকে চোর অপবাদ দিলে, কপিল তাঁদের ভষ্ম করে দিলেন। সগরের পৌত্র অংশুমান কপিলের কাছে এসে ষাট হাজার পুত্রের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন। কপিল বললেন, স্বর্গের নদী গঙ্গা নেমে এসে তাঁদের ভষ্ম স্পর্শ করলে তবেই তাঁরা প্রাণ ফিরে পাবেন। তাঁদের উদ্ধার করতে সগরের পৌত্র ভগীরথ কপিল মুনির নির্দেশ মতো স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে আসেন। গঙ্গা এসে সাগরে মিলিত হন এবং গঙ্গা স্পর্শে রাজা সগরের পুত্রেরা জীবন ফিরে পান। সেই কারণেই, প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত গঙ্গাসাগর তথা সাগরদ্বীপ তীর্থস্থান হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেছে। পুরাণ মতে, মকর সংক্রান্তির দিনই গঙ্গাসাগরে সগরপুত্রদের শাপমুক্তি ঘটেছিল, পুনর্জন্ম লাভ করেছিলেন তাঁরা। তাই প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির দিন ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজির হন স্নান সেরে পুণ্যার্জনের আশায়। মেলার ক’দিনে প্রচুর জনসমাগমে গমগম করে গঙ্গাসাগরে।
এটি একদিকে তীর্থভূমি আবার অন্যদিকে মেলাভূমি। এই দুয়ের মেলবন্ধনে আবদ্ধ গঙ্গাসাগর-মেলা।
সেখানে একদিন প্রতিষ্ঠিত হল কপিলমুনির আশ্রম। খ্রিস্টিয় ৪৩৭ অব্দে ওখানে একটি প্রচীন মন্দিরের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু নদীর পথ পরিবর্তনের ফলে সে মন্দির সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর পরেও দু’বার মন্দির নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রগ্রাসে কোনওটাই স্থায়ী হয়নি। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় দুই কিমি দূরে অবস্থিত। ১৩৮০-৮১ (ইং ১৯৭৩-৭৪) বঙ্গাব্দে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করেন অযোধ্যার হনুমানগড়ি মঠের মোহন্ত রামদাসজি মহারাজ।
ইংরেজ উইলসন সাহেব তাঁর হিন্দুধর্মবিষয়ক গ্রন্থে (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) লিখেছিলেন যে, গঙ্গাসাগরে একটি মন্দির ছিল এবং তার মধ্যে কপিলমুনির বিরাট একটি প্রস্তরমূর্তি বসানো ছিল।তাঁর বর্ণনানুযায়ী মন্দির চত্বরে ছিল প্রকাণ্ড এক বটবৃক্ষ, যার পাদদেশেই ছিল শ্রীরাম ও হনুমানের মূর্তি।; পিছনে ছিল সীতাকুণ্ড। যদিও এখনকার কপিলমূর্তি ও মন্দিরের সাথে উইলসন-বর্ণিত মন্দির-মূর্তির সেভাবে কোন সম্পর্ক পাওয়া যায় না।যদিও মন্দিরাভ্যন্তরে আজও বিরাজমান লালসিঁদুরে পরিলিপ্ত শিলাময় কতিপয় বিগ্রহ। প্রথমেই চোখে পড়ে পদ্মাসনে যোগারুঢ়, জটাশ্মশ্রুমণ্ডিত মহাযোগী কপিল, যাঁর বামহস্তে কমণ্ডুল, ঊর্ধে উত্থোলিত দক্ষিণ-করে জপমালা। শিরোদেশে পঞ্চনাগ-ছত্র। ডানপাশে চতুর্ভুজা মকর বাহিনী গঙ্গাদেবী, যাঁর অঙ্কে মহাতাপস ভগীরথ। স্বল্পদূরে গদা ও গন্ধমাদন পর্বত হস্তে মহাবীর হনুমান। কপিল বিগ্রহের বাঁয়ে ষাট সহস্র সন্তান বিয়োগ বেদনায় মুহ্যমান নগররাজ, যিনি মহর্ষি কপিলের করুণায় বীতশোক। রাজমূর্তির বাঁয়ে অষ্টভুজ সিংহবাহিনী বিশালাক্ষীদেবী। সর্ব বাঁয়ে অশ্বের বল্গাহস্তে ইন্দ্রদেব।
