বড়োমাঙ্গোয়া Baramangwa r Golpogacha

                 তিস্তা পাড়ের গ্রাম  
@Barnali Roy




আমার আগে লাইনে দাঁড়িয়ে কমপক্ষে জনা দশ।তৎকাল টিকিট কাটবো, তাও আবার দশ
জনের পিছনে।না!এবার মনে হয় আর হল না।
 প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছি,মন খারাপ করে কাউন্টারে এসে বুকিং স্লিপ জমা দিলাম। ওমা  কি
কান্ড!হয়ে গেছে নিউ জলপাইগুড়ির দুটো  স্লিপার ক্লাসের টিকিট ।
দুগগা দুগগা বলে অক্টোবর মাসের এক রাতে চেপে বসেছি  দার্জিলিং মেল এ।
বাজেট ট্যুরে শিলিগুড়ির জংশন বাস স্ট্যান্ড  থেকে  কালিম্পং  যাওয়ার এন.বি.এস.টি.সি র বাসে চড়ে বসেছি।
না না কালিম্পং  যাব না এবার যাচ্ছি বড়ামাঙ্গোয়া



পলাশ কলকাতা থেকেই নয় নয় করে বার পঁচিশ বড়ামাঙ্গোয়া নাম টা জপ করেছে।কিন্তু  ওর স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গীতে ভুল বলছে বার বার।একবার  বলছে মাঙন, আবার বলছে মাঙুনা।
শিলিগুড়ি থেকে ঘন্টা দুইএসে নেমে পড়লাম তিস্তা বাজারে।এখানে বাজারের মাঝে ফটক বলে এক একটা
জায়গা আছে,সেখান থেকে ১০কিলোমিটার গেলে বড়ামাঙ্গোয়া।
 সবে ভাবছি কি করি কি করি।কিছু  না পেয়ে গাড়ি ভাড়া করার কথা ভাবছিলাম।ভাগ্যদয় হলে যা হয় হঠাৎ ই
একটা মালবাহী ট্রেকার পেয়ে গেলাম।
চড়াইয়ের পথে বাঁধাকপির বস্তা আঁকড়ে ট্রেকারে পিছনে উবু হয়ে বসার অভিজ্ঞতা এই প্রথম।হাত, পা এর সাথে
সারা শরীরের হাড় নড়ে  গেল মনে  হয়।সে কথা বলার অপেক্ষা থাকেনা।
চলে এসেছি বড়ামাঙ্গোয়া।গাড়ি টা মেন রাস্তায় নামিয়ে চলে গেল।আহা!কি সুন্দর চারিপাশ টা
পাকা রাস্তায় দাঁ ড়িয়ে যত দূর দেখতে পাচ্ছি সবুজ, সবুজ  আর সবুজ।মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন তার সব সবুজ রঙ
এখানে এসে দোয়াত থেকে উপুড় করে দিয়েছে।



আমাদের নিয়ে যেতে মেন রাস্তাতেই অপেক্ষা করছিলেন কেশর জি।
আলপথ,জঙ্গল পেরিয়ে যেতে হয় আমাদের কদিনের আস্তানা।কেশর রাইয়ের খামার বাড়িই কদিনের
আস্তানা।এই গ্রামটায় প্রায় সবকটা বাড়িতেই খামার আছে দেখলাম আসার পথে।
 পথে আসতে আসতেই শুনছিলাম বিনস,টমেটো, লঙ্কা, পিয়াজ, রসুন,আলু,ধান চাষ হয়।
বিভিন্ন ঔষধি গাছ,ফুল গাছ,ফল গাছ,ডেয়ারি ফার্ম,পোলট্রি,অরগানিক ফুড প্রসেসিং ইউনিট আছে এখানে।
মুগ্ধ হয়ে দেখছি আর শুনছি।এ বাবা পলাশ কোথায়? ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।ভয়ও হল।জঙলের পথ।
কেশর জি আর আমি আবার পিছনে গেলাম।ওই দ্যাখো কান্ড!গাছ থেকে এক বিরাট মাকড়শা ঝুলছে।কি জানি
মার্শাল আর্টে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন এত কেন মাকড়শাভিতি।যাহোক এ যাত্রায় কেশর জি ত্রাতা।
ছোট  ছোট দুটো কটেজ।চারিদিকে ফুলের বাগান আর ভেষজ গাছপালা।কটেজের সামনেই খোলায়া বারান্দা।
অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।
দূরে পাহাড়ের কোলে কালিম্পং। রোদ আর ছায়ার লুকোচুরি খেলা চলছে সেখানে ।




