Palamu jungle....betla forest

               দিন রাতের অরণ্য
      @Barnali Roy                         



পালামৌ ফোর্টের একটা ভাঙ্গা পাঁচিলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি।বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে "আরণ্যক" উপন্যাসের প্রতিটা পাতা।যদিও উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে ছিল লবটুলিয়া আর তার চারপাশের বনাঞ্চল  ।  ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় বাংলায় কিছুটা পড়তে হয়ে ছিল।পড়ে এত
ভালো লেগেছিল যে পরদিনই ছুটে গেছিলাম লাইব্রেরীতে।এক নিঃশেষ পড়ে শেষ করেছিলাম
আরণ্যক গোটা উপন্যাসটা।সেই থেকে জঙ্গল প্রীতি। তারপর হাতে পেলাম  পালামৌর জঙ্গলে। গোগ্রাসে গিলেছি বইটা।পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতাম কখনো লবটুলিয়া,  কখনোবা হারিয়ে যেতাম পালামৌর
জঙ্গলে।আজ সেই জঙ্গলের বুকে দাঁড়িয়ে আছি।যে অনুরণন বুকের ভেতরে টের পাচ্ছি সেটা কোনো
ঝকঝকে কফিশপে বসে পাওয়া যায় না,তার জন্য জঙ্গলের বুনো গন্ধ,সোদা মাটির গন্ধ বুকের মাঝে
অনুভব করতে হয়।
মাসটা ছিল নভেম্বর। মধ্যরাতের বরওয়াধি স্টেশন। আমি ছাড়া স্টেশনে দু এক প্যাসেঞ্জার নামলেও
মনে হয় তারা স্থানীয়। একে তো নিশুতি রাতের এক দেহাতি স্টেশন,তার উপর মনে হয় কারেন্ট নেই।ঘুটঘুটে
অন্ধকার। একমাত্র ভরসা চাঁদের আলো।আজ বোধহয় পূর্ণিমা। গোটা প্ল্যাটফর্ম জ্যোৎস্নার আলোতে
ভেসে যাচ্ছে।অনেক খোঁজ করেও ওয়েটিং রুমের হদিশ পেলাম না।অগত্যা স্টেশনের কোনে খবর কাগজ
বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম।অনেক দূরে কোথাও একটা ট্রানজিস্টারে হিন্দি লোক সঙ্গীত বাজছে।শব্দগুলো ঠিক
স্পষ্ট  নয়।বোঝার চেষ্টা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি,ঘুম ভাঙ্গলো ট্রেনের এক জোড় হুইসেলে।ঘড়িতে
তখন ভোর ছটা।তড়িঘড়ি উঠে স্টেশনের বাইরে বেড়িয়ে এলাম।একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে রওনা দিলাম পালামৌর
দিকে।গাড়ি যতই এগোচ্ছে দুপাশের জঙ্গল আরো ঘন সবুজ হচ্ছে।পারা ঝড়ছে,নতুন পাতা গজাচ্ছে।রাস্তার
দুধার জুড়ে  ঝাঁকড় জ্যাকারান্ডা গাছের সারি।আবার কোথাও সারি সারি জারুল গাছ।



যত এগোচ্ছি ড্রাইভার দাদার মুখে মুখে  যেসব জায়গার নাম শুনতে পাচ্ছি সেগুলো যেন কতদিনের চেনা,একান্ত আপন। অথচ এই প্রথম বার আমার আসা।রুমান্ডি,কাঞ্চনপুর, কোয়েল নদী,কেচকি সঙ্গম,ঔরঙ্গা নদী-----কতদিনের চেনা।
কৈশরের বইয়ের পাতা থেকে বেড়িয়ে এসে আজ এরা আমার চোখের সামনে।যদিও সঞ্জীবচন্দ্র বা বুদ্ধদেব গুহ
কারোর পালামৌ সেইরকম নেই,তবুও নামেই যেন যাদু আছে।
পৌঁছে গেছি বনবিহার লজের সামনে।স্টেশন থেকে মাত্র ২৫/৩০মিনিটের রাস্তা।ঝাড়খণ্ড সরকারের অতিথিশালাটি বেশ পরিপাটি।কটেজে ঢুকে একটু গড়িয়ে নিলাম।তারপর ১০টা নাগাদ চা,কচুরি খেয়ে সাফারির খোঁজ নিতে গেলাম।লজের গেট থেকে বেড়িয়ে উলটো ফুটে কয়েক মিটার গেলেই বেতলা ফরেস্টের মেনগেট।