এককালে সাগরদ্বীপ ছিল ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপদ। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে সামুদ্রিক ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে সাগরদ্বীপের প্রায় দু’লক্ষ মানুষ সমুদ্রের টানে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহুকাল জনহীন এবং শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দে বিদেশি বণিক এবং ইংরেজরা সাগরদ্বীপকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। হবসন জবসন অভিধানে এই দ্বীপের উল্লেখ আছে। জেমস প্রাইস নামে এক ইংরেজের লেখায় দেখা যায়, সাগরদ্বীপের নাম গঙ্গাসাগর। ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে হেজেস এখানে একটি হিন্দুমন্দির দেখতে পান। এখানকার রাজা নাকি বছরে দু’লাখ টাকা তীর্থকর আদায় করতেন। পরে লুইল্লিয়ার নামে আর এক সাহেব সাগরদ্বীপে দুই সাধুকে দেখেছিলেন। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে আলেকজেণ্ডার হ্যামিলটনের বিবরণ থেকে জানা যায়, সাগরদ্বীপ হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র তীর্থস্থান। প্রতি বছর শীতে বহু সাধু ও তীর্থযাত্রী এখানে স্নান করতেন এবং পুজো দিতেন।
পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজ বণিকরা বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য বেছে নিয়েছিলেন সুন্দরবনের খাড়ি আর সাগরসঙ্গমের দ্বীপগুলি। বলতে গেলে ইংরেজরাই সাগরের পুনরুজ্জীবন ঘটান। তাঁরাই যে জঙ্গালাকীর্ণ সাগরদ্বীপে ফের বসতি গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তার সমর্থন পাওয়া যায় ১৮১১ খ্রিস্টাব্দের (৩০ কার্তিক, ১২২৫) ‘সমাচার দর্পন’-এ। ওই বছর ১৪ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘যাহারা গঙ্গাসাগর উপদ্বীপে বসতি করাইবার উদ্যোগ করিতেছে, তাহারা কলিকাতার এক্সচেঞ্জে অর্থাৎ ক্রয়বিক্রয়ের ঘরে গত বুধবার একত্র হইল এবং দশ জন সাহেব ও দুই এতদ্দেশীয় লোককে সেই কর্ম সম্পন্ন করিবার নিমিত্ত নিযুক্ত করিল…।’’ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চার আনা খাজনায় সাগরদ্বীপের ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু সাগরমেলার বর্তমান বাড়বাড়ন্তের নেপথ্যে ইংরেজদের অবদান থাকলেও সাগর উন্নয়নে সেই সময় তাঁদের প্রচেষ্টা খুব যে ফলপ্রসূ হতে পারেনি তার অন্যতম কারণ উপর্যুপরি সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝা ও জলপ্লাবন। ১৮৩৩ ও ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের সাইক্লোন সাগরদ্বীপকে তচতচ করে দেয়। শুধুমাত্র ১৮৬৪-র ঝড়ে পাঁচ হাজার জনের মৃত্যু। এর ফলে দ্বীপের লোকসংখ্যা অনেক কমে যায়। তা হলেও দ্বীপোন্নয়নের কাজ থেমে থাকেনি। বনাঞ্চল মুক্ত করে সেখানে চাষবাদ, হাটবাজার এবং মহাজনের গোলা স্থাপনের ব্যবস্থা হয়েছে। সেই সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও।