আমি আছি ঠিক বিপরীত দিকের অন্য  একটা নীচু পাহাড়ি গ্রামে..... বড়েমাঙ্গোয়া।দুই পাহাড়ের মাঝে
সীমারেখা টেনেছে সবুজ রঙা তিস্তা।
পলাশের সাথে যতবার এসেছি উত্তরবঙ্গ  বেড়াতে ও ততবারই বলে,'আচ্ছা তিস্তা অমন সবুজ কেন
বলোতো?’উত্তর টা জানি না বলে, বেশ কাব্য করেই ওকে বলি,'এখানে ওকে এই রঙেই মানায়।তাই ও সবুজ। '
আচ্ছা বলুন দেখি দিদিমণি বলে কি সব জানতে হবে?
যত দূর চোখ যাচ্ছে ঘনসবুজ জঙ্গল । সামনের পাহাড়ের কোলে ছোটো ছোটো গ্রাম গুলো যেন ঝুলন সাজিয়ে
বসে আছে।প্রকৃতির এত কাছাকাছি নিস্তব্ধতাকে সাক্ষী রেখে বড়েমাঙ্গোয়া যেন এক ফালি ছবির মতন
গ্রাম।চিত্রকরের ল্যান্ডস্কেপ ফ্রেম। কৃত্রিমতারর লেশমাত্র নেই।সবকটা রঙই এখানে সজীব ও সতেজ।
তিস্তা অববাহিকা থেকে প্রায় ৩৫০০ফিট উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি গ্রামটি শিলিগুড়ি শহর থেকে
মাত্র ৬২কিমি।শহরের দূষণ, চিৎকার, হুল্লোর,কৃত্রিমতা, ব্যস্ততা থেকে মাত্র কিছুটা দূরে।অথচ হাওয়ায়
বুনো গন্ধ,পেজা তুলোর মতো মেঘ,তিস্তার বাঁক,পাহাড়ের গায়ে পাহাড় তারপর আরো পাহাড়



আর তার উপর ঝুলন সাজানো গ্রাম।উজাড় করা প্রকৃতি। অনেকটা দেখা যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
উল্টো দিকে কালিম্পং, ঝান্ডিদাঁড়া।বাঁদিক ঘেষে সিকিমের পাহাড়, আর নীচে তাকালেই তিস্তা।তার
পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে পাহাড়ি পথ।
মাঝে মাঝে এই নিস্তব্ধতা পেড়িয়ে শহরের উপস্থিতিও টের পাচ্ছি যখন এই শান্তি, নিস্তব্ধতা ছিন্নভিন্ন করে পাখির
কলতান ছাপিয়ে গাড়ির সুতীব্র হর্ন কিংবা মাইকের আওয়াজ অথবা সাথে থাকা প্রতিবেশী টুরিস্টদের মোবাইল
নোটিফিকেশন কানে আসছে।
কিন্তু  এখানে আসার পর থেকেই দেখছি শহুরে ব্যস্ততা আর মানসিক চাপান উতরের বিরুদ্ধে জেহাদ
জানিয়ে মোবাইলটা মাঝে মাঝে  দেহ রাখছে। আমি খুব খুশি। খাতা-কলম আর কুমারী প্রকৃতির সাথে
কল্পনার তিনদিন।আর আছে ফার্মহাউসের টাটকা তাজা সবজি।আজ থেকেই শুরু। দুপুরে খাবার
টেবিলে ছিল ধোঁয়া ওঠা গরমভাত,হাতে বানানো ঘি, আলু-বিনসের সব্জি,পোলট্রির ডিম,মুসুরির ডাল আর ডল্লির
আচার।ডাল্লি হলস্থানীয় গোল গোল লাল লঙ্কা।খুব ফেমাস মোমোর চাটনি তে। মোমো তো এখন কলকাতার

