Binsar er jongole----kumaon himalaya
রোমাঞ্চের বিনসর @Barnali Roy
বিনসরের জঙ্গলে
ভারতবর্ষের প্রতিটি ছত্রে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য। পাহাড়, জঙ্গল,নদী,সমুদ্র সবকিছুর এক মিলিত আধার আমার দেশ। ইতিহাস,পুরাণ আর তাঁর সাথে তাঁক লাগানো রূপমাধুর্য।যেখানে মানুষ প্রকৃতির কোলে নিবিড়তা খুঁজে ফেরে।কোথাও দুধ সাদা বরফের পাহাড় তো আবার কোথাও সুনিবিড় গাঢ় ঘন বনাঞ্চল,আবার কোথাও রুক্ষ পাহাড়ে মাথায় নীল আকাশ,তো কোথাও সমুদ্রের দুধ সাদা ফেনা,কোথাও ইতিহাসের রহস্য ঘেরা কেল্লা,আবার কোথাও ধু ধু মরুভূমির বালিয়াড়ি।
কুমায়ূনের পাহাড়
ভারতের উত্তরে অবস্থিত কুমায়ুনের রূপে মুগ্ধতা ও রহস্য দুই ই আছে।
উত্তরাখন্ডের দুটি প্রশাসনিক বিভাজনের মধ্যে একটি কুমায়ুন, অন্যটি হল গাড়োয়াল। কুমায়ুন একটি পাহাড়ঘেরা রাজ্য।আলমোড়া,বাগেশ্বর,চম্পাবত,নৈনিতাল,পিথরাগড়,আর উধম সিং নগর জেলাগুলিতে বিভাজিত এই কুমায়ুন রাজ্যটি।আলমোড়া থেকে প্রায় ৩৩কিমি দূরে বিনসর ওয়াইল্ড লাইফ সেঞ্চুরির অবস্থান।হিমালয়ের ঝান্ডিধার পর্বতের মাথায় এর অবস্থান।১৯৮৮ সালে এটি প্রথম সংরক্ষিত অঞ্চলের তকমা পায়।প্রায় ৪৫.৫৯ স্কোয়ার কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে এই বনভূমি।
হিন্দু পুরান অনুযায়ী বিষ্ণুরর কুর্ম অবতারের স্থান মাহাত্ম্য থেকে এই কুমায়ুন নামটি এসেছে।তাই বোঝাই যাচ্ছে হিন্দু শাস্ত্রের নানা মিথ গড়ে উঠেছে এই কুমায়ুনের বিভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে।বিনসরের ইতিহাস ঘাটতে গিয়েও নানা গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়।কথিত আছে পুরানের সাতজন ঋষি এই অঞ্চলে তপস্যা করেছিলেন।তারা যেখানে তপস্যা করেছিলেন সেই জায়গাটির নাম সাতখোল।আরো শোনা যায় আগে এই বিনসরের নাম ছিল ভিনসর,যা কিনা শিবের একটি নাম।পরে লোক মুখে প্রচলিত হতে হতে এটি বিনসর হয়ে যায়।এই অঞ্চলটিতে যে শিবের মাহাত্ম্য প্রচলিত আছে সেটা ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিষয়।হিমালয়ের নানা প্রান্তে নানান মন্দির,স্থাপত্য,আর পৌরাণিক কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত আর লিখিত আকারেও পাওয়া যায়।
দিল্লী থেকে সড়ক পথে বিনসরের দূরত্ব ৩৮৬ কিমি।
কাঠগোদাম,ভাওয়ালি,খৈরিনা,আলমোড়া হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় বিনসর।আর রেলপথে কাঠগোদাম স্টেশনে নেমে গাড়িতে যাওয়া যায়।