বর্তমান মন্দিরের আশেপাশে রয়েছে কিছু দেবস্থান ও আশ্রম। যথা—স্বামী কপিলানন্দ মহারাজের আশ্রম, চিন্তাহরণেশ্বরের মন্দির, সীতারাম ওঙ্কারনাথের যোগেন্দ্রমঠ, মহানির্বাণ আশ্রম, ভারতসেবাশ্রম সঙ্ঘের ধর্মশালা, সেচবিভাগের ডাকবাংলো এবং বেগুয়াখালির হাওয়া অফিস। কপিলমুনি আশ্রমের পরম্পরাগত পুরোহিত অযোধ্যার যাজনিক ব্রাহ্মণেরা প্রত্যহ মন্দিরে পাঁচবার পূজারতি করেন—রাত দ্বিপ্রহরে ভোগারতি, সায়াহ্নে সন্ধ্যারতি এবং রাত ন’ঘটিকায় শয়নারতি।বর্তমানে পূজার দ্বায়িত্বে আছেন উত্তরভারতের অযোধ্যার শ্রীরামানন্দী আখড়ার মোহন্ত শ্রীজগন দাস জীব জি ও অন্যান্য সেবায়েত।
সাগরদ্বীপের দক্ষিণপ্রান্তে হুগলি নদী (গঙ্গা নদী) বঙ্গোপসাগরে এসে পড়েছে। এই সাগরদ্বীপ হল বঙ্গোপসাগরের মহাদেশীয় সোপানে অবস্থিত একটি দ্বীপ। কলকাতা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি। । সাগর দ্বীপের দক্ষিণে হুগলি নদী বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে। এই স্থানটি হিন্দুদের কাছে পবিত্র তীর্থ। তাই সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান-এর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই দ্বীপ দক্ষিণদিকে প্রায় ৮ মাইল চওড়া। এর পশ্চিমে হুগলী নদীর প্রবাহ, পূর্বে বড়তলার খাল, হলদি নদী (পুরাতন রূপনারায়ণ) থেকে হুগলি নদী দেখা দিয়েছে। একদা হিজলীর সঙ্গে এই ভূখণ্ডের অবিচ্ছিন্ন সংযোগ ছিল, পরবর্তীকালে এটি বিচ্ছিন্ন হয়েছে। উত্তরদিকের দুটি দ্বীপ – ঘোড়ামারা ও লোহাচূড়া পরবর্তীকালে উঠেছে, এর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সাগর লাইটহাউসটি ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি।সাগর দ্বীপে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি পাইলট স্টেশন ও একটি বাতিঘর আছে।
এখানকার মন্দিরতলা, ধবলাট, মনসাদ্বীপ, হরিণবাড়ি, সুমতিনগর, মহিষমারি প্রভৃতি অঞ্চল থেকে ভূগর্ভস্থ পাকাবাড়ি, দেবালয়, পাতকুয়ো, চৌবাচ্চা, চাতাল, নৌকা মুদ্রা-অলঙ্কারা বিষ্ণুমূর্তি, জৈনমূর্তি প্রভৃতি প্রাক্-মুসলমান যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন না হলেও এখানে রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজকীয় দুর্ধর্ষ নৌবহরের ঘাঁটি ছিল বলে অনুমান করা হয়।
স্থানীয় মানুষ, পর্যটক বা তীর্থযাত্রীদের গঙ্গাসাগরে পৌঁছতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সে জন্য গড়ে উঠেছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। তার ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নবকুমারের মতো কোনও নবাগতকে পথ ভুলে ভয়ঙ্কর কাপালিকের হাতে গিয়ে পড়ার ঘটনা আজ নিতান্তই গল্পকথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যাতায়াতের সমস্যা এড়াতে ও সাগরে পর্যটন শিল্পের উন্নতির জন্য রেলপথ দিয়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হোক সাগরদ্বীপকে।
@Barnali Roy