স্ট্রিট ফুড।কিন্তু পাহাড়ের মোমো ডাল্লি ছাড়া অসম্পূর্ণ। টম্যাটোর যে চাটনি দেয় সেটা টম্যাটো আর ডাল্লি দিয়েই
তৈরি করে এরা।সমতলে তো আর ডাল্লি পাওয়া যায় না,তাই পাহাড়িয়া স্বাদও মেলে না।
এখন ঘড়িতে বিকাল ৫টা।এর মধ্যেই চারিদিকে নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে
গাঢ় কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে,সামনের পাহাড়ের বাড়িগুলোতে একে একে আলো জ্বলে উঠছে।ধিরে ধিরে গ্রামগুলো
সোনালি আর রূপালি আলোতে ঝলমল করে উঠলো। সূর্যাস্তের সাথে সাথে শ্রমের অবসান ঘটিয়ে
পাহাড়িমানুষগুলো মেগা ধারাবাহিক নয় মেতে ওঠে গৃ্হস্থালী আর পরের দিনের কাজের পরিকল্পনায়।আর
তারই মাঝে মাঝে নেপালি গানের সুরে একটু মন ভোলানো। অনেক নীচের রাস্তায় সারি বেধে আলোজ্বেলে
নিঃশব্দে চলেছে, মনে হচ্ছে যেন শুয়ো পোকা গায়ে আলো লাগিয়ে হেটে,  চলে,দৌড়ে চলছবেড়াচ্ছে।
হঠাৎ একটা শোরগোল কানে এল।খাবার ঘরের দিক থেকে আসছে।একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি অজয়, কালিব,
বিশ্বনাথ তোড়জোড় করছে ক্যাম্প ফায়ারের।একটা জাগায় আগুন জ্বালা হয়েছে,তার চারিপাশে গোল করে
ঘিরে কতগুলি গাছের গুঁড়ি রাখা রয়েছে বসার জন্য।পলাশ কে ডাকতে গিয়ে দেখি ও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। আমি
আর ওকে ডাকলাম না।ক্যামেরা নিয়ে এসে বসে পড়লাম আসরে।কি সুন্দর গান গাইল ছেলেগুলো।দুপুরে যে
অজয় অতো ভালো রেঁধে খাওয়ালো,সে যে এত ভাল গান ও গায়। অবাক হচ্ছি যত ওদের দেখছি। চমৎকার
আতিথেয়তা এদের।
পরদিন হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম------- 'লিউন্স গার্ডেন '।




 চমৎকার সব জিনিসের ফলন হয়েছে সেখানে।
 কমলা লেবু,বাতাবি লেবু,মৌসাম্বি লেবু, ভেজিটেবিলস,ঔষধি গাছ গাছালি, কফি বাগান,পাইন,সাইকাস,বিভিন্ন
প্রজাতির ফার্ণ,বিভিন্ন প্রজাতির  দেশী বিদেশী বাঁশ গাছ আরো কত নাম না জানা ফুল আর ফলের গাছ দিয়ে
সাজানো বাগান।
প্রায়৩.৫একর জমির উপর মিঃ নির্মল লিউন্স ১৯৩৪ সাল থেকে ধীরে ধীরে এই বাগানটি তৈরি  করেছেন।
গল্প শুনছিলাম তার তৃতীয় প্রজন্ম রোহন লিউন্সের কাছে।প্রায় ১০বছর মুম্বাই তে প্রযুক্তি জগৎ তে চাকরি
করার পর সে ফিরে এসেছে বাবা ঠাকুরদার স্বপ্নের সাম্রাজ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে।রোহনের  বাবা মিঃ শ্যাম
লিউন্সের কাছেই শুনলাম এই বাগান শুরুর গল্পটা।একবার তার বাবা মিঃ লিউন্সের খুব সর্দিকাশি হয়েছিল।
কিন্তু কিছুতেই সারছিল না।প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে ডাক্তার ও নেই।প্রায়  শয্যাশায়ী নির্মল এক দিন হঠাৎ
 তাদের বাড়ির সামনের একটা কমলা লেবু গাছ থেকে গোটা কমলা খেয়ে ফেললেন।অবাক ঘটনা ম্যাজিকের
মতো কমে গেল অসুখ।সেই থেকে শুরু। গাছের পর গাছ লাগানো। একটা গাছকে বাঁ চাতে অন্যটা লাগানো।