বিনসর পৌঁছানোর রাস্তাটা এত সুন্দর আর বৈচিত্র্যময় যে মনের মধ্যে একই সাথে আনন্দ আর রোমাঞ্চ জেগে ওঠে।দিল্লী থেকে একটা গাড়ি নিয়ে যদিও সাত সকালে বেড়িয়ে পড়েছিলাম বিনসরের জঙ্গল দেখতে যাব বলে।কিন্তু পথের দূরত্ব থেকেও এর দূর্গম আর পাকদণ্ডীময় রাস্তা চলার পথকে আরো দীর্ঘ করে তুলছিল।আলমোড়া পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে সন্ধ্যে ছটা।চারিপাশে জমাট বাঁধা অন্ধকার।তার মধ্যে গাড়ির ড্রাইভার পথ হারিয়ে ঢুকে পড়েছে ঘন জঙ্গলের রাস্তায়।বন্য জীব জন্তুর ডাক ভেসে আসছে কানে।চারিপাশে শুধুই জঙ্গল।কোন লোকালয় চোখেই পড়ছে না।প্রায় ঘন্টা দেড়েক চক্কর কেটে পৌঁছালাম ফরেস্ট চেক পোস্টে।আসলে খুব দ্রুত বিনসরের প্রোগ্রাম করেছি বলে সরকারি ফরেস্ট বাংলোতে থাকার জায়গা মেলে নি।আমি যাব বিনসরের জঙ্গল ঘেষা বাফার জোনের একটা গ্রাম ধৌলচিনার একটা রিসর্টে।আজ রাতটা ওখানেই থাকা।আজকের দিন টা বিনসর ফরেস্ট রেস্ট হাউসে বুকিং পাই নি।চেকপোস্ট থেকে যা বলল আমরা প্রায় ৮ কিমি রাস্তা এগিয়ে এসেছি।আবার সেই জঙ্গলের পথ।ভেবেই বুকের ভিতরটা কেমন হতে লাগল।যাই হোক রাস্তা চিনে যখন রিসর্টে ঢুকলাম তখন ঘড়িতে রাত ৭.৩০টা।আট কিলোমিটার রাস্তা যেন এক যুগ পেরিয়ে পৌঁছেছি।যাই হোক,ঘরে ঢুকে একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম।সারা দিনের ক্লান্তি ঘুঁচে গেল ওদের আতিথেয়তায়।এক কাপ হার্বাল চা আর ক্যাম্প ফায়ার সাথে মৃদু আওয়াজে গজলের ধুন।আর কি চাই।রাস্তার যত খারাপলাগা,ভয়,আশঙ্কা ধুঁয়ে মুছে গেল।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল।বাইরে এসে চোখে পড়ল দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড় আর সবুজ জঙ্গল কুয়াশায় ঢেকে আছে।বেশ হাওয়া দিচ্ছে।ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিটতে বেশ কিছুক্ষন বসলাম।একটু একটু করে সূর্যের আলোর ছটা কুয়াশার বুক চিরে বেড়িয়ে আসছে,চারিদিকের ঝাপসা প্রকৃতি একটু একটু করে যেন লেপের তলা থেকে উঁকি দিচ্ছে।নিবিড় প্রকৃতির মাঝে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে প্রাতরাশ সেরে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম বিনসর ওয়াইল্ড লাইফ সেঞ্চুরির দিকে।
ট্রেকিং পথ
কাল যে জঙ্গলের পথে এসেছিলাম,আজ দিনের আলোতে তার রূপ দেখতে পেয়ে কেমন কেঁপে উঠছে বুকটা।ওক,রোডোডেন্ড্রন গাছের ঘন জঙ্গল।কোথাও কোথাও আলো পর্যন্ত প্রবেশ করছে না।গাছের গায়ে শ্যাওলা জমে গেছে।দেখে মনে হচ্ছে যেন সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সে দাঁড়িয়ে আছে অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে। গাড়ি এসে থামলো ফরেস্ট চেকপোস্টের সামনে।এখান থেকে টুরিস্ট রেস্ট হাউসের দূরত্ব প্রায় ১০কিমি।