গঙ্গাসাগর নিয়ে প্রচলিত আছে এক বিখ্যাত প্রবচন: ‘‘সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।’’ কথাটার যথার্থ ব্যাখ্যা মেলে ‘খনার বচনে’। খনা বলেছেন, ‘‘সারা বছর যাঁরা শয়ন একাদশী, ভৈমী একাদশী, উত্থান একাদশী, পার্শ্ব একাদশী, জন্মাষ্টমী, রামনবমী, শিব চতুর্দশী বা দুর্গার মহাষ্টমীর মতো শাস্ত্রীয় আচারের একটিও পালন করতে পারবেন না, তাঁরা যদি পৌষ সংক্রান্তির দিন শুধু একবার সাগরসঙ্গমে স্নান করেন, তা হলে সর্বতীর্থের পুণ্য অর্জন করবেন।’’
অমোঘ আকর্ষণে প্রতি বছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এবং সাধুসন্ত তীর্থ ও মুক্তির আশায় গঙ্গাসাগরে ছুটে আসেন, এমনকী বিদেশ থেকেও। সাগরদ্বীপ পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। সেই সঙ্গে বিস্তীর্ণ বেলাভূমি জুড়ে বসে নানা পণ্য পসারের এক বিশাল মেলা। শস্ত্রীয় স্নানপর্ব একদিনের হলেও গঙ্গাসাগর মেলা চলে পক্ষকাল।
কপিল মুনির মন্দির
শীতের হিমেল হাওয়ায় বালিয়াড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গমে সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে পুণ্যার্থীরা আদিগন্ত জলসীমায় পৌঁছে যান। সাধারণ তীর্থযাত্রীদের কাছে সাগরমেলার প্রধান আকর্ষণ নাগা সন্ন্যাসী আর হিমালয়ের সাধুসন্ত। কিন্তু ইদানীং বড়মাপের যোগী মহাত্মাদের বড় একটা দেখা যায় না। তবু কিছু ভবঘুরে হটযোগী মাধুকরী বৃত্তিধারী সাধু এবং গৈরিকবসনধারী পরিব্রাজক সাগরমেলা জমিয়ে তোলেন। বিচিত্র কামনাবাসনা নিয়েও একদল মানুষ আসেন, যাঁরা স্নানান্তে প্রার্থনা জানিয়ে সন্তানের স্বাস্থ্য ও অর্থের জন্য মানত করেন।
গঙ্গা নদীর মর্ত্যে প্রত্যাবর্তন ও সাগর রাজার পুত্রদের জীবন বিসর্জনের লোকগাঁথাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই বিখ্যাত তীর্থস্থান গঙ্গাসাগর।কিংবদন্তি আছে, এখানে সাংখ্যদর্শনের আদি-প্রবক্তা কপিলমুনির আশ্রম ছিল। বৈদিক ঋষি কপিল ।হিন্দু ধর্মগ্রন্থে তাঁকে মনুর বংশধর বলা হয়েছে।কপিল ছিলেন একজন বৈদিক ঋষি। তাঁকে সাংখ্য দর্শনের অন্যতম প্রবর্তক মনে করা হয়।ভাগবত পুরাণে তাঁর সাংখ্য দর্শনের আস্তিক্যবাদী ধারাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি ব্রহ্মার পৌত্র মনুর বংশধর।ভগবদ্গীতায় কপিলকে সিদ্ধযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় কপিলের উল্লেখ করেছেন:⇁
“ বৃক্ষের মধ্যে আমি বট, ঋষিগণের মধ্যে আমি দেবর্ষি নারদ, গন্ধর্বগণের মধ্যে আমি চিত্ররথ ও সিদ্ধগণের মধ্যে আমি কপিল। (১০। ২৬) "
একদা কপিলমুনির ক্রোধাগ্নিতে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র ভস্মীভূত হন এবং তাঁদের আত্মা নরকে নিক্ষিপ্ত হয়। সগরের পৌত্র ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে এসে সগরপুত্রদের ভস্মাবশেষ ধুয়ে ফেলেন এবং তাঁদের আত্মাকে মুক্ত করে দেন (রামায়ণ, বালকাণ্ড, ৪৩ অধ্যায়)। মহাভারতের বনপর্বে তীর্থযাত্রা অংশে গঙ্গাসাগর তীর্থের কথা বলা হয়েছে। পালবংশের রাজা