কারন এখানে  সম্পূর্ণ জৈবিক পদ্ধতিতে ফলন হয়।কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার নেই।তাই বাস্তুতন্ত্র
মেনে,প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে বাগান সাজানো। মিঃ নির্মল নিজে নিজে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাজ
টা শুরু করেন,পরবর্তি সময়ে ছেলে শ্যামকে গাছপালা নিয়ে পড়াশুনা করতে শহরে পাঠান।এগ্রিকালচার এ
ডক্টরেট করার পর শ্যাম সম্পূর্ণ ভাবে দায়িত্ব নেন।১৯৮৪তে বাগান খুলে দেওয়া হয় সবার জন্য।সাম্প্রতিক
কালে বয়সজনিত কারনে তিনি অসুস্থ। তাই ছেলে রোহনের হাতে সপেছেন পারিবারিক স্বপ্ন ও সাধনাকে।
রোহণ কিছু আধুনিকিকরন ঘটিয়েছেন ইতিমধ্যে। বাগানের মধ্যেই মেডিটেশন সেন্টার, কটেজ তৈরি
হচ্ছে।পরবর্তিকালে পর্যটনকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও শুনলাম। বাগানের পাশেই তৈরি হয়েছে
নির্মল এগ্রো ফুড প্রোডাক্ট। বিভিন্ন জুস,জ্যাম, আচার তৈরি হচ্ছে।এ যেন এক স্বপ্নের সাম্রাজ্য। টেকনোলজিকে
চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস।শহুরে কৃত্তিমতাক দূরে ঠেলে স্বাভাবিক, সনাতনতা
বাঁচিয়ে রাখতে তিন প্রজন্মের লড়াই।কিছুই ঝাঁ চকচকে নয়,অথচ মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়।



বড়েমাঙ্গোয়াতে প্রতিটি মূহুর্তই কাটছে স্বপ্নের মতো।
আজ কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমারাত। চারিপাশের পরিবেশ মোহময়।
এ যেন রূপকথার গল্পের কোনো মায়াবী রাজ্য।যতদূর দেখতে পাচ্ছি কুয়াশা মাখা পাহাড়। তার গায়ে জমাট বাঁধা
টুকরো টুকরো আলোরমালায় সাজানো জোনাকি গ্রাম।যদিও আকাশে চাঁদ টা কে এত বড় আর কাছে
মনে হচ্ছে যেন হাত দিয়ে ধরা যাবে।তবুও জ্যোৎস্নামাখা বারান্দাতে বসে গা ছমছম করছে।সকালে যে
পাহাড়গুলো মুগ্ধতা এনেছিল, এখন কেমন যেন তারাই ভয় দেখাচ্ছে। এত বিশালতার মাঝে নিজেকে টিকিয়ে
রাখাটাই যেন কঠিন।
আজ বেশিরভাগ ছেলেরাই কটেজে নেই।পূজা উপলক্ষে বোধহয় বাড়ি গেছে।একটু আগেই রাতের খাওয়া
দাওয়া মিটিয়ে কেশর জিও নিজের ঘরে চলে গেলেন।আমি বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে নিস্তব্ধতা কে উপভোগ
করছি।রাতের খাওয়া পর পলাশকে আর কে পায়।তার এখন মধ্যরাত।





এ দিকটা এমনিই শুনশান। কি জানি কটা বাজে?পাহাড়ে খুব দ্রুত রাত গভীর হয়।চাঁদের আলো ছাড়া আর
কোনো আলোই নেই।এবার  একটু  ভূতের ভয় হল।ভাবতেই কেমন হল একটা।হঠাৎ উপরের জঙ্গল থেকে একটা
মিষ্টি নেপালি গানের সুর কানে এল।এক মহিলার গলা।কেশর জি র স্ত্রী নিশ্চয়।ভয়টা কেটে গেল।সুন্দর একটা
গান শুনে ঘুমাতে গেলাম।
পরদিন  সকালে কেশর জি কে বললাম 'আপনার স্ত্রীর গানের গলাটা ভারি মিষ্টিশুনলাম কাল রাতে।ওই ওপর
দিকের জঙ্গলটাতেও আপনাদের ঘর আছে না?'
কেশর জি বিস্ময়মাখা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,'নেহি তো।ওর মেরা শাদি নেহি হুয়া অবতক।ঘর পে
কোয়ি ঔউরত ভি নেহি হ্যায়।কিসকা গানা শুনে আপ?'
শরীরের ভিতর টা কেমন  যেন ঠান্ডা মেরে গেল।





Comments

Popular posts from this blog

Barshajapan e Chilapata Mendabari r Jangol

Silary Gaon

Ochena Purulia r anache kanache