য়ে দেখি ভোর ছটা থেকে দশটা আর দুপুর দুটো থেকে পাঁচটা সাফারির সময়।এখন আর হবেনা,সেই দুটো।অগত্যা আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।এলাকাটা খুব বড় নয়।দু চারটে দোকানপাট, একটা প্রাইমারী
স্কুল,সরকারি লজ এই আর কি।একটা চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে আলাপ হল শ্যামসুন্দর অবস্তির সাথে।
এখানে প্রাইমারী স্কুলে পড়ান।বাড়ি বিহারের ভাগলপুরে।এখানে প্রায় ১০বছর। অনেক গল্প শুনছিলাম তার কাছে।এই জঙ্গলের ভিতরে নাকি অনেককটা আদিবাসী গ্রাম আছে।সেখান থেকেই কিছু ছেলেমেয়ে পড়তে
আসে।তবে সাক্ষরতার হার ভালো নয়।বেশির ভাগই কৃষক, অন্যের জমিতে খেটে খাওয়া মানুষ।শিক্ষ,স্বাস্থ্য,
উন্নয়ন বর্জিত।তার উপর কয়েকদশকের  উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদী মুভমেন্ট পর্যটন শিল্পেরও ক্ষতি করেছে।আমি অবস্তি স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম,'এই জঙ্গলে আছেন কিভাবে?'
মুচকি হেসে জানালেন,'ইয়ে জঙ্গল মুঝে ভা গ্যেয়া।'
তাড়াতাড়ি লজে ফিরে স্নান সেরে,মুরগির ঝোল আর গরম ভাত খেয়ে চলে এলাম সাফারির বুকিং অফিসে।সারি সারি জিপ দাঁড়িয়ে সাফারির জন্য।কেউ কেউ হাতিতেও সাফারি করে।আমি জঙ্গল আর দুর্গের প্যাকেজ সাফারি করবো। জিপে উঠে বসলাম।

সাথে চলল গাইড।প্রথমে জঙ্গল তারপর ফোর্ট।
বাইসনের লোগো দেওয়া জঙ্গলের গেট খুলে গেল।ঢুকতেই চোখ গেল একটা সাইনবোর্ডের দিকে,তাতে লেখা
আছে---'Betla stands for---Bison,Elephant, Tiger,Leopard, Axis Axis।'বেতলার এই জঙ্গল টিই
প্রথম টাইগার রিজার্ভেশন ক্ষেত্র হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।বাঙালী জনমানসে বেতলার খ্যাতি পালামৌর
জঙ্গল বলেই।বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক'কিংবা সত্যজিৎ রায়ের অরন্যের দিনরাত্রি।
গাইডের কাছেই শুন ছিলাম জঙ্গলটা প্রায় ১৩১৫বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত।অন্যান্য জঙ্গলের সাথে এর একটা পার্থক্য চোখে পরার মতো। প্রায় পুরোটাই ঘাস জমি,লাল-ধূসর কাঁকর  মাটি।বড় বড় গাছ আছে,তবে
ফাঁকা ফাঁকা।দুটো ওয়াট টাওয়ার চোখে পড়ল।কোথাও কোথাও নুন রাখা আছে পশুদের খাবার জন্য।গাইডের কাছেই শুনছিলাম অনেক মেডিশিনাল প্ল্যান্ট আছে এই জঙ্গলে।হাতি,বাঘ,হায়না,ভল্লুক,সম্বর,নীল গাই ছাড়াও হর্নবিল,ঈগল, বাজ,তিতির, থ্রাশার,মুনিয়ার মতো পাখি আছে।তবে এদের দেখা পাওয়াটা ভাগ্য,চোখ আর
ধৈর্যের ব্যাপার।জঙ্গলটা পুরোটাই শাল,পলাশ,সেগুন আর বাঁশ ঝাড়ে ভর্তি।প্রায় চল্লিশ মিনিট চড়কি পাক
খেয়েও যখন কিছুই দেখতে পেলাম না তখন ফেরার পথ ধরেছি।তাতে অবশ্য আফসোস নেই।পশুপাখি না
দেখলেও নিবিড় প্রকৃতির রূপ বড় পাওনা। জঙ্গলে ঢোকার মুখেই আছে বনবিভাগের বাংলো। ইচ্ছা করলে
এখানেও থাকা যায়।
জঙ্গল দেখে এবার আমাদের জিপ রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে গেল সামনের জঙ্গলের রাস্তায়।এবড়োখেবড়ো
রাস্তা।পাহাড়ি ছোট ঝরনা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম দুর্গের সামনে।কয়েক শতকের ইতিহাসের সাক্ষী পালামৌ ফোর্ট।