দেবপালের একটি লিপিতে তাঁর গঙ্গাসাগর-সঙ্গমে ধর্মানুষ্ঠান করার কথা বলা হয়েছে। ইতিহাস আর জনশ্রুতিতেই নয়,মৎস্য, বায়ু এবং পদ্মপুরাণ শাস্ত্রেরও সাগরতীর্থ সম্পর্কে নানা কথা আছে। কালিদাসের ‘রঘুবংশ’ এবং মধ্যযুগের কয়েকটি মঙ্গলকাব্যেও ছড়িয়ে আছে গঙ্গাসাগর প্রসঙ্গ। ‘মহাভারতে’-এর বনপর্বে দেখা যায়, স্বয়ং যুধিষ্ঠির সাগরসঙ্গমে এসেছিলেন। মেগাস্থিনিস, হিউয়েন সাঙের বিবরণেও গঙ্গাসাগর স্থান পেয়েছে।
সাগরদ্বীপ-- বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবনাঞ্চলের এই দ্বীপটিরই পৌরাণিক নাম শ্বেতদ্বীপ বা মতান্বরে জম্বুদ্বীপ । এরই দক্ষিণাংশে গঙ্গা যেখানে সাগরের সঙ্গে মিলেছে, সেই স্থানটি গঙ্গাসাগর নামে খ্যাত। প্রত্যেক বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি মকরসংক্রান্তি বা পৌষ-সংক্রান্তির পূণ্যতীথিতে লাখো লাখো লোকের সমাগম ঘটে এই সঙ্গমে। এই সমাগমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিরাট মেলা যার নাম গঙ্গাসাগর-মেলা।যুগ যুগ ধরে সাধুসন্ত ও মোক্ষকামী মানুষের এত ভিড় এই মেলা ও পূণ্য তিথিকে কেন্দ্র করে। গঙ্গাসাগর মেলা দ্বিতীয় বৃহত্তম হিন্দু মেলা (কুম্ভমেলার পরে)।প্রতিবছর মকর সংক্রান্তির দিন এখানে বহু লোক তীর্থস্নান করতে আসেন; তবে বিহার-উত্তরপ্রদেশ থেকে আগত অবাঙালি পুণ্যার্থীদের ভিড়ই হয় সর্বাধিক।প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে এখানে বিরাট মেলা হয়। এই সময় বহু তীর্থযাত্রী এখানে হুগলি নদীর মোহনায় তিনদিন ধরে স্নান করেন এবং স্থানীয় কপিল মুনি মন্দিরে পূজা দেন।
এক সময় গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রথা ছিল। সন্তানহীনরা এই মর্মে মানত করতেন যে, তাঁদের সন্তান হলে প্রথমটিকে সাগরে অর্ঘ দেবেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ওয়েলেসলি এসে দেখলেন, ওই বছরেই তেইশটি শিশু সন্তান বিসর্জনের ঘটনা ঘটেছে। পরে আইন করে এই নির্মম প্রথা তিনি নিষিদ্ধ করে দেন। কিন্তু পরনো প্রথা স্মরণে আজও কখনও চোখে পড়ে প্রথম সন্তানকে সাগরজলে বিসর্জন দিয়েই তুলে নিচ্ছেন কোনও মা। রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় সাগরসঙ্গমে সন্তান বিসর্জনের করুণ কাহিনী তো সকলেরই জানা।
লোক কথা আছে, রামের পূর্বপুরুষ অযোধ্যার সূর্য বংশের পরাক্রমশালী রাজা সগর ৯৯ বার অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রের সমতুল্য মর্যাদাশালী হতে প্রয়োজন আর একটি যজ্ঞ।শততম যজ্ঞের সময় দেবরাজ ইন্দ্র ঈর্ষান্বিত হয়ে অযোধ্যার ঈক্ষাকু বংশের রাজা সগরের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া চুরি করে পাতালপুরী অর্থাত্ গঙ্গাসাগরে কপিল মুনি নির্জন আশ্রমের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র।স্বর্গের নদী গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণের কাহিনিতে কপিল একজন প্রধান চরিত্র।