ওই পর্যন্তই গাড়ি যাওয়ার অনুমিত মেলে।গাড়ি আর নিজের জন্য এন্ট্রি পাস করে গাড়ি ছুটে চলল রেস্ট হাউসের দিকে।দুপাশে ঘন জঙ্গলে সবুজের সমারোহ।মার্চ এপ্রিল মাসে এই অঞ্চলটা নাকি লালে লাল হয়ে ওঠে ড্রাইভারের মুখে শুনছিলাম।এই পুরো এলাকায় ফরেস্ট বাংলো ছাড়া কয়েকটিমাত্র প্রাইভেট প্রপার্টি আছে।ড্রাইভারের মুখেই শুনছিলাম, বিনসর ব্রিটিশদেরও খুব পছন্দের জায়গা ছিল।বিনসরের আদিম আনকোরা প্রকৃতির স্বাদ নিতে এখানে তারা নিজস্ব মালিকানাধীন এস্টেট তৈরি করে। ড্রাইভার বলল,যাবেন নাকি একবার দেখতে? আজকাল টুরিস্টদের থাকার জন্য কয়েকটা প্রাইভেট এস্টেট তৈরি হয়েছে।যদিও আমার আজ রাতের বুকিং ফরেস্ট বাংলোতে তবু দেখতে যাবার সুযোগটা ছাড়তে চাইলাম না।বাড়িগুলো সবই ব্রিটিশ ধাঁচের আর্কিটেকচার।বেশ দারুণ জায়গাটা।ঘন জঙ্গলের মাঝে, পাহাড়ের কোলে একটা পাথরের তৈরি গেস্ট হাউস।এস্টেটের কেয়ারটেকারের সাথে আমার গাড়ির ড্রাইভার দাদাটির বেশ বন্ধুত্ব দেখলাম,তাই তার সৌজন্যে জুটে গেল এক কাপ চা।বছর ষাটেকের একজন মানুষ। দাজু দাজু বলে ডাকে সবাই।উনিই বলছিলেন,ওনার পরিবারের এখানের পঞ্চম পুরুষ উনি।১১শ থেকে ১৮শ শতাব্দীতে যে চাঁন্দ রাজারা কুমায়ুনে রাজত্ব করেছিলেন, বিনসর ছিল তাদেরই গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। পরবর্তী সময়ে ইংরেজরাও এসে থাকতে শুরু করে।পুলিশ কমিশনার,ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, কমিশনার,আর্মি অফিসাররা কলোনিয়াল বাংলো তৈরি করে থাকতে শুরু করেন।স্বাধীনতার পর তারা যখন দেশ ছেড়ে চলে যান তখন বেশীর ভাগই আলমোড়ার শাহ পরিবারকে দিয়ে যান।এখানে আরো বহু বিখ্যাত মানুষজন এসে নিভৃতে সময়যাপনে এসেছেন।কথা বলতে বলতে ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে নটা।এবার বেড়োতে হবে।নমস্কার বিনিময় করে উঠে এলাম।আসার পথে দেখলাম আরো এক দুটি প্রাইভেট রিসোর্ট হয়েছে।
নীল সবুজের সমারোহ
এখান থেকে বেড়িয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ফরেস্ট বাংলোতে।চেক ইন করে আবার বেড়িয়ে পড়লাম জিরো পয়েন্টের দিকে।সাথে গাইড পুরান সিং।সে চলল জঙ্গলের নানা গল্প বলতে বলতে।এই জঙ্গলে নাকি প্রায় ২৫টি প্রজাতির গাছ গাছালি,২৪ রকমের ঝোপ,৭ ধরনের ঘাস আছে।আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম পশু পাখির কথা।বলল ,Leopard,Musk Deer,Jungle Cat,Wild Boar,Red Fox,Gray Langur ইত্যাদি পশু দেখা যায়।আর পাখিদের মধ্যে Tits,Forktail,Black Birds,Magpies,Monal আরো অনেক আছে।