শোনা যায় ষোল দশকে চেরো রাজত্বে ভানভাসি রাজাদের  সম্মানার্থে খাঁরওয়ার রাজা মেদিনী রায় এই
দুর্গটি তৈরি করেন।মেদিনী রায় যদিও একজন প্রজাহিতৈষি রাজা ছিলেন,কিন্ত তাঁর রাজত্বকাল মাত্র ১৩
বছর(আনুমানিকভাবে ১৬৬২-১৬৭৪)।দুর্গের চারপাশ গভীর জঙ্গল।একপাশে ঔরঙ্গা নদী।জিপ থেকে নেমে
দুর্গটা চারপাশ ঘুরে দেখতে লাগলাম।মুসলিম স্থাপত্যে যে ধরনের আর্চ,কারুকাজ,খিলানের ব্যবহার
হত সেই ধরনের কাজ চোখে পড়ল।যদিও দুর্গ না বলে ধ্বংসস্তূপ বলাই ভালো।মাটি আর ইট
দিয়ে তৈরি এই দুর্গে ভাঙা সিঁড়ি,ভাঙা পাঁচিল,জঙ্গলাকীর্ণ কুঠুরি ছাড়া আর কিছুই নেই।কোনো রকমে
ইট বেয়ে এসে পৌঁছেছি দুর্গের উপরের খোলা অংশে।চারিপাশ ঘন সবুজ জঙ্গলে ঘেরা।একটা বুনো গন্ধ
বারবার নাকে আসছে।বারবার ফিরে যাচ্ছি 'আরণ্যক'র সত্যচরনের কাছে।'কত সন্ধ্যা আসিল অপূর্ব
রক্তমেঘের মুকুট মাথায়।'
সত্যচরন,শ্যামসুন্দর অবস্তিরা প্রকৃতির এমন রূপ দেখে ফেলেন যে শহর তাদের টানে না।নিবিড় অরন্যের
মাঝেই তারা বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পান।উপর থেকে নিচে নামতে গিয়ে চোখে পড়ল কারা যেন
নিজেদের নাম খোদাই করে রেখেছে।খুব খারাপ দেখাচ্ছে।এমন ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব কতটা,সেটা উপলব্ধি বোধও আমাদের নেই।




বিভূতিভূষণের যুগলপ্রসাদ চরিত্রটিকে সবাই পাগল বলত।লেখক নিজেও
বলেছেন,'সে এক অদ্ভুত বাতিকগ্রস্ত মানুষ।বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়।কি করে বনের সৌন্দর্য বাড়ানো  যায়
এই তার একমাত্র চিন্তা।'এমনভাবে ভাবতে পারলে সত্যিই কতো ভালো হত।
গাইডের কাছেই শুনলাম মেদিনী রায় ছোটনাগপুর রাজার কাছে দুর্গটি হেরে যান।পরবর্তি সময় মোঘল
শাসকরা এটি দখল করে।তারপর ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম  হয়।আরো শুনলাম যে পাহাড়ের উপর আরো একটি
দুর্গ আছে।রাস্তা খুব খারাপ থাকায় সেখানে আর যাওয়া হল না।
ফোর্টে ঘুরতে ঘুরতে সারা শরীরে শিহরণ জাগছে।একটা আস্ত সাম্রাজ্যের ক্ষয়িত রূপ।জঙ্গলের
দিকে একটু এগোতেই মনে হল হয়তো দোবরু পান্না,কিংবা ভানুমতীদের সাথে দেখা হলেও দেখা
হতে পারে।একটা ছমছমে অনুভূতি।
'ম্যাডাম ওর অন্দর মত যাও।'গাইডের গলা পেয়ে ফেরত এলাম।
জিপে আস্তে আস্তে মনে হল এই আদিম অনুন্নত মানুষগুলোর মসঝে হয়তো আজও বেঁচে আছে
রাজা দোবরূ পান্না,আজ ও যারা টাঁড়বারোর পূজা করে,ফেসবুক,হোয়াটসআপের দুনিয়াটা সত্যিই যাদের কাছে এখনো অজানা।






লজে ফিরে বিকালে বেলায় গেলাম কেচকি সঙ্গমে।রেললাইন পেরিয়ে লাল কাঁকুড়ে পথ পেরিয়ে
কয়েক কিলোমিটার পথ।সেই অনেক ভালোবাসার কোয়েল নদী।বাঁদিকে কোয়েল নদী,ডানদিকে
ঔরঙ্গা নদী।এখানেই সঙ্গম।অল্পদূরেই একটা ব্রীজ।দূরে ট্রেন চলেছে।ফিরে যাচ্ছি বুদ্ধদেব গুহ র
যশোবন্তের শিকারের গল্পে কিংবা সত্যজিৎ রায়ের অরন্যের দিনরাত্রির সেই বন্ধুদের আড্ডায়।আজ ও
আকাশের চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে।সেই চাঁদের ছায়া কোয়েলের বুকে।আমাকে ঘিরে ধরেছে
অজস্র জোনাকিপোকা। তবু ফিরতে হবে।রাত গভীর হচ্ছে।
যাওয়ার পথ:-
হাওড়া থেকে বরওয়াধি জংশন।বরওয়াধি জংশন থেকে বেতলা ১৫কিলোমিটার। ডাল্টনগঞ্জ,রাঁচি
প্রভৃতি শহরের সাথে যোগাযোগ আছে।হাওড়া/কলকাতা থেকে কলকাতা আজমির এক্সপ্রেস, শক্তিপুঞ্জ
এক্সপ্রেস,হাওড়া ভোপাল সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস ইত্যাদি ট্রেনে বারওয়াধি পৌঁছানো যায়।সেখানে
স্টেশনের বাইরে থেকে বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে পৌঁছানো যায় পালামৌর
জঙ্গলে।

থাকার জায়গা:-
ঝাড়খণ্ড সরকারের টুরিস্ট বাংলো। কলকাতা থেকে বুকিং  হয়।আর বনবিভাগের
বাংলো ডাল্টন গঞ্জ থেকে বুকিং হয়।

Comments

Popular posts from this blog

Barshajapan e Chilapata Mendabari r Jangol

Silary Gaon

Ochena Purulia r anache kanache