সগরের ষাট হাজার পুত্র ঘোড়াটিকে খুঁজতে বেরলেন। তাঁরা কপিলকে চোর অপবাদ দিলে, কপিল তাঁদের ভষ্ম করে দিলেন। সগরের পৌত্র অংশুমান কপিলের কাছে এসে ষাট হাজার পুত্রের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন। কপিল বললেন, স্বর্গের নদী গঙ্গা নেমে এসে তাঁদের ভষ্ম স্পর্শ করলে তবেই তাঁরা প্রাণ ফিরে পাবেন। তাঁদের উদ্ধার করতে সগরের পৌত্র ভগীরথ কপিল মুনির নির্দেশ মতো স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে আসেন। গঙ্গা এসে সাগরে মিলিত হন এবং গঙ্গা স্পর্শে রাজা সগরের পুত্রেরা জীবন ফিরে পান। সেই কারণেই, প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত গঙ্গাসাগর তথা সাগরদ্বীপ তীর্থস্থান হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেছে। পুরাণ মতে, মকর সংক্রান্তির দিনই গঙ্গাসাগরে সগরপুত্রদের শাপমুক্তি ঘটেছিল, পুনর্জন্ম লাভ করেছিলেন তাঁরা। তাই প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির দিন ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজির হন স্নান সেরে পুণ্যার্জনের আশায়। মেলার ক’দিনে প্রচুর জনসমাগমে গমগম করে গঙ্গাসাগরে।
এটি একদিকে তীর্থভূমি আবার অন্যদিকে মেলাভূমি। এই দুয়ের মেলবন্ধনে আবদ্ধ গঙ্গাসাগর-মেলা।
সেখানে একদিন প্রতিষ্ঠিত হল কপিলমুনির আশ্রম। খ্রিস্টিয় ৪৩৭ অব্দে ওখানে একটি প্রচীন মন্দিরের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু নদীর পথ পরিবর্তনের ফলে সে মন্দির সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর পরেও দু’বার মন্দির নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রগ্রাসে কোনওটাই স্থায়ী হয়নি। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় দুই কিমি দূরে অবস্থিত। ১৩৮০-৮১ (ইং ১৯৭৩-৭৪) বঙ্গাব্দে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করেন অযোধ্যার হনুমানগড়ি মঠের মোহন্ত রামদাসজি মহারাজ।
ইংরেজ উইলসন সাহেব তাঁর হিন্দুধর্মবিষয়ক গ্রন্থে (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) লিখেছিলেন যে, গঙ্গাসাগরে একটি মন্দির ছিল এবং তার মধ্যে কপিলমুনির বিরাট একটি প্রস্তরমূর্তি বসানো ছিল।তাঁর বর্ণনানুযায়ী মন্দির চত্বরে ছিল প্রকাণ্ড এক বটবৃক্ষ, যার পাদদেশেই ছিল শ্রীরাম ও হনুমানের মূর্তি।; পিছনে ছিল সীতাকুণ্ড। যদিও এখনকার কপিলমূর্তি ও মন্দিরের সাথে উইলসন-বর্ণিত মন্দির-মূর্তির সেভাবে কোন সম্পর্ক পাওয়া যায় না।যদিও মন্দিরাভ্যন্তরে আজও বিরাজমান লালসিঁদুরে পরিলিপ্ত শিলাময় কতিপয় বিগ্রহ। প্রথমেই চোখে পড়ে পদ্মাসনে যোগারুঢ়, জটাশ্মশ্রুমণ্ডিত মহাযোগী কপিল, যাঁর বামহস্তে কমণ্ডুল, ঊর্ধে উত্থোলিত দক্ষিণ-করে জপমালা। শিরোদেশে পঞ্চনাগ-ছত্র। ডানপাশে চতুর্ভুজা মকর বাহিনী গঙ্গাদেবী, যাঁর অঙ্কে মহাতাপস ভগীরথ। স্বল্পদূরে গদা ও গন্ধমাদন পর্বত হস্তে মহাবীর হনুমান। কপিল বিগ্রহের বাঁয়ে ষাট সহস্র সন্তান বিয়োগ বেদনায় মুহ্যমান নগররাজ, যিনি মহর্ষি কপিলের করুণায় বীতশোক। রাজমূর্তির বাঁয়ে অষ্টভুজ সিংহবাহিনী বিশালাক্ষীদেবী। সর্ব বাঁয়ে অশ্বের বল্গাহস্তে ইন্দ্রদেব।
এককালে সাগরদ্বীপ ছিল ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপদ। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে সামুদ্রিক ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে সাগরদ্বীপের প্রায় দু’লক্ষ মানুষ সমুদ্রের টানে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহুকাল জনহীন এবং শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দে বিদেশি বণিক এবং ইংরেজরা সাগরদ্বীপকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। হবসন জবসন অভিধানে এই দ্বীপের উল্লেখ আছে। জেমস প্রাইস নামে এক ইংরেজের লেখায় দেখা যায়, সাগরদ্বীপের নাম গঙ্গাসাগর। ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে হেজেস এখানে একটি হিন্দুমন্দির দেখতে পান। এখানকার রাজা নাকি বছরে দু’লাখ টাকা তীর্থকর আদায় করতেন। পরে লুইল্লিয়ার নামে আর এক সাহেব সাগরদ্বীপে দুই সাধুকে দেখেছিলেন। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে আলেকজেণ্ডার হ্যামিলটনের বিবরণ থেকে জানা যায়, সাগরদ্বীপ হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র তীর্থস্থান। প্রতি বছর শীতে বহু সাধু ও তীর্থযাত্রী এখানে স্নান করতেন এবং পুজো দিতেন।
পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজ বণিকরা বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য বেছে নিয়েছিলেন সুন্দরবনের খাড়ি আর সাগরসঙ্গমের দ্বীপগুলি। বলতে গেলে ইংরেজরাই সাগরের পুনরুজ্জীবন ঘটান। তাঁরাই যে জঙ্গালাকীর্ণ সাগরদ্বীপে ফের বসতি গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তার সমর্থন পাওয়া যায় ১৮১১ খ্রিস্টাব্দের (৩০ কার্তিক, ১২২৫) ‘সমাচার দর্পন’-এ। ওই বছর ১৪ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘যাহারা গঙ্গাসাগর উপদ্বীপে বসতি করাইবার উদ্যোগ করিতেছে, তাহারা কলিকাতার এক্সচেঞ্জে অর্থাৎ ক্রয়বিক্রয়ের ঘরে গত বুধবার একত্র হইল এবং দশ জন সাহেব ও দুই এতদ্দেশীয় লোককে সেই কর্ম সম্পন্ন করিবার নিমিত্ত নিযুক্ত করিল…।’’ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চার আনা খাজনায় সাগরদ্বীপের ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু সাগরমেলার বর্তমান বাড়বাড়ন্তের নেপথ্যে ইংরেজদের অবদান থাকলেও সাগর উন্নয়নে সেই সময় তাঁদের প্রচেষ্টা খুব যে ফলপ্রসূ হতে পারেনি তার অন্যতম কারণ উপর্যুপরি সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝা ও জলপ্লাবন। ১৮৩৩ ও ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের সাইক্লোন সাগরদ্বীপকে তচতচ করে দেয়। শুধুমাত্র ১৮৬৪-র ঝড়ে পাঁচ হাজার জনের মৃত্যু। এর ফলে দ্বীপের লোকসংখ্যা অনেক কমে যায়। তা হলেও দ্বীপোন্নয়নের কাজ থেমে থাকেনি। বনাঞ্চল মুক্ত করে সেখানে চাষবাদ, হাটবাজার এবং মহাজনের গোলা স্থাপনের ব্যবস্থা হয়েছে। সেই সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও।