জঙ্গলের পথে হেঁটে চলেছি,দেখে মনে হচ্ছে শতাব্দী প্রাচীন এক পথ তার চারিপাশ ঘিরে বুড়ো গাছেরা নজরদারী চালাচ্ছে।এই জঙ্গলে অনেক ঔষধি গাছপালাও আছে।আর জঙ্গলের গাছের ফাঁক দিয়েই মাঝে মধ্যেই দেখা যাচ্ছে নন্দাদেবী,নন্দাঘুন্টি।কথা বলতে বলতে কখন যে ২কিমি পথ হেঁটে ভিউ পয়েন্টে পৌঁছে গেছি বুঝতেই পারিনি।এখানে কুমায়ুন বিকাশ মন্ডলের তরফে একটা ওয়াচ টাওয়ার করা আছে। কুমায়ুনের সর্বোচ্চ পয়েন্ট এটি।গাড়োয়াল হিমালয়ের যমুনেত্রী থেকে নেপালের মাউন্ট নেম্ফা পর্যন্ত সমস্ত পাহাড় দেখা যায় প্রায় ৩৫০ ডিগ্রী কোণে।
নন্দাদেবী,নন্দাকোট,ত্রিশূল, কেদারনাথ, পঞ্চচুল্লি পর্বতের অবনর্নীয় রূপ।পাহাড়ের গায়ে পাহাড় বরফমোড়া।আর নিজে দাঁড়িয়ে আছি সবুজের রাজ্যে।পূর্ব,পশ্চিম আর দক্ষিণ এই তিন দিকের সব উঁচু উঁচু পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়ে চিক চিক করছে।আর হিম শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে এত দূর হেঁটে আসার ক্লান্তিকে ম্লান করে দিয়ে।
নীচে নেমে আসতে আসতে দুপুর হয়ে গেল।পুরান সিং কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম বিনসর মহাদেব নামে এখান থেকে কিছু দূরে জঙ্গলের ভিতরে একটা জায়গা আছে,ভগবান শিবের মন্দির।জুন মাসে নাকি প্রচুর ভক্ত সমাগম হয় সেখানে।আর আছে এখান থেকে ৯/১০কিমি দূরে কাসার দেবীর মন্দির। এটা নাকি একজন ডাচ সন্ন্যাসীর বাড়ি ছিল।শোনা যায় এখানে নাকি ১৯২০ সালে এই বাড়িটাতে স্বামীজী এসেছিলেন,ধ্যান করেছিলেন।
সেদিন ফরেস্ট বাংলোর রাত টা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।এই বাংলোটার বৈশিষ্ট্য হল এখানে ইলেক্ট্রিসিটি নেই।জঙ্গলের স্বার্থেই বর্জন করা হয়েছে নগরায়ন। তাই প্রায় সন্ধ্যে রাতেই মিটে গেল রাতের খাওয়া দাওয়া।তারপর যে যার মতো।একবার বাংলোর বারান্দায় এসে দেখলাম নিঝুম প্রকৃতিকে,উপরে দিগন্ত আকাশের তারা রা পাহাড়া দিচ্ছে আমাদের।বিছানা শুয়েও কানে আসতে লাগল কত রকম আওয়াজ।সেসব শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।
যাওয়ার পথঃ- কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেনে কাঠগোদাম/লালকুঁয়া পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি করে বিনসর পৌঁছানো যায়।আবার দিল্লি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি/বাস/ট্রেনে কাঠগোদাম পৌঁছেও বিনসর যাওয়া যায়।
থাকার ব্যবস্থাঃ- বিনসর ওয়াইল্ড লাইফ সেঞ্চুরিতে KMVN এর FRH একমাত্র থাকার জায়গা ।বুকিং অনলাইন বা কলকাতা অফিস থেকে।
এছাড়া জঙ্গলের বাইরে ও ধৌলচিনাতে থাকার জন্য প্রাইভেট কিছু রিসর্টও আছে।







Comments
Post a Comment