বর্তমান মন্দিরের আশেপাশে রয়েছে কিছু দেবস্থান ও আশ্রম। যথা—স্বামী কপিলানন্দ মহারাজের আশ্রম, চিন্তাহরণেশ্বরের মন্দির, সীতারাম ওঙ্কারনাথের যোগেন্দ্রমঠ, মহানির্বাণ আশ্রম, ভারতসেবাশ্রম সঙ্ঘের ধর্মশালা, সেচবিভাগের ডাকবাংলো এবং বেগুয়াখালির হাওয়া অফিস। কপিলমুনি আশ্রমের পরম্পরাগত পুরোহিত অযোধ্যার যাজনিক ব্রাহ্মণেরা প্রত্যহ মন্দিরে পাঁচবার পূজারতি করেন—রাত দ্বিপ্রহরে ভোগারতি, সায়াহ্নে সন্ধ্যারতি এবং রাত ন’ঘটিকায় শয়নারতি।বর্তমানে পূজার দ্বায়িত্বে আছেন উত্তরভারতের অযোধ্যার শ্রীরামানন্দী আখড়ার মোহন্ত শ্রীজগন দাস জীব জি ও অন্যান্য সেবায়েত।
সাগরদ্বীপের দক্ষিণপ্রান্তে হুগলি নদী (গঙ্গা নদী) বঙ্গোপসাগরে এসে পড়েছে। এই সাগরদ্বীপ হল বঙ্গোপসাগরের মহাদেশীয় সোপানে অবস্থিত একটি দ্বীপ। কলকাতা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি। । সাগর দ্বীপের দক্ষিণে হুগলি নদী বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে। এই স্থানটি হিন্দুদের কাছে পবিত্র তীর্থ। তাই সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান-এর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই দ্বীপ দক্ষিণদিকে প্রায় ৮ মাইল চওড়া। এর পশ্চিমে হুগলী নদীর প্রবাহ, পূর্বে বড়তলার খাল, হলদি নদী (পুরাতন রূপনারায়ণ) থেকে হুগলি নদী দেখা দিয়েছে। একদা হিজলীর সঙ্গে এই ভূখণ্ডের অবিচ্ছিন্ন সংযোগ ছিল, পরবর্তীকালে এটি বিচ্ছিন্ন হয়েছে। উত্তরদিকের দুটি দ্বীপ – ঘোড়ামারা ও লোহাচূড়া পরবর্তীকালে উঠেছে, এর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সাগর লাইটহাউসটি ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি।সাগর দ্বীপে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি পাইলট স্টেশন ও একটি বাতিঘর আছে।
এখানকার মন্দিরতলা, ধবলাট, মনসাদ্বীপ, হরিণবাড়ি, সুমতিনগর, মহিষমারি প্রভৃতি অঞ্চল থেকে ভূগর্ভস্থ পাকাবাড়ি, দেবালয়, পাতকুয়ো, চৌবাচ্চা, চাতাল, নৌকা মুদ্রা-অলঙ্কারা বিষ্ণুমূর্তি, জৈনমূর্তি প্রভৃতি প্রাক্-মুসলমান যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন না হলেও এখানে রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজকীয় দুর্ধর্ষ নৌবহরের ঘাঁটি ছিল বলে অনুমান করা হয়।
স্থানীয় মানুষ, পর্যটক বা তীর্থযাত্রীদের গঙ্গাসাগরে পৌঁছতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সে জন্য গড়ে উঠেছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। তার ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নবকুমারের মতো কোনও নবাগতকে পথ ভুলে ভয়ঙ্কর কাপালিকের হাতে গিয়ে পড়ার ঘটনা আজ নিতান্তই গল্পকথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যাতায়াতের সমস্যা এড়াতে ও সাগরে পর্যটন শিল্পের উন্নতির জন্য রেলপথ দিয়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হোক সাগরদ্বীপকে।
Fantastic.. write-up
